আমার ছেলে আগে নামাজ পড়ত, এখন ছেড়ে দিয়েছে—কী করব?

পরিবারে কিশোর-কিশোরীরা বন্ধু-বান্ধব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ভার্চুয়াল পরিবেশের প্রভাবে তাদের নৈতিকতা, আচরণ ও ধর্মীয় বিশ্বাসে পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে পারে। তাই সন্তানকে সঠিক পথে রাখতে পারিবারিক পর্যায়ে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা, বন্ধু নির্বাচন সম্পর্কে সচেতনতা এবং মিডিয়া-সাক্ষরতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: পারিবারিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন সাইয়্যেদ আলীরেজা তারাশিয়ান ‘সন্তানের ধর্মীয় শিক্ষা ও লালন-পালনের গুরুত্বপূর্ণ করণীয়’ শীর্ষক প্রশ্নোত্তর পর্বে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

প্রশ্ন:  আমার পনেরো বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। আগে সে নিয়মিত নামাজ ও রোজা পালন করত, ভদ্র ও শিষ্টাচারসম্পন্ন ছিল এবং পড়াশোনাতেও মোটামুটি ভালো ছিল। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে তার মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সে দুর্বল হয়ে পড়েছে, পড়াশোনার প্রতিও আগ্রহ কমে গেছে। যদিও পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি, তবে অনেকটাই উদাসীন হয়ে পড়েছে।

নৈতিক আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। এখন সে রাস্তাঘাটের অশালীন ভাষা ব্যবহার করে। আমরা যথাসম্ভব তার প্রতি নজরদারি করেছি, বাইরে যাওয়াও খুব বেশি ছিল না; কিন্তু তারপরও তার মধ্যে এই পরিবর্তন এসেছে। বুঝতে পারছি না, আমাদের কি কোনো বিশেষজ্ঞ বা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেওয়া উচিত? দয়া করে দিকনির্দেশনা দিন।

উত্তর : বিশেষজ্ঞের মতে, এ বয়সে কিশোররা সাধারণত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। এই দুটি বিষয় তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিকতা, আচরণ এবং এমনকি শিক্ষাজীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিষয় দুটি হলো—বন্ধুবান্ধবের প্রভাব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চুয়াল জগত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
তিনি বলেন, বর্তমানে পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো কিশোরদের মোবাইল ফোন ও ভার্চুয়াল জগতের ব্যবহার। তাঁর মতে, এই বয়সে কিশোরদের হাতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই উপকারের চেয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে কৈশোরের মধ্যবর্তী পর্যায়ে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে কি এই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? তিনি বলেন, অবশ্যই সম্ভব; তবে এর জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক পারিবারিক ব্যবস্থাপনা।

তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিশোরদের নৈতিকতা, মানসিকতা ও জীবনদৃষ্টির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এটি অনেক সময় তাদের প্রত্যাশার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, অসন্তুষ্টি সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও নৈতিক সমস্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

‘কিছুই করার নেই’—এই মানসিকতা ভুল
তিনি মনে করেন, সমাজে এক ধরনের আত্মসমর্পণমূলক মনোভাব তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক অভিভাবক বলেন, “এ বিষয়ে কিছুই করার নেই।” অথচ বাস্তবে এই দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয়। যেমন সমাজ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তেমনি ক্ষতিকর মিডিয়া-প্রভাবের বিরুদ্ধেও সচেতন ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

তার মতে, বিশেষ করে কিশোরদের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবকে এখনও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

অভিভাবকদের অজানা বাস্তবতা
তিনি একটি বাস্তবধর্মী উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, যদি কোনো কিশোরের হাতে স্মার্টফোন থাকে, সে অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে, গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকে এবং বাবা-মা তার কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত না থাকেন, তাহলে সে ভার্চুয়াল জগতে কী দেখছে বা কী ধরনের বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে আসছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়।

এই অজানাই উদ্বেগের মূল কারণ। পরে হঠাৎ করে পরিবার দেখতে পায় যে সন্তানের ভাষা, আচরণ, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবনযাপনের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। অথচ এসব পরিবর্তন আকস্মিকভাবে ঘটে না; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিভিন্ন প্রভাবের ফলস্বরূপ ধীরে ধীরে তৈরি হয়।

বন্ধু নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞ বলেন, কৈশোর মূলত বন্ধুত্ব ও সমবয়সী গোষ্ঠীর প্রতি আকর্ষণের সময়। তাই অভিভাবকদের উচিত সন্তানের বন্ধুদের সম্পর্কে জানা এবং তাদের চরিত্র, চিন্তাধারা ও জীবনযাত্রার প্রতি মনোযোগ দেওয়া।

তিনি বলেন, যদি কোনো কিশোর এমন বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করে যারা ধর্মীয় মূল্যবোধ, শালীনতা ও ইতিবাচক আচরণের প্রতি গুরুত্ব দেয় না, তাহলে তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।

অভিভাবকদের জন্য দুটি মৌলিক করণীয়
তারাশিয়ানের মতে, অভিভাবকদের বিশেষভাবে দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে—

১. সন্তানের বন্ধু ও সামাজিক পরিমণ্ডল সম্পর্কে সচেতন তত্ত্বাবধান।

২. গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সঠিক দিকনির্দেশনা এবং পারিবারিক মিডিয়া-সাক্ষরতা বৃদ্ধি।

তিনি বলেন, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার নিয়ে পরিবারে খোলামেলা আলোচনা এবং সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি। বর্তমানে অধিকাংশ অভিভাবকের অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো—সন্তানদের প্রযুক্তি-নির্ভরতা এবং এ ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অসুবিধা।

সাংস্কৃতিক দ্বৈততার সমস্যাও রয়েছে
তিনি আরও বলেন, সমাজে এক ধরনের সাংস্কৃতিক দ্বৈততা লক্ষ্য করা যায়। কখনও দেখা যায়, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কোনো কর্মসূচির পুরস্কার হিসেবেই স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট দেওয়া হচ্ছে; অথচ একই সময়ে এসব প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।

তার মতে, এই ধরনের বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট, সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞের মতে, কিশোর সন্তানের ধর্মীয়, নৈতিক ও শিক্ষাগত বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে পরিবারকে শুধু নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা পালন করলেই হবে না; বরং সচেতন সঙ্গ, সঠিক বন্ধুবান্ধব নির্বাচন, প্রযুক্তি ব্যবহারে ভারসাম্য এবং ইতিবাচক পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তোলার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ কৈশোরের এই সময়টিই একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব, বিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ জীবনদর্শন গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha