পবিত্র মুহাররম মাস উপলক্ষে হাওজা নিউজ এজেন্সি ‘আশুরার জিয়ারত’ শীর্ষক বিশেষ ধারাবাহিক প্রকাশ করেছে। এই ধারাবাহিকের মাধ্যমে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন জাওয়াদ মুহাদ্দিসীর ব্যাখ্যার আলোকে আশুরার জিয়ারতের বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে আহলুল বাইত (আ.)-এর জ্ঞান ও শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এই বিশেষ ধারাবাহিকটি শ্রদ্ধেয় পাঠক ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শোকানুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়েছে।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সাল্লাল্লাহু আলাইকা ইয়া আবা আবদিল্লাহ
এ সময় আহলুল বাইত (আ.)-এর শোক ও বেদনার দিনসমূহ। মহান আল্লাহ যেন আপনাদের শোকানুষ্ঠান কবুল করেন। আপনাদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাই এবং সালাম পেশ করছি—আপনাদের প্রতি, যাদের হৃদয়, মন ও আত্মা ইমাম আবু আবদিল্লাহ আল-হুসাইন (আ.)-এর ভালোবাসায় পূর্ণ।
আমরা সৌভাগ্যবান যে আশুরার জিয়ারতের কিছু অংশ ব্যাখ্যা করার সুযোগ পেয়েছি। যদি এর একটি কাঠামোগত পরিচয় দিতে হয়, তবে বলা যায়—এটি মূলত তাশাইয়্যুর ঘোষণাপত্র এবং একজন শিয়ার ব্যবহারিক জীবনবিধান। এই জিয়ারতের ভেতরে ‘তাওয়াল্লা’ (আহলুল বাইত (আ.)-এর সঙ্গে বন্ধুত্ব ও আনুগত্য) এবং ‘তাবাররা’ (তাঁদের শত্রুদের থেকে বিচ্ছিন্নতা ও ঘৃণা)—এই দুই মৌলিক নীতি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
আমাদের লক্ষ্য হলো এই ধারণাগুলো সঠিকভাবে অনুধাবন করা এবং বাস্তব জীবনে আহলুল বাইত (আ.)-এর সেই পথ অনুসরণ করা—যে পথে তাঁরা সর্বদা সত্যের পাশে অবস্থান নিয়েছেন এবং বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন।
যদি আশুরার জিয়ারতের কাঠামো বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় এর মূল ভিত্তি দুটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—তাওয়াল্লা ও তাবাররা। অর্থাৎ সত্যপন্থীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং জুলুম ও বাতিলের বিরুদ্ধে অবস্থান।
জিয়ারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে—
إِنِّي سِلْمٌ لِمَنْ سَالَمَكُمْ وَحَرْبٌ لِمَنْ حَارَبَكُمْ وَوَلِيٌّ لِمَنْ وَالاكُمْ وَعَدُوٌّ لِمَنْ عَادَاكُمْ
“আমি তাদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে আছি, যারা তোমাদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে; আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে; আমি তাদের বন্ধু, যারা তোমাদের বন্ধু; এবং আমি তাদের শত্রু, যারা তোমাদের শত্রু।”
আশুরার জিয়ারতে বারবার এই বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে যে, আহলুল বাইত (আ.)-এর অনুসারী হিসেবে আমাদের বন্ধুত্ব, শত্রুতা, সমর্থন, বিরোধিতা, শান্তি ও যুদ্ধের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট মানদণ্ড থাকতে হবে। সেই মানদণ্ড হলো আহলুল বাইত (আ.)-এর অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি।
আমাদের জানতে হবে—কারা আহলুল বাইত (আ.)-এর বন্ধু এবং কারা তাঁদের শত্রু; কারা তাঁদের আদর্শকে সমর্থন করে এবং কারা তার বিরোধিতা করে। আজও এমন বহু ধারা ও প্রবণতা বিদ্যমান, যা আহলুল বাইত (আ.)-এর মাযহাব ও শিক্ষার বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করে। এসব প্রবাহকে চিহ্নিত করা আমাদের জন্য অপরিহার্য।
দুঃখজনকভাবে, অনেক মানুষ সন্দেহ, বিভ্রান্তি ও ফিতনার কারণে এমন অবস্থানে পৌঁছে যায় যে, শত্রুকে বন্ধু এবং বন্ধুকে শত্রু মনে করতে শুরু করে। কিন্তু যদি আমাদের মানদণ্ড আহলুল বাইত (আ.) হন, তবে আমরা এ বিভ্রান্তিতে পড়ব না। তখন আমরা তাঁদের বন্ধুদের বন্ধু এবং তাঁদের শত্রুদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করব।
আজও আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ইসলামবিরোধী ঔদ্ধত্যবাদী শক্তি এবং জায়োনবাদী প্রবণতার মোকাবিলায় আমাদের অবস্থান স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন হওয়া উচিত।
শিয়া মাযহাবকে দুর্বল করার জায়োনবাদী কৌশল
কিছু জায়োনবাদী চিন্তাবিদ মনে করেন যে, বর্তমান বিশ্বে শিয়া মাযহাব এমন এক শক্তিশালী পাখির মতো, যা ক্রমাগত উড্ডয়ন করছে; এবং এর দুটি শক্তিশালী ডানা রয়েছে—একটি লাল এবং একটি সবুজ।
তাদের মতে, এই মাযহাবের বিস্তার ও আকর্ষণ কমাতে হলে এই দুই ডানাকে অকার্যকর করে দিতে হবে।
লাল ডানা হলো আশুরা, ইমাম হুসাইন (আ.) এবং শাহাদাত, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের সংস্কৃতির প্রতীক।
সবুজ ডানা হলো মাহদাভিয়াত, প্রতীক্ষার সংস্কৃতি এবং ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর প্রতি বিশ্বাসের প্রতীক।
এ কারণেই আমরা দেখতে পাই যে, আশুরা ও মাহদাভিয়াতকে বিকৃত করার উদ্দেশ্যে ব্যাপক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমভিত্তিক ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। কুসংস্কার, ভিত্তিহীন রীতি এবং ধর্মবহির্ভূত উদ্ভাবনের মাধ্যমে এসব মহান আদর্শকে কলুষিত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
অতএব, আমাদের কর্তব্য হলো আহলুল বাইত (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় রাখা, তাঁদের শত্রুদের চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা। এই বিষয়ে আমাদের অবস্থান হতে হবে দৃঢ়, সচেতন ও নীতিনিষ্ঠ।
এ প্রসঙ্গে সাফওয়ান জাম্মালের ঘটনা অত্যন্ত শিক্ষণীয়। বর্ণিত আছে, তিনি ছিলেন উটের মালিক এবং পরিবহন ব্যবসায়ী। তিনি তাঁর উটগুলো হারুনুর রশীদের অনুসারীদের হজযাত্রার জন্য ভাড়া দিয়েছিলেন।
একদিন ইমাম মূসা আল-কাজিম (আ.) তাঁকে বললেন: “তুমি কেন তোমার উটগুলো তাদের কাজে দিয়েছ?”
সাফওয়ান বললেন: “আমি এগুলো হজের জন্য ভাড়া দিয়েছি।”
ইমাম (আ.) বললেন: “তুমি কি চাও তারা নিরাপদে ফিরে আসুক, যাতে তারা তোমার ভাড়া পরিশোধ করতে পারে?”
তিনি বললেন: “হ্যাঁ।”
ইমাম (আ.) বললেন, “তাহলে জেনে রাখ, তাদের নিরাপদে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করার মধ্যেই তুমি একভাবে তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছ।”
এই ঘটনা অত্যন্ত গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। বর্ণনা অনুযায়ী, সাফওয়ান তা শোনার পর তার উটগুলো বিক্রি করে দেন এবং এরপর আর কখনো এ ধরনের কাজ করেননি। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, পার্থিব স্বার্থের কারণেও আহলুল বাইত (আ.)-এর শত্রুদের সহায়ক হওয়া উচিত নয়।
সত্য ও বাতিলের সীমারেখা সম্পর্কে সতর্কতা
আজও আমরা একই বাস্তবতার মুখোমুখি। যারা শিয়াভীতি সৃষ্টি করে এবং আহলুল বাইত (আ.)-এর প্রকৃত মাযহাবের বিপরীতে বিভ্রান্তিকর ধারা সৃষ্টি করে, তারা মূলত শত্রুতামূলক শক্তিরই অংশ। তাই সাংস্কৃতিক, মিডিয়া ও সামাজিক ক্ষেত্রেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন আমরা অজান্তেই তাদের জন্য পথ সুগম না করি।
আমরা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি—তিনি যেহেতু আমাদেরকে আহলুল বাইত (আ.)-এর পরিচয় ও ভালোবাসার সৌভাগ্য দান করেছেন, তাই যেন আমাদের এই পথে অবিচল রাখেন।
وَأَسْأَلُ اللَّهَ الَّذِي أَكْرَمَنِي بِمَعْرِفَتِكُمْ...»
আমরা সেই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, যিনি আমাদেরকে আপনাদের ও আপনাদের সত্যিকারের অনুসারীদের পরিচয় দিয়ে সম্মানিত করেছেন। এই পরিচয় ও ভালোবাসা আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ, যা তিনি তাঁর নির্বাচিত বান্দাদের দান করেন।
আমরা তাঁর কাছে আরও প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে আপনাদের শত্রুদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার তাওফিক দান করেন এবং সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা স্পষ্টভাবে বুঝার সক্ষমতা দেন।
أَنْ يَجْعَلَنِي مَعَكُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
আমরা প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে আপনাদের সঙ্গী ও অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত করেন।
أَنْ يُثَبِّتَ لِي قَدَمَ صِدْقٍ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
আমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে সত্যের পথে দৃঢ়তা ও অবিচলতা দান করেন, যাতে আমরা আহলুল বাইত (আ.)-এর পথে স্থির থাকতে পারি।
এবং আমরা আল্লাহর কাছে আরও প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে সেই প্রশংসনীয় মর্যাদার অংশীদার করেন, যা তিনি আহলুল বাইত (আ.)-এর জন্য নির্ধারণ করেছেন।
وَرَزَقَنِي ثَأْرَكَ مَعَ إِمَامٍ هُدًى مَهْدِيٍّ...
হে আল্লাহ! আমাদেরকে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর নেতৃত্বে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহণের তাওফিক দান করুন।
ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার কমেন্ট