বুধবার ১০ জুন ২০২৬ - ১৩:০৪
ইমাম আলী (আ.)-এর ভালোবাসা কীভাবে মানুষকে অধঃপতন থেকে রক্ষা করে?

আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা কখনো গুনাহের বৈধতা দেয় না কিংবা শরয়ি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির অজুহাত হতে পারে না। বরং এই ভালোবাসা এমন এক আধ্যাত্মিক শক্তি, যা মানুষকে ভুল ও গুনাহের পর অনুশোচনা, তওবা এবং আত্মশুদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনে। ফলে সে স্থায়ীভাবে তাগুতের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ার হাত থেকে রক্ষা পায়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইমাম আলী (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা কি গুনাহকে উপেক্ষা করার বা ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে শৈথিল্যের কারণ হতে পারে? কিছু মানুষ বিভিন্ন বর্ণনার ভুল ব্যাখ্যা করে মনে করেন, আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা থাকলেই আমলের প্রয়োজন নেই কিংবা মানুষ শরয়ি দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যায়। এই ধারণার জবাবে মরহুম আয়াতুল্লাহ হায়েরি শিরাজী (রহ.) গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।

তিনি বলেন, আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসাকে গুনাহের অনুমতিপত্র হিসেবে মনে করা একটি গুরুতর ভুল এবং তাঁদের প্রতি আরোপিত একটি ভিত্তিহীন অপবাদ। কারণ কোনো নিষ্পাপ ইমাম (আ.) কখনো এমন শিক্ষা দেননি। পবিত্রতার পথে চলতে চলতে কেউ যদি অপবিত্রতার দিকে ধাবিত হয়, তবে তাকে তাগুতের প্রভাবমুক্ত বলা যায় না।

মানুষ সবসময় দুটি পথের মুখোমুখি থাকে— আল্লাহর অভিভাবকত্ব (ওলায়াতুল্লাহ) এবং তাগুতের অভিভাবকত্ব (ওলায়াতে তাগুত)। তাগুতকে কেবল কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা অস্বাভাবিক শক্তি হিসেবে কল্পনা করা ঠিক নয়। যখন মানুষ নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে কোনো গুনাহে লিপ্ত হয়—যেমন গীবত করে—তখন সে সেই মুহূর্তে তাগুতের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ গুনাহের সময় নফসে আম্মারা তার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

তবে এমনও হতে পারে যে, একজন মানুষ আল্লাহর বেলায়াতের পথে অগ্রসর হচ্ছে এবং তার অন্তরে ইমাম আলী (আ.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা বিদ্যমান; কিন্তু কোনো এক সময় সে ভুল বা গুনাহে পতিত হলো। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিচ্যুতি তাকে মূল পথ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয় না। কারণ প্রকৃত মুমিন গুনাহের পরপরই আত্মগ্লানি ও অনুশোচনায় আক্রান্ত হয় এবং দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।

এ ধরনের মানুষের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে:

حُبُّ عَلِیٍّ حَسَنَةٌ لَا تَضُرُّ مَعَهَا سَیِّئَةٌ

আয়াতুল্লাহ হায়েরি শিরাজী (রহ.)’র ব্যাখ্যায় এর অর্থ হলো, যখন শয়তানের কোনো কুমন্ত্রণা বা প্রলোভন তাদের স্পর্শ করে, তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। ফলে তারা দ্রুত নিজেদের সংশোধনের পথে ফিরে আসে।

এটাই আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসার অন্যতম প্রভাব। এই ভালোবাসা মানুষকে স্থায়ী অধঃপতন থেকে রক্ষা করে এবং তওবা ও প্রত্যাবর্তনের পথ তার জন্য উন্মুক্ত রাখে।

তিনি আরও বলেন, আল্লাহর বেলায়াতের অধীনে থাকা কোনো ব্যক্তি গুনাহে লিপ্ত হতে পারেন, কিন্তু সেই গুনাহ তাকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করে না। কারণ তার অন্তরে এখনও ঈমান ও আল্লাহর বেলায়াত সক্রিয় থাকে। তাই ভুল
করার পর তার বিবেক জাগ্রত হয়, অন্তরে আলোড়ন সৃষ্টি হয়, সে অনুতপ্ত হয় এবং তওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।

কিছু বর্ণনায় যে বলা হয়েছে,

حُبُّ عَلِیٍّ حَسَنَةٌ لَا تَضُرُّ مَعَهَا سَیِّئَةٌ

এর অর্থ কখনোই এই নয় যে ইমাম আলী (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা নামাজ, রোজা বা অন্যান্য ধর্মীয় কর্তব্যের বিকল্প। আবার এটাও নয় যে এই ভালোবাসা গুনাহকে বৈধ করে দেয়। এ ধরনের ব্যাখ্যা বর্ণনার ভুল অনুধাবনের ফল, ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা নয়।

ইমাম আলী (আ.)-এর প্রকৃত প্রেমিক গুনাহের ওপর অটল থাকে না। কারণ তাঁর প্রতি ভালোবাসা মানুষকে নিজের ভুলের ব্যাপারে সচেতন ও সংবেদনশীল করে তোলে। ফলে গুনাহ তার চরিত্রে স্থায়ীভাবে শিকড় গাড়তে পারে না। সে ভুল করলে দ্রুত সংশোধন, আত্মশুদ্ধি ও তওবার পথে অগ্রসর হয় এবং হৃদয়ের গভীর থেকে প্রার্থনা করে—“হে আলী, (আল্লাহর সাহায্যে) আমাকে পবিত্র করুন।”

প্রকৃতপক্ষে, আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা মানুষের অন্তরকে রূপান্তরিত করে; এটি কখনো দায়িত্বমুক্তির পথ নয়। বরং এই ভালোবাসা মানুষের মধ্যে পবিত্রতা, আত্মসমালোচনা, তওবা ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের চেতনাকে জীবন্ত রাখে। এ কারণেই বলা যায়, ইমাম আলী (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা মানুষকে গুনাহের অজুহাত নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতার পথে পরিচালিত করে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha