পবিত্র মহররম মাস উপলক্ষে হাওজা নিউজ এজেন্সি’তে প্রকাশিত আশুরার জিয়ারতবিষয়ক বিশেষ ধারাবাহিকে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন জাওয়াদ মুহাদ্দিসী এই জিয়ারতের বিভিন্ন অংশের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন, যাতে আহলুল বাইত (আ.)-এর জ্ঞান ও শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি এবং তাঁরই সাহায্য প্রার্থনা করি। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নেতা হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এবং তাঁর পবিত্র আহলুল বাইতের ওপর।
আসসালামু আলাইকা, ইয়া আবা আবদিল্লাহ।
আশুরার জিয়ারতের ব্যাখ্যায় আমরা এমন একটি গভীর, দিকনির্দেশনামূলক ও জীবন-গঠনকারী বাক্যের মুখোমুখি হই, যেখানে আমরা মহান আল্লাহর কাছে এভাবে প্রার্থনা করি—
اللَّهُمَّ اجْعَلْ مَحْيَايَ مَحْيَا مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ وَمَمَاتِي مَمَاتَ مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ
“হে আল্লাহ! আমার জীবনযাপনকে মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র পরিবারের জীবনযাপনের অনুরূপ করুন এবং আমার মৃত্যুকেও তাঁদের মৃত্যুর অনুরূপ করুন।”
এই দোয়াটি অন্যান্য জিয়ারত ও মুনাজাতেও অনুরূপ ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। যেমন—
اللهم اجعل حياتي حياة محمد وآل محمد، ومماتي ممات محمد وآل محمد
এই বাক্যের একটি সূক্ষ্ম ও গভীর তাৎপর্য হলো, এখানে ‘মাহইয়া’ ও ‘মামাত’ শব্দ দুটি ব্যবহৃত হয়েছে, ‘হায়াত’ ও ‘মওত’ শব্দের পরিবর্তে। ‘মাহইয়া’ অর্থ জীবনযাপনের ধরন বা জীবনধারা, আর ‘মামাত’ অর্থ মৃত্যুর ধরন বা মৃত্যুবরণ করার পদ্ধতি। তাই এই দোয়াটি সরাসরি ইসলামী জীবনধারা-র ধারণার প্রতি ইঙ্গিত করে।
অর্থাৎ, আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, যেন আমাদের জীবন ও মৃত্যু রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলুল বাইতের লক্ষ্য, আদর্শ ও সংগ্রামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়; যেন আমরা সেই পথেই চলি, যে পথে তাঁরা জীবন অতিবাহিত করেছেন এবং যার জন্য তাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
মানবজীবনের তিনটি মৌলিক মাত্রা রয়েছে—
১. চিন্তা ও আকীদা,
২. নৈতিকতা ও আচরণ,
৩. শরয়ি বিধান ও ফিকহি নির্দেশনা—যেমন হালাল ও হারাম।
আমাদের জীবন ও মৃত্যু যদি আহলুল বাইত (আ.)-এর জীবনাদর্শ অনুসারে গড়ে ওঠে, তবে এর অর্থ হলো—এই তিনটি ক্ষেত্রেই আমরা তাঁদের পথ ও শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকব।
হযরত আবদুল আজিম হাসানি (রহ.) একদিন ইমাম হাদী (আ.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন— “হে রাসূলুল্লাহর সন্তান! আমি আমার বিশ্বাস ও আকীদাসমূহ আপনার সামনে উপস্থাপন করতে চাই, যাতে আপনি দেখেন সেগুলো সঠিক ও সত্য কি না।”
হযরত আবদুল আজিম হাসানি (রহ.) নিজেও আহলুল বাইত (আ.)-এর বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের অন্যতম ছিলেন এবং তিনি রাই নগরে (বর্তমান ইরানের রাজধানী তেহরান) সমাহিত আছেন। তা সত্ত্বেও তিনি আল্লাহর হুজ্জাত ও নিষ্পাপ ইমামের সামনে উপস্থিত হয়ে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যে তাঁর বিশ্বাস ও আকীদা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং তাতে কোনো বিচ্যুতি নেই।
তিনি তাঁর বিশ্বাসসমূহ ইমাম হাদী (আ.)-এর সামনে পেশ করলে ইমাম সেগুলোকে সত্য ও সঠিক বলে অনুমোদন করেন এবং তাঁকে সেই বিশ্বাসের ওপর দৃঢ় ও অবিচল থাকার নির্দেশ দেন।
অতএব, আমাদের আকীদাগত জীবনও আহলুল বাইত (আ.)-এর আকীদা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই গড়ে উঠতে হবে।
আমাদের নৈতিকতা, আচরণ, ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনও তাঁদের জীবনাদর্শের অনুসারী হওয়া উচিত। একইভাবে, আমাদের নামাজ, রোজা, হজ, লেনদেন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র সেই ফিকহের আলোকে পরিচালিত হওয়া উচিত, যা আহলুল বাইত (আ.)-এর মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছেছে।
এ প্রসঙ্গে ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর একটি সুপরিচিত উক্তি উল্লেখযোগ্য— “ফিকহ হলো দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার ব্যবহারিক তত্ত্ব।”

অর্থাৎ, একজন প্রকৃত ও আদর্শ মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত—জন্মের সময় কানে আজান ও ইকামত উচ্চারণ থেকে শুরু করে মৃত্যুর পর কবরের তালকিন পর্যন্ত—জীবনের প্রতিটি ধাপ আল্লাহর বিধান ও নির্দেশনার অধীন থাকে।
আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, যেন আমাদের জীবন ও মৃত্যু রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর পবিত্র পরিবারের জীবন ও মৃত্যুর অনুরূপ হয়। অর্থাৎ, আমাদের জীবন হবে বিশ্বাসকেন্দ্রিক এবং আমাদের আকীদা-বিশ্বাস বাস্তব জীবনে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এমন যেন না হয় যে আমরা কিছু বিশ্বাস কেবল মুখস্থ করে রেখেছি বা প্রশ্নের উত্তরে বলতে পারি, কিন্তু সেই বিশ্বাস আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে না।
ধর্মীয় জীবন মূলত দায়িত্ব ও কর্তব্যকেন্দ্রিক জীবন। মানুষকে প্রতিটি সময় ও প্রতিটি পরিস্থিতিতে উপলব্ধি করতে হবে যে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য কী।
ইমাম হুসাইন (আ.) ইরাকের পথে যাত্রাকালে বলেছিলেন—
وَاللهِ لَأَرْجُو أَنْ يَكُونَ خَيْرًا مَا أَرَادَ اللهُ بِنَا، قُتِلْنَا أَوْ ظَفَرْنَا
“আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তাতেই আমি কল্যাণ প্রত্যাশা করি—আমরা শহীদ হই কিংবা বিজয়ী হই।”
যেমন ইমাম খোমেনী (রহ.)-ও বলেছেন, শহীদ হওয়া কিংবা বিজয় অর্জন—উভয় ক্ষেত্রেই মুমিন সফল; কারণ উভয় অবস্থাতেই সে তার দায়িত্ব পালন করেছে।
ধর্মীয় জীবন কেবল মুখের বুলি বা আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়। এমন যেন না হয় যে আমরা কেবল মুসলিম পরিচয়ে পরিচিত, অথচ আমাদের জীবনে ইসলামের কোনো কার্যকর প্রভাব নেই।
আহলুল বাইত (আ.)-এর জীবন ছিল মর্যাদা, সম্মান ও স্বাধীনতার জীবন; তাঁরা কখনো অপমান ও লাঞ্ছনার জীবন মেনে নেননি।
ইমাম হুসাইন (আ.) বলেছেন—
مَوْتٌ فِي عِزٍّ خَيْرٌ مِنْ حَيَاةٍ فِي ذُلٍّ
“অপমানজনক জিন্দেগীর চেয়ে মর্যাদাপূর্ন মৃত্যু উত্তম।”
হাইহাত মিন্নায্-যিল্লাহ— এই চিরন্তন স্লোগানও এই চেতনারই বহিঃপ্রকাশ।
তিনি আরও ঘোষণা করেছিলেন—
لَا وَاللَّهِ لَا أُعْطِيهِمْ بِيَدِي إِعْطَاءَ الذَّلِيلِ وَلَا أُقِرُّ إِقْرَارَ الْعَبِيدِ
“আল্লাহর শপথ! আমি কখনো অপমানিত মানুষের মতো তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করব না এবং দাসদের মতো মাথা নত করব না।”
এই চেতনা আহলুল বাইত (আ.)-এর জীবনধারার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আমরাও যদি চাই, আমাদের জীবন ও মৃত্যু তাঁদের জীবনাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হোক, তবে আমাদের উচিত তাঁদের শিক্ষা, নির্দেশনা ও জীবনপদ্ধতিকে অনুসরণ করা।
এ বিষয়ে অসংখ্য হাদিস রয়েছে, যা আমাদেরকে আহলুল বাইতের জীবনধারা শিক্ষা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَيْسَ مِنَّا مَنْ غَشَّ مُسْلِمًا أَوْ ضَرَّهُ أَوْ مَاكَرَهُ
যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের সঙ্গে প্রতারণা করে, তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে অথবা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন—
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يُحْسِنْ مُجَاوَرَةَ مَنْ جَاوَرَهُ
“যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীর অধিকার যথাযথভাবে আদায় করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
তিনি আরও বলেছেন—
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يُحَاسِبْ نَفْسَهُ فِي كُلِّ يَوْمٍ
যে ব্যক্তি প্রতিদিন নিজের কর্মের হিসাব গ্রহণ করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
‘মুহাসাবাতুন নফস’ বা আত্মসমালোচনা ও আত্মমূল্যায়ন ছিল ইমামগণের (আ.) শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি।
অতএব, যখন আমরা বলি—
اللَّهُمَّ اجْعَلْ مَحْيَايَ مَحْيَا مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ وَمَمَاتِي مَمَاتَ مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ
তখন আমাদের উচিত তাঁদের আদর্শ, আচরণ, শিক্ষা ও বিশ্বাসকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের জীবনকে মূল্যায়ন করা। আমাদের জীবনে আহলুল বাইতের জীবনধারার যতটুকু প্রতিফলন ঘটবে, আমাদের প্রকৃত আনুগত্য ও অনুসরণও ততটুকুই প্রতিফলিত হবে।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁদের সত্যিকারের অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করুন।
ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার কমেন্ট