বুধবার ১ জুলাই ২০২৬ - ১০:২৮
খতিব ও মাদ্দাহদের জন্য সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর মজলিসের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও মানদণ্ড

নির্ভরযোগ্য মাকতাল ও ঐতিহাসিক সূত্রের ব্যবহার, শোক ও হামাসা-সমৃদ্ধ কবিতা ও মার্সিয়া পরিবেশন এবং গুলু বা ধর্মীয় সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত থাকা—এসবই সাইয়্যিদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মজলিস পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ নীতি। বিশেষত আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি উলুহিয়্যাত বা আল্লাহর জন্য নির্ধারিত গুণাবলি আরোপ করা ইসলামী আকিদার দৃষ্টিতে বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত; পাশাপাশি এটি ইসলাম ও আহলে বাইত (আ.)-এর অনুসারীদের বিরুদ্ধে শত্রুদের অপপ্রচারেরও সুযোগ সৃষ্টি করে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি:  মহররম সংক্রান্ত ধারাবাহিক আহকামের আজকের পর্ব:

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।

সাইয়্যেদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের শোকাবহ দিনগুলোতে আমরা গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। আমরা আশা করি, সবাই নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও ইখলাসের সঙ্গে তাঁর আজাদারিতে অংশগ্রহণ করতে পারব।

আমাদের বক্তব্য বিশেষভাবে তাঁদের উদ্দেশে, যারা জাকের, খতিব ও রওযাখান হিসেবে এই মহান দায়িত্ব পালন করেন। সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর মজলিস পরিচালনা এবং তার উষ্ণতা ও প্রাণবন্ততা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। মহান আল্লাহ তাঁদের সকল প্রচেষ্টা কবুল করুন এবং উত্তম প্রতিদান দান করুন।

তবে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যথাযথ সতর্কতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে পালন করা প্রয়োজন। কারবালার ঘটনাবলি নিয়ে বহু মাকতাল ও বর্ণনা বিদ্যমান; কিন্তু খতিব ও রওযাখানদের প্রত্যেক মাকতাল বা বর্ণনার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। ইসলামী বিপ্লব ও শহীদদের রক্তের বরকতে এ ক্ষেত্রে বহু গবেষণা ও মূল্যবান কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং দক্ষ ইতিহাসবিদেরা নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সূত্র সংকলন করেছেন।

এ ধরনের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দুই খণ্ডে প্রকাশিত মাকতাল-ই জামে‘-এ সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)। এটি একটি যৌথ গবেষণামূলক উদ্যোগ, যা মরহুম অধ্যাপক রাসূল জাফারিয়ান পীশওয়াইয়ের তত্ত্বাবধানে সম্পাদিত হয়েছিল। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত ও শক্তিশালী ইতিহাসবিদ। বিভিন্ন মাকতাল ও ঐতিহাসিক বর্ণনা পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই করে অধিকতর নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য তথ্য এতে সংকলিত হয়েছে।

সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর মজলিসে পাঠিত কবিতা ও মার্সিয়াও একই নীতিমালার অনুসারী হওয়া উচিত। আমাদের ইসলামী ও আহলে বাইতভিত্তিক কাব্যভাণ্ডারে বহু শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ রচনা রয়েছে। এসব কবিতায় যেমন মুসিবত ও শোকের চিত্র ফুটে উঠবে, তেমনি হামাসা, বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের চেতনাও প্রতিফলিত হবে।

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আন্দোলন কোনো একমাত্রিক আন্দোলন নয়; বরং এটি বহুমাত্রিক এক জাগরণ। এই আন্দোলনের হামাসিক ও বিপ্লবী চেতনা যুগে যুগে মুসলিম সমাজকে প্রভাবিত করেছে। এ প্রসঙ্গে ইমাম খোমেনী (রহ.) বলেছিলেন, ‘‘মহররম ও সফর না থাকলে ইসলাম বেঁচে থাকত না।’’

সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর হামাসিক চরিত্র। তাই মজলিসে এমন কবিতা ও আবৃত্তিও থাকা উচিত, যা মানুষের মধ্যে সাহস, আত্মমর্যাদা, প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের চেতনা জাগিয়ে তোলে।

তবে হামাসার পাশাপাশি মুসিবত ও শোকের দিকটিও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে। সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর মুসিবত স্মরণ করে অশ্রুপাত করা এবং অন্যদের কাঁদানো সম্পর্কে বহু বর্ণনায় উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। ফলে এমন হৃদয়স্পর্শী ও আবেগময় কবিতা ও মারসিয়াও প্রয়োজন, যা বক্তা ও শ্রোতা উভয়ের হৃদয়কে আন্দোলিত করে।

তবে এসব কবিতা ও মার্সিয়ার ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে প্রথম এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো গুলু থেকে বিরত থাকা।

গুলু বলতে বোঝায়, আল্লাহর নেক বান্দা, নবী, ইমাম ও অলিদের এমন মর্যাদায় উন্নীত করা, যা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য নির্ধারিত। আহলে বাইত (আ.)-কে উলুহিয়্যাতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা কিংবা তাঁদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ গুণাবলি আরোপ করা ইসলামী আকিদার দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

যদিও এ ধরনের বক্তব্য বা কবিতা খুব বেশি দেখা যায় না, তবুও সামান্য পরিমাণেও এর বিরোধিতা করা প্রয়োজন। কোনো কবিতায় ভালোবাসা ও ভক্তির প্রকাশ হিসেবে ‘আমার কাবা’, ‘আমার সাফা’, ‘আমার জমজম’ ইত্যাদি উপমা ব্যবহার করা হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুলুর অন্তর্ভুক্ত হয় না; কিন্তু যদি কাউকে ‘আমার উপাস্য’ বা ‘আমার খোদা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, তাহলে তা ইসলামী আকিদার আলোকে কুফরসুলভ বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হবে।

শত্রুপক্ষের বিভিন্ন গোষ্ঠী—বিশেষত দাঈশ বা তথাকথিত সালাফি-ওয়াহাবি ধারার উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো—এ ধরনের বক্তব্যকে শিয়াদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তাই কবিতা, মারসিয়া ও বক্তব্যে গুলু এবং আকিদাগত সীমালঙ্ঘন থেকে সতর্ক থাকা অপরিহার্য।

নবী-রাসূল এবং নিষ্পাপ ইমামগণ (আ.) সকলেই আল্লাহর বান্দা। তাঁদের মর্যাদা যত উচ্চই হোক না কেন, তাঁদেরকে উলুহিয়্যাতের পর্যায়ে উন্নীত করা কিংবা তাঁদের জন্য আল্লাহর বিশেষ বৈশিষ্ট্য আরোপ করা বৈধ নয়।

অন্য নীতিমালা ও নির্দেশনা পরবর্তী আলোচনায় তুলে ধরা হবে।

ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha