শুক্রবার ১২ জুন ২০২৬ - ১০:২৬
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর তাওকী‘আত তথা লিখিত নির্দেশনাবলি

আকীদাগত প্রশ্নের সমাধান, সংশয় নিরসন এবং দ্বীনি দিকনির্দেশনা প্রদানের ক্ষেত্রে ইমাম মাহদী (আজ্জাল্লাহু তাআলা ফারাজাহুশ শরীফ)-এর তাওকী‘আত বা লিখিত নির্দেশনাবলি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে প্রেরিত এসব পত্র ও উত্তর শিয়াদের জন্য হিদায়াত ও নির্দেশনার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মাহদাভিয়াতবিষয়ক ধারাবাহিক আয়োজন ‘একটি আদর্শ সমাজের দিকে’-এর এই পর্বে তাওকী‘আত সম্পর্কে আলোচনা উপস্থাপন করা হলো:

তাওকী‘আত কী?
‘তাওকী’ (توقيع) শব্দের অর্থ স্বাক্ষর বা মন্তব্য। সাধারণ ব্যবহারে এটি শাসক বা রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষ থেকে প্রদত্ত লিখিত নির্দেশনার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। তবে শিয়া পরিভাষায় তাওকী‘আত বলতে বোঝানো হয়—গায়েবাত (অদৃশ্যকাল) অবস্থায় ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর পক্ষ থেকে তাঁর বিশেষ প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রেরিত পত্র ও নির্দেশনাসমূহ।

তাওকী‘আতের প্রকারভেদ
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর তাওকী‘আতকে সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়—

ক. ক্ষুদ্র গায়েবাতকালীন তাওকী‘আত (গায়বাতে সোগরা)
সংক্ষিপ্ত গায়েবাতের সময় চারজন নায়েব—উসমান ইবনে সাঈদ, মুহাম্মদ ইবনে উসমান, হুসাইন ইবনে রুহ এবং আলী ইবনে মুহাম্মদ সামুরী—এর মাধ্যমে শিয়াদের প্রশ্ন ও সমস্যার জবাবে তাওকী‘আত প্রেরিত হতো। এসব তাওকী‘আতের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শিয়াদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা এবং তাদের বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করা।

খ. বৃহৎ গায়েবাতকালীন তাওকী‘আত (গায়বাতে কুবরা)
বৃহৎ বা অনির্দিষ্টকালীন গায়েবাতের সময় ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ থাকলেও, বিশেষ প্রয়োজন ও পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে তাওকী‘আত পৌঁছেছে বলে বর্ণিত আছে। এসব তাওকী‘আত সাধারণত গোপন রাখা হতো এবং প্রয়োজন ছাড়া প্রকাশ করা হতো না।

এ সময়কার তাওকী‘আতগুলোর প্রধান বিষয় ছিল—আকীদাগত প্রশ্নের উত্তর, ব্যক্তিত্ব যাচাই, সমকালীন সমস্যার সমাধান এবং শিয়াদের দিকনির্দেশনা প্রদান।

তাওকী‘আত কি ইমামের নিজ হাতে লেখা ছিল?
সব তাওকী‘আত ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর নিজ হাতে লেখা—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না; আবার সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করাও সম্ভব নয়।

কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, কিছু তাওকী‘আত ইমামের নিজস্ব হাতের লেখা ছিল এবং সে সময়ের নির্ভরযোগ্য সাহাবি ও আলেমগণ সেই হাতের লেখাকে চিনতেন।

উদাহরণস্বরূপ, ইসহাক ইবনে ইয়াকুব বলেন—

سَأَلْتُ مُحَمَّدَ بْنَ عُثْمَانَ الْعَمْرِيَّ أَنْ يُوصِلَ لِي كِتَابًا قَدْ سَأَلْتُ فِيهِ عَنْ مَسَائِلَ أَشْكَلَتْ عَلَيَّ، فَوَقَعَ التَّوْقِيعُ بِخَطِّ مَوْلَانَا صَاحِبِ الدَّارِ

আমি মুহাম্মদ ইবনে উসমান আমরিকে অনুরোধ করলাম আমার একটি চিঠি ইমামের কাছে পৌঁছে দিতে, যাতে আমি কিছু জটিল প্রশ্ন লিখেছিলাম। পরে উত্তরে আমাদের মাওলা ‘সাহিবুল দার’-এর নিজস্ব হাতের লেখা তাওকী‘আত আমার কাছে পৌঁছে।
[বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৫১, পৃষ্ঠা ৩৪৯]

অন্যদিকে, কিছু বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে সব তাওকী‘আত ইমামের নিজ হাতে লেখা ছিল না।

যেমন, আবু নসর হিবাতুল্লাহ বলেন—

وَكَانَتْ تَوْقِيعَاتُ صَاحِبِ الأَمْرِ عَلَيْهِ السَّلَامُ تَخْرُجُ عَلَى يَدَيْ عُثْمَانَ بْنِ سَعِيدٍ وَابْنِهِ مُحَمَّدِ بْنِ عُثْمَانَ إِلَى شِيعَتِهِ ... بِالْخَطِّ الَّذِي كَانَ يَخْرُجُ فِي حَيَاةِ الحَسَنِ عَلَيْهِ السَّلَام

দুই প্রতিনিধি উসমান ইবনে সাঈদ ও তাঁর পুত্র মুহাম্মদ ইবনে উসমান-এর মাধ্যমে শিয়াদের কাছে পৌঁছত, এবং তা সেই একই লেখার ধরনে হতো যা ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর সময় ব্যবহৃত হতো।
[বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৫১, পৃষ্ঠা ৩৪৬]

তাওকী‘আত গায়েবাতকালীন অবস্থায় শিয়াদের জন্য হিদায়াত ও দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এগুলো কেবল ঐতিহাসিক দলিল নয়; বরং আকীদা, চিন্তা ও আধ্যাত্মিক জীবনের জন্যও মূল্যবান নির্দেশনা বহন করে।

এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে…

উৎস: ‘দারসনামা-এ মাহদাভিয়াত’— খোদা-মুরাদ সোলাইমান (সামান্য সম্পাদনাসহ)

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha