হাওজা নিউজ এজেন্সি: পবিত্র মহররম মাসের আগমন উপলক্ষে হাওজা নিউজ এজেন্সি ‘মাসিরে হুসাইনি’ শীর্ষক বিশেষ ধারাবাহিক প্রকাশ করছে। হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন শায়খ জাওয়াদ মুহাদ্দিসির উপস্থিতিতে ‘শরহে জিয়ারতে আশুরা’-এর মাধ্যমে আহলে বাইত (আ.)-এর জ্ঞানভাণ্ডারের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। এ বিশেষ আয়োজন সাইয়্যিদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বিশ্বস্ত শোকপালনকারী ও সম্মানিত পাঠকদের প্রতি নিবেদিত।
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ. السَّلَامُ عَلَيْكَ يَا أَبَا عَبْدِ اللَّهِ (عليه السلام).
মহররম মাসের আগমনে আহলে বাইত (আ.)-এর সকল প্রেমিক ও অনুসারীদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ, এ আশুরার দিনগুলোতে আমরা জিয়ারতে আশুরার ব্যাখ্যাকে কেন্দ্র করে কিছু আলোচনা উপস্থাপন করব।
মূল আলোচনায় প্রবেশের আগে, জিয়ারত এবং বিশেষ করে জিয়ারতে আশুরা সম্পর্কে কয়েকটি মৌলিক বিষয় তুলে ধরা প্রয়োজন।
জিয়ারতনামা: দ্বীনি জ্ঞানের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার
আমাদের জিয়ারতনামাগুলোতে আহলে বাইত (আ.)-এর পক্ষ থেকে উচ্চতর দ্বীনি জ্ঞান ও গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষার সমাবেশ ঘটেছে। কুরআনের আয়াত, আহলে বাইত (আ.)-এর হাদিস এবং মাসূমদের দোয়ার পাশাপাশি ইমামদের সূত্রে বর্ণিত জিয়ারতনামাগুলোও ইসলামী জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
ইসলাম ও আহলে বাইত (আ.) সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধির জন্য জিয়ারতনামার বিষয়বস্তু নিয়ে চিন্তা, গবেষণা ও মনোযোগী অধ্যয়ন প্রয়োজন।
তাই জিয়ারতে আশুরা কিংবা অন্য কোনো জিয়ারত কেবল সওয়াবের উদ্দেশ্যে পাঠ করা উচিত নয়; বরং এর অন্তর্নিহিত দ্বীনি শিক্ষা ও উচ্চতর জ্ঞানের অনুসন্ধানের নিয়তও থাকা প্রয়োজন।
জিয়ারতে আশুরার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব
বিভিন্ন জিয়ারতের মধ্যে জিয়ারতে আশুরা বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। আহলে বাইত (আ.)-এর ইমামগণ এবং আল্লাহভীরু মনীষীরা এ জিয়ারত পাঠে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। আশুরার দিন হোক কিংবা বছরের অন্য যেকোনো দিন—পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে সুযোগ হলে এ জিয়ারত পাঠ করা মুস্তাহাব এবং এর রয়েছে অসংখ্য বরকত ও আধ্যাত্মিক প্রভাব।
মাসূর জিয়ারতের প্রতি গুরুত্ব
ইমামদের জিয়ারতের ক্ষেত্রে যথাসম্ভব ‘মাসূর’ ও ‘মানকূল’ জিয়ারত পাঠ করা উত্তম; অর্থাৎ যেসব জিয়ারত নির্ভরযোগ্য সূত্রে স্বয়ং আহলে বাইত (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে।
যদিও জিয়ারতের মূল উদ্দেশ্য হলো ইমামদের দরবারে উপস্থিত হয়ে সালাম নিবেদন, ভালোবাসা প্রকাশ, আনুগত্যের ঘোষণা এবং তাঁদের স্মরণ করা; তবে ইমামদের মর্যাদা যেহেতু অত্যন্ত উচ্চ এবং আমাদের উপলব্ধি সীমিত, তাই তাঁদের সম্পর্কে যে শব্দ ও বর্ণনা ব্যবহার করব, তা যদি তাঁদেরই শিক্ষা থেকে নেওয়া হয়, তবে সেটিই হবে অধিকতর যথাযথ।
কারণ, তাঁরা নিজের মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে অন্য সবার চেয়ে অধিক অবগত।
জিয়ারত: আদর্শ গ্রহণ ও আদর্শ উপস্থাপনের মাধ্যম
জিয়ারত এক ধরনের আদর্শ গ্রহণ ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া। যখন আমরা ইমামদের পবিত্র দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁদের গুণাবলি ও মর্যাদা স্মরণ করি, তখন প্রকৃতপক্ষে আমরা মানবজাতির সামনে শ্রেষ্ঠ আদর্শকে তুলে ধরি।
আমরা যেন বলতে চাই—এমন মহৎ গুণাবলি ও অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিত্বদের প্রতিই আমাদের আনুগত্য। আমরা অন্য কারও নয়, বরং আহলে বাইত (আ.)-এর প্রশংসা করি, তাঁদের অনুসরণকে গৌরব মনে করি এবং তাঁদের জীবনাদর্শকেই গ্রহণযোগ্য পথ হিসেবে ঘোষণা করি।
এ কারণেই ইমামগণ কিছু বিশেষ জিয়ারত ও জিয়ারতনামা পাঠের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ইতিহাসের দমবন্ধ পরিবেশে জিয়ারত ছিল জিহাদে তাবয়ি’ন
উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসনামলে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, যখন আহলে বাইত (আ.)-এর গুণাবলি ও মর্যাদা মানুষের কাছে পৌঁছাতে দেওয়া হতো না। তাঁরা ছিলেন নির্যাতিত ও সামাজিকভাবে উপেক্ষিত।
এমন পরিস্থিতিতে জিয়ারত হয়ে ওঠে জিহাদে তাবয়ীনের এক কার্যকর মাধ্যম। জিয়ারতনামার মাধ্যমে আহলে বাইত (আ.)-এর বৈশিষ্ট্য, আদর্শ, গুণাবলি ও মর্যাদা মানুষের সামনে তুলে ধরা হতো।
তবে জিয়ারতনামা কেবল প্রশংসাগাথা নয়; বরং এতে রয়েছে গভীর আকিদাগত, নৈতিক ও আত্মিক শিক্ষার ভাণ্ডার।
জিয়ারতে আমিনিল্লাহ (আমীনুল্লাহ): আত্মগঠনের শিক্ষা
উদাহরণ হিসেবে জিয়ারতে আমীনুল্লাহর কথা উল্লেখ করা যায়। এ জিয়ারত যেকোনো ইমামের জিয়ারতে পাঠ করা যায়।
প্রথম কয়েকটি বাক্যে ইমামের প্রতি সালাম নিবেদনের পর এর বিষয়বস্তু আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের দিকে প্রবাহিত হয়।
اللّٰهُمَّ فَاجْعَلْ نَفْسِي مُطْمَئِنَّةً بِقَدَرِكَ، رَاضِيَةً بِقَضَائِكَ...
"হে আল্লাহ! আমার নফসকে আপনার নির্ধারণে প্রশান্ত এবং আপনার ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট করে দিন।"
এবং—
اللّٰهُمَّ إِنَّ قُلُوبَ الْمُخْبِتِينَ إِلَيْكَ وَالِهَةٌ...
এভাবে পুরো জিয়ারতজুড়ে মানুষের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক পরিশুদ্ধির শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে।
জিয়ারত: ইমামদের সঙ্গে অঙ্গীকার নবায়ন
জিয়ারত মূলত ইমামদের সঙ্গে আনুগত্যের অঙ্গীকার পুনর্নবীকরণ।
এ প্রসঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে বলা হয়েছে—
إِنَّ لِكُلِّ إِمَامٍ عَهْداً فِي عُنُقِ شِيعَتِهِ وَأَوْلِيَائِهِ، وَإِنَّ مِنْ تَمَامِ الْوَفَاءِ بِالْعَهْدِ وَأَدَاءِ الْحَقِّ، زِيَارَةَ قُبُورِهِمْ
প্রত্যেক ইমামের প্রতি তাঁর শিয়া ও অনুসারীদের একটি অঙ্গীকার রয়েছে। আর সেই অঙ্গীকার পূর্ণাঙ্গভাবে রক্ষা এবং তাঁদের হক আদায়ের অন্যতম নিদর্শন হলো তাঁদের কবর জিয়ারত করা।
আশুরার দিনে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জিয়ারতের মর্যাদা
ইমাম সাদিক (আ.) ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জিয়ারতের ফজিলত সম্পর্কে বলেছেন—
كَأَنَّمَا زَارَ قَبْرَ الْحُسَيْنِ عَلَيْهِ السَّلَامُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ كَمَنْ تَشَهَّدَ بِدَمِهِ بَيْنَ يَدَيْهِ
যে ব্যক্তি আশুরার দিনে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কবর জিয়ারত করবে, সে যেন তাঁর সম্মুখে জিহাদ করে নিজের রক্তে গড়াগড়ি দিয়েছে।
এ জিয়ারত নিকট থেকেও করা যায়, আবার দূর থেকেও।
দূর থেকে জিয়ারতের পদ্ধতি
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন—
إِذَا بَعُدَتْ بِأَحَدِكُمُ الشُّقَّةُ...
যখন তোমাদের কারও জন্য পথ দূর হয়ে যায়...
এরপর তিনি বলেন—
فَلْيَعْلُ أَعْلَى مَنْزِلِهِ
সে যেন নিজের ঘরের সর্বোচ্চ স্থানে উঠে যায়।
দুই রাকাত নামাজ আদায় করে ইমামদের কবরের দিকে ইশারা করে সালাম জানাবে।
فَإِنَّ ذَلِكَ يَصِلُ إِلَيْنَا
নিশ্চয়ই তোমাদের সেই সালাম আমাদের কাছে পৌঁছে যায়।
প্রতিদিন ফেরেশতাদের জিয়ারত
ইমাম সাদিক (আ.) একবার সাদীর সাইরাফিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি প্রতিদিন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কবর জিয়ারত করো?”
তিনি বললেন, না।
ইমাম বললেন, “তোমরা কতই না উদাসীন!”
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “প্রতি জুমায় করো?”
তিনি বললেন, না।
“প্রতি মাসে?”
তবুও উত্তর ছিল নেতিবাচক।
তখন ইমাম বললেন, “তোমরা কতই না উদাসীন! আল্লাহর ফেরেশতারা প্রতিদিন হাজার হাজার বার ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কবর জিয়ারত ও তাওয়াফ করে।”
সাদীর বললেন, আমাদের অবস্থান তো অনেক দূরে।
তখন ইমাম সাদিক (আ.) বললেন—
اِصْعَدْ فَوْقَ سَطْحِكَ
তোমার ঘরের ছাদে উঠে যাও।
এরপর ডানে-বামে তাকিয়ে আকাশের দিকে দৃষ্টি তুলে—
ثُمَّ عَنْهُ نَحْوَ الْقَبْرِ
এরপর ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কবরের দিকে মনোনিবেশ করে বলো—
السَّلَامُ عَلَيْكَ يَا أَبَا عَبْدِ اللَّهِ، السَّلَامُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
ইয়া আবা আবদিল্লাহ! আপনার প্রতি সালাম, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক আপনার ওপর।
ইমাম বলেন, এভাবেও পূর্ণাঙ্গ জিয়ারতের সওয়াব লাভ করা যায় এবং তার জন্য হজ ও উমরার সওয়াব লিপিবদ্ধ করা হয়।
চলবে....
এ পর্বে জিয়ারতের প্রয়োজনীয়তা, জিয়ারতনামার জ্ঞানমূল্য এবং জিয়ারতে আশুরার গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। ইনশাআল্লাহ, পরবর্তী পর্বগুলোতে জিয়ারতে আশুরার বিভিন্ন অংশের ব্যাখ্যা ও গভীর তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
وَالسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ.
আপনার কমেন্ট