বৃহস্পতিবার ৪ জুন ২০২৬ - ১০:৩৫
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)’র আবির্ভাবের যুগের পথপ্রস্তুতি— মহান খোমেনির রূপান্তরময় আন্দোলনের ফসল

ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর দৃষ্টিতে ইসলামী বিপ্লবের মিশন এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল নবীন ইসলামী সভ্যতা প্রতিষ্ঠার ভিত্তি নির্মাণ এবং ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের যুগের জন্য মানবসমাজকে প্রস্তুত করা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৫ জুলাই ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর পবিত্র মাজারে প্রদত্ত এক ভাষণে শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.) বলেন, “আমাদের মহান ইমাম তিনটি ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব রূপান্তর ঘটিয়েছেন—একটি ইরানের জাতীয় পর্যায়ে, একটি ইসলামী উম্মাহর পর্যায়ে এবং আরেকটি বিশ্বপর্যায়ে। এই তিনটি রূপান্তরের কোনো পূর্ব নজির নেই; ভবিষ্যতেও এর অনুরূপ কিছু ঘটবে কি না, তা কল্পনা করাও কঠিন। এটি ছিল মহান ইমামেরই বিশেষ কৃতিত্ব।”

ইমাম খোমেনি (রহ.)'র ইন্তেকালের বার্ষিকীতে যে বিষয়টি বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য, তা হলো—তিনি কেবল একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেননি; বরং সেই সমাজকে মানবকল্যাণ, আত্মিক উৎকর্ষ এবং আল্লাহর বন্দেগির পথে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন মানুষ গড়ে তোলা, যারা পার্থিব জীবন থেকে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে এবং ঈমানভিত্তিক সমাজ গঠন করবে।

এই লক্ষ্যই পরবর্তীকালে তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি শহীদ ইমাম খামেনেয়ী (রহ.)'র নেতৃত্বেও অব্যাহত থাকে। তিনি ইসলামী বিপ্লবের মূল দায়িত্ব ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে নবীন ইসলামী সভ্যতা প্রতিষ্ঠা এবং ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের যুগের প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

ইমাম খোমেনি: জিহাদ ও সংগ্রামের নেতা
সাংস্কৃতিক কর্মী ও হাওজা গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যিদ মাহমুদ মুসাভী হাসব বলেন, ইমাম খোমেনি (রহ.) শুরু থেকেই মানুষকে তাওহিদের দিকে আহ্বান এবং ইসলামী মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হন।

তাঁর এই সংগ্রামী চেতনা ছিল নবী-রাসূল ও আহলে বাইত (আ.)-এর আদর্শেরই অনুসরণ। পবিত্র কুরআনের সূরা নাহলের ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: “তোমরা তাগুতকে বর্জন করো।”

এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে তিনি পাহলভী শাসনব্যবস্থা, মার্কিন আধিপত্য, দখলদার ইসরাইল, সাদ্দাম হুসাইন এবং কুফর, শিরক ও মুনাফিকির সব শক্তির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। তাই তাঁকে ‘জিহাদ ও সংগ্রামের ইমাম’ বলা হয়ে থাকে।

তাগুতি ও আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম
হুজ্জাতুল ইসলাম মুসাভী হাসব বলেন, ইমাম খোমেনি (রহ.)’র মতে তাগুত ও বিশ্ব আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম একটি চলমান প্রক্রিয়া। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর বাণী বিশ্বময় প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত মুসলিম জাতি থেমে থাকতে পারে না।

সংগ্রামের ক্ষেত্রে তিনি শত্রুচিন্তার গুরুত্বও তুলে ধরতেন। ইমাম খোমেনি এবং তাঁর উত্তরসূরির বক্তব্য ও কর্মধারায় এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ইমাম খোমেনির দৃষ্টিতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হলো ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। তবে এরও ঊর্ধ্বে ছিল এমন একটি সমাজ গঠন, যা আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের পথে পরিচালিত হবে।

দূরদর্শী ও সজাগ প্রহরী
গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম মুসাভী হাসব বলেন, ইমাম খোমেনি (রহ.) ছিলেন সময়সচেতন, দূরদর্শী ও সদা সজাগ এক আলেম। তাঁর নেতৃত্ব শুধু ইরানেই নয়, গোটা অঞ্চল এবং বিশ্বপরিসরেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোর ইসলামী জাগরণ ও মানবিক চেতনার উত্থানের পেছনে তাঁর আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

তিনি শত্রুর ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন এবং সময়োপযোগী, সাহসী ও স্পষ্ট অবস্থানের মাধ্যমে সেগুলো মোকাবিলা করতেন।

‘বড় শয়তান’ হিসেবে আমেরিকার পরিচয়
হুজ্জাতুল ইসলাম মুসাভী হাসবের মতে, ইমাম খোমেনি খুব দ্রুত উপলব্ধি করেছিলেন যে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রধান শত্রু যুক্তরাষ্ট্র। এজন্যই তিনি আমেরিকাকে “বড় শয়তান” বলে অভিহিত করতেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, ইসলামী বিপ্লব বিশ্বে মার্কিন আধিপত্যের মিথ ভেঙে দিয়েছে এবং বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বারবার সেই বাস্তবতা প্রমাণিত হয়েছে।

অবিচল ঈমান ও জনগণের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক
তিনি বলেন, ইমাম খোমেনির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর দৃঢ় ঈমান ও অটল বিশ্বাস। ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যে এ গুণের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শহীদ মুর্তজা মোতাহ্হারী ইসলামী বিপ্লবে ইমাম খোমেনির নেতৃত্বকে “নবীসুলভ বা নবীর আদর্শিক নেতৃত্ব” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যা তাঁর নেতৃত্বের গভীরতা ও আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে।

অন্যদিকে, তিনি জনগণের মনস্তত্ত্ব, সংস্কৃতি ও প্রত্যাশা গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। ফলে জনগণের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক ও দৃঢ়। মানুষ তাঁকে একজন স্নেহশীল ও কল্যাণকামী পিতার মতো মনে করত এবং বিশ্বাস করত যে তিনি জাতি ও মানবতার মঙ্গল ছাড়া আর কিছুই চান না।

আশা, ঐক্য ও জাতীয় সংহতির প্রয়োজনীয়তা
আলোচনার শেষাংশে হুজ্জাতুল ইসলাম মুসাভী হাসব বলেন, মানুষের মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি করলে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে আরও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। আশা মানুষকে উদ্যমী করে, প্রতিকূলতা মোকাবিলার শক্তি বাড়ায় এবং সামাজিক অগ্রগতির পথ প্রশস্ত করে।

এ কারণেই আশাবাদ সৃষ্টিকে ইমাম খোমেনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পাশাপাশি তিনি জাতীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন, যাতে শত্রুর ষড়যন্ত্র ও বিভেদমূলক কর্মকাণ্ড সফল হতে না পারে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha