শনিবার ৬ জুন ২০২৬ - ১৭:১১
ইমাম খোমেনি: যিনি একটি জাতিকে শিখিয়েছিলেন— ‘শুধু আল্লাহকে ভয় করো’

১৯৮৯ সালের ৩ জুন ইমাম খোমেনি ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর তিন দশকেরও বেশি সময় পর আজও তাঁর স্মৃতি, চিন্তা ও আদর্শ কোটি মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। প্রতি বছর ‘ইমাম সপ্তাহ’ শুধু তেহরানেই নয়, বরং লাগোস, বৈরুত, লন্ডনসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পালিত হয়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: সম্ভবত এর কারণ হলো, ইমাম খোমেনির বার্তা কখনো কোনো নির্দিষ্ট দেশ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বা প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি এমন কিছু মৌলিক ও চিরন্তন প্রশ্ন নিয়ে কথা বলেছিলেন, যা সব যুগেই মানুষের জন্য প্রাসঙ্গিক—ভয়, ন্যায়বিচার, ঈমান, ক্ষমতা এবং প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম। এমন এক বিশ্বে, যেখানে মানুষ প্রায়ই ভীতি, ভোগবাদ ও অবিচারের মুখোমুখি হয়, সেখানে তাঁর বক্তব্য মর্যাদা, সত্য ও মানবিক মূল্যবোধের সন্ধানীদের কাছে এখনও অনুরণিত হয়।

আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় নয়
ইমাম খোমেনির সবচেয়ে স্থায়ী ও গভীর শিক্ষাগুলোর একটি ছিল—একজন মুমিনের প্রকৃত ভয় শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি হওয়া উচিত।

ক্ষমতাধর রাষ্ট্র, অর্থনৈতিক চাপ, প্রচারযুদ্ধ এবং রাজনৈতিক হুমকিতে পরিপূর্ণ এক পৃথিবীতে তিনি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, প্রকৃত ক্ষমতার উৎস কোথায়, “বিদেশিদের শোরগোল ও প্রচারণা যেন কখনো তোমাদের ভীত না করে। মানুষের একমাত্র ভয় হওয়া উচিত মহান আল্লাহর প্রতি। অন্য কোনো শক্তিকে ভয় করো না; কারণ প্রকৃত শক্তি একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহরই শক্তি।”

তাঁর মতে, প্রকৃত স্বাধীনতার সূচনা মানুষের অন্তর থেকে হয়। যে জাতি আল্লাহকে অন্য সব শক্তির চেয়ে বেশি ভয় করে, তাকে সহজে ভীত বা পরাধীন করা যায় না। একইভাবে, যে ব্যক্তি উপলব্ধি করে যে সমস্ত কর্তৃত্বের চূড়ান্ত উৎস আল্লাহ, সে প্রতিকূলতা ও চাপের মধ্যেও দৃঢ় থাকতে পারে।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পেছনে এই চেতনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে এর তাৎপর্য কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কঠিন সময়ে সাহস ও দৃঢ়তার সন্ধানী সকল মানুষের জন্য এটি একটি অনন্য শিক্ষা।

আত্মত্যাগের মহিমা
ইমাম খোমেনিকে স্মরণ করা মানে আত্মত্যাগের চেতনাকেও স্মরণ করা।

সত্য ও ন্যায়ের পথে জীবন উৎসর্গকারীদের সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন,  “ধন্য তারা, যারা শাহাদাতের মাধ্যমে বিদায় নিয়েছে। ধন্য তারা, যারা এই আলোর কাফেলায় নিজেদের জীবন ও আত্মা উৎসর্গ করেছে। ধন্য তারা, যারা নিজেদের স্নেহের পরশে এই মূল্যবান রত্নগুলোকে লালন-পালন করেছে।”

এই কথাগুলো মৃত্যুর প্রশংসা নয়; বরং আদর্শের প্রতি অঙ্গীকার, বিশ্বাস এবং নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের প্রশংসা।

তিনি শুধু শহীদদেরই সম্মান জানাননি; বরং তাঁদের পরিবারগুলোকেও শ্রদ্ধা করেছেন, যারা তাঁদের লালন-পালন করেছেন, সমর্থন দিয়েছেন এবং তাঁদের বিচ্ছেদ ও ত্যাগের বেদনা বহন করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে তারা ছিল “মূল্যবান রত্ন”; কারণ তারা ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে নীতিকে এবং ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে সত্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল।

ইমাম খোমেনি বিশ্বাস করতেন, ন্যায়বিচারের জন্য পরিচালিত প্রতিটি মহান আন্দোলনের ইতিহাস আত্মত্যাগের রক্তিম অক্ষরে লেখা হয়। প্রকৃত পরিবর্তন কেবল স্লোগানের মাধ্যমে নয়; বরং আদর্শের জন্য কষ্ট সহ্য করতে প্রস্তুত মানুষের মাধ্যমেই স্থায়ী হয়।

সবচেয়ে বড় মূর্তি: মানুষের ‘নফস’
যদিও অনেকেই ইমাম খোমেনিকে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে জানেন, তিনি সবসময় আত্মশুদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন।

তাঁর বিশ্বাস ছিল, দুর্নীতির মূল কারণ শুধু রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান নয়; বরং মানুষের নিজের ভেতরেই তার শিকড় নিহিত।

তিনি বলেন, “স্বার্থপরতাই মানুষকে দুর্নীতির দিকে টেনে নিয়ে যায়। পৃথিবীতে যে সব ধরনের দুর্নীতি দেখা যায়, তার উৎস হলো স্বার্থপরতা, পদমর্যাদার মোহ, ক্ষমতার লালসা, সম্পদের প্রতি আসক্তি এবং এ ধরনের প্রবৃত্তি।”

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন,  “সবকিছুর মূলেই রয়েছে আত্মপ্রেম বা নফসের প্রতি আসক্তি। এটিই সবচেয়ে বড় মূর্তি এবং ভাঙা সবচেয়ে কঠিন। যদি তুমি এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করো, তবে এটি ধীরে ধীরে তোমাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাবে, যেখানে তোমার ঈমানও তোমার হাতছাড়া হয়ে যাবে।”

আজকের বাস্তবতায় এই বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরে ক্ষমতা, সম্পদ ও খ্যাতির মোহে পথ হারিয়ে ফেলেন।

ইমাম খোমেনির দৃষ্টিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক মূর্তি পাথরের তৈরি কোনো প্রতিমা নয়; বরং মানুষের অহংকার ও নফস, যা সবসময় অন্যের ওপর আধিপত্য, প্রশংসা ও নিয়ন্ত্রণ কামনা করে। এই অন্তর্গত মূর্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামই তাঁর মতে জিহাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপ।

আধ্যাত্মিকতার গভীর আহ্বান
বিপ্লবী নেতা হিসেবে তাঁর খ্যাতি থাকলেও তাঁর রচনাবলি ও বক্তব্যে এক গভীর আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়।

তিনি প্রায়ই মানুষের অন্তর্জগত, আত্মিক জীবন এবং আল্লাহর সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্কের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতেন।

তিনি বলেন, “যখন দেখবে তোমার হৃদয় হঠাৎ নম্র হয়ে গেছে, চোখে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে এবং আল্লাহর কাছে তোমার প্রার্থনা অন্তরের গভীরতা থেকে উৎসারিত হচ্ছে—তখন বুঝবে, এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়ার লক্ষণ।”

তাঁর কাছে ঈমান কখনো কেবল কিছু বিধান বা আনুষ্ঠানিকতার সমষ্টি ছিল না; বরং এটি ছিল আল্লাহর সঙ্গে এমন এক সম্পর্ক, যা মানুষের হৃদয়কে পরিবর্তিত করে দেয়।

নম্র হৃদয়, মজলুমের প্রতি সহমর্মিতা, আন্তরিক ইবাদত এবং আল্লাহর সামনে বিনয়—এসবই ছিল তাঁর দৃষ্টিতে জীবন্ত ও প্রাণবন্ত ঈমানের নিদর্শন। এমন আত্মিক বিজয়ের বিকল্প কোনো রাজনৈতিক সাফল্য হতে পারে না।

আজও প্রাসঙ্গিক তিনটি প্রশ্ন
ইমাম খোমেনির ইন্তেকালের ৩৬ বছর পরও তাঁর উত্তরাধিকার আমাদের সামনে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—
• তুমি কাকে ভয় করো?
• তুমি কাকে ভালোবাসো?
• তুমি কার সেবা করছ?

তাঁকে স্মরণ করার উদ্দেশ্য কেবল একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং তাঁর ধারণকৃত নীতিমালা পুনরায় অনুধাবন করা—অহংকারহীন নেতৃত্ব, হতাশাহীন প্রতিরোধ, ভণ্ডামিমুক্ত ঈমান এবং স্বার্থহীন সেবা।

৩ জুনকে স্মরণ করার এই প্রেক্ষাপটে তাঁর বার্তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কেউ আলেম হোক বা শ্রমিক, তরুণ হোক বা প্রবীণ, মুসলিম হোক বা অমুসলিম—সবার জন্য চ্যালেঞ্জ একই: জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে আল্লাহকে স্থান দেওয়া, নফসের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং পৃথিবীর কোলাহল যতই তীব্র হোক না কেন, সত্যের প্রতি অবিচল থাকা।

ইমাম খোমেনির দৃষ্টিতে এটাই ছিল প্রকৃত স্বাধীনতার পথ। আর তিনি বারবার তাঁর অনুসারীদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, “প্রকৃত শক্তি একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহর শক্তি; এর বাইরে আর কোনো শক্তি সত্যিকার অর্থে শক্তি নয়।”

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha