হাওজা নিউজ এজেন্সি: পবিত্র মহররম মাস উপলক্ষে শোকানুষ্ঠানের বিধান এবং সাইয়্যেদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শোকপালনের আদব ও আহকাম নিয়ে ইসলামী বিধানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন ওয়াহিদ পুরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক আলোচনার সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো:
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
আসসালামু আলাল হুসাইন, ওয়া আলা আলী ইবনিল হুসাইন, ওয়া আলা আওলাদিল হুসাইন, ওয়া আলা আসহাবিল হুসাইন।
মূলত শোকপালন ও আজাদারি ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে মুস্তাহাব বা অত্যন্ত প্রশংসনীয় আমল। এর মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। সকল ফকিহই এর সুপারিশযোগ্যতা সম্পর্কে ফতোয়া দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেছেন।
শুধু হাদিসের সাধারণ নির্দেশনাই নয়, বরং বিভিন্ন বর্ণনায় দেখা যায় যে আহলুল বাইতের ইমামগণ (আ.) এ বিষয়ে মানুষকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করেছেন।
ইমাম বাকির (আ.) এবং ইমাম সাদিক (আ.) নিজেরাও মারসিয়া পাঠ করতেন। এমন পরিবেশ সৃষ্টি হতো যে, নারীরা এক পাশে এবং পুরুষরা অন্য পাশে বসে অশ্রুসিক্ত নয়নে শোক প্রকাশ করতেন। কখনো কখনো শোক ও বেদনার তীব্রতায় কেউ কেউ অজ্ঞান হয়ে যেতেন। এ থেকেই বোঝা যায় যে, শোকপালনের মূল নীতি ইসলামে স্বীকৃত এবং তা নিঃসন্দেহে মুস্তাহাব।
ইমাম খোমেনী (রহ.)-কে একবার এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “সাইয়্যেদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য শোকসভা আয়োজন করা ‘আফযালুল কুরুবাত’ বা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সর্বোত্তম মাধ্যমসমূহের একটি।”
এখানে ‘কুরুবাত’ বলতে এমন সব আমলকে বোঝানো হয়েছে, যা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়তা করে। যদিও তাহাজ্জুদের নামাজসহ বহু ইবাদতের ব্যাপারে ইসলামে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, তবুও ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর ভাষায়, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের বিভিন্ন মাধ্যমের মধ্যে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শোকে অংশগ্রহণ এবং তাঁর জন্য অশ্রু বিসর্জন অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।
বাস্তব জীবনেও আমরা এর প্রতিফলন দেখতে পাই। ইমাম খোমেনী (রহ.) নিজে জামারানের হুসাইনিয়ায় নিয়মিতভাবে শোকসভায় অংশগ্রহণ করতেন। তিনি প্রতি বছর কালো পোশাক পরিধান করে এসব মজলিসে উপস্থিত হতেন এবং কথার পাশাপাশি নিজের কর্মের মাধ্যমেও এ বিষয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেন।
তবে বিষয়টি কেবল মুস্তাহাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কিছু কিছু পরিস্থিতিতে সাইয়্যিদুশ শুহাদা (আ.)-এর জন্য শোকপালন ওয়াজিব হয়ে যেতে পারে।
প্রথমে বিষয়টি বিস্ময়কর মনে হতে পারে, কিন্তু যখন দ্বীনের শিক্ষা ও আহলুল বাইত (আ.)-এর জ্ঞান প্রচারের অন্য কোনো কার্যকর মাধ্যম অবশিষ্ট না থাকে এবং শোকসভাই একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়, তখন এ দায়িত্ব ওয়াজিবের পর্যায়ে উন্নীত হয়।
অতীতেও বাস্তবতা অনেকটা এমনই ছিল। আধুনিক গণমাধ্যম, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম না থাকায় সাধারণ মানুষ ধর্মীয় শিক্ষা মূলত এসব শোকসভা থেকেই অর্জন করতেন। ফলে সেই সময়ে দ্বীনি জ্ঞান প্রচারের উদ্দেশ্যে মজলিস আয়োজন করা এবং তাতে অংশগ্রহণ করা ছিল অপরিহার্য দায়িত্ব।
অর্থাৎ, যদি আহলুল বাইত (আ.)-এর মাযহাব ও শিক্ষার প্রচারের একমাত্র মাধ্যম হয় এসব মজলিস, তাহলে তা আয়োজন করা এবং তাতে অংশগ্রহণ করা উভয়ই ওয়াজিব হয়ে যায়।
বর্তমান সময়েও বিশ্বের কিছু অঞ্চলে এমন পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকার কিছু দেশে হয়তো ধর্মীয় শিক্ষা এবং আহলুল বাইত (আ.)-এর আদর্শ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর মাধ্যম হিসেবে মহররমের মজলিসই প্রধান ভূমিকা পালন করছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনের ভিত্তিতে এসব মজলিস আয়োজন এবং তাতে অংশগ্রহণ ওয়াজিব হতে পারে।
সুতরাং, কখনো কখনো এসব মজলিসের আয়োজন, প্রসার, প্রচার এবং তাতে অংশগ্রহণ শরিয়তের দৃষ্টিতে আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়।
তবে শুধু মজলিস আয়োজনই যথেষ্ট নয়; বরং এসব মজলিসে কী বিষয়বস্তু উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
এই মজলিসগুলোর অন্যতম প্রধান উপাদান হলো কবিতা, নওহা ও মারসিয়া পাঠ, যা দীর্ঘদিন ধরেই শোকানুষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাধারণত এসব মজলিসের বিষয়বস্তু দুই ধরনের হয়ে থাকে—একটি হলো নজম বা কবিতাভিত্তিক উপস্থাপনা, অন্যটি হলো নসর বা বর্ণনামূলক রওযাখানি।
পাঠ করা কবিতা ও মার্সিয়ার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন—
প্রথমত: বিষয়বস্তু ও বার্তা
এসব কবিতা ও মার্সিয়ায় কী বলা হচ্ছে, তার বক্তব্য, শিক্ষাগত মূল্য এবং আকীদাগত শুদ্ধতা সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতে হবে।
দ্বিতীয়ত: উপস্থাপনার ধরন
এসব শোকগাথা এমনভাবে পরিবেশন করা যাবে না, যাতে তা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির গান বা বিনোদনমূলক সঙ্গীতের আদলে রূপ নেয়। এই সীমারেখা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরবর্তীতে এসব কবিতার ভাষা, বিষয়বস্তু, উপস্থাপনার ধরন এবং সুরের প্রকৃতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি এগুলো ‘গিনা’ (নিষিদ্ধ সঙ্গীতধর্মী সুর)-এর আওতাভুক্ত কি না, কিংবা এসব মজলিসে বাদ্যযন্ত্র ও বিনোদনমূলক উপকরণ ব্যবহারের বিধান কী—সেসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা হবে।
এছাড়া, কখনো কখনো যে ধরনের অপ্রচলিত বা শরিয়তবহির্ভূত শোকপালনের রীতি দেখা যায়, যা ঐতিহ্যগত ও ধর্মীয় কাঠামোর বাইরে চলে যায়, সেসব বিষয় নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার কমেন্ট