সোমবার ৬ জুলাই ২০২৬ - ১৬:৩৩
‘ফিলিস্তিন মুসলিম উম্মাহর কাঁধে অর্পিত এক স্থায়ী দায়িত্ব ও আমানত’—লেবাননের জেনারেলকে আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.)

লেবাননের সাবেক পাবলিক সিকিউরিটির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আব্বাস ইব্রাহিম ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা শহীদ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর (রহ.) সঙ্গে তাঁর একমাত্র সাক্ষাতের স্মৃতি তুলে ধরেছেন। সংক্ষিপ্ত হলেও সেই সাক্ষাৎ তাঁর কাছে ছিল গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। একপর্যায়ে খামেনেয়ী (রহ.) নিজের কাঁধের কেফিয়াহ খুলে তাঁর গলায় পরিয়ে দিয়ে বলেন, “ফিলিস্তিন মুসলিম উম্মাহর কাঁধে অর্পিত এক স্থায়ী দায়িত্ব ও আমানত।” ইব্রাহিমের ভাষায়, এই কথাই ছিল ওই সাক্ষাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, যা আজও তাঁর স্মৃতিতে অম্লান।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী (রহ.)–এর সঙ্গে সাক্ষাৎ বহু মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল। এটি কেবল একজন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ ছিল না; বরং নেতৃত্ব, তাকওয়া, ফিকহ ও ইজতিহাদে বিশিষ্ট এক নেতার সান্নিধ্য লাভের সুযোগ—যেমনটি শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ তাঁকে বর্ণনা করতেন।

অনেকেই দূর থেকে তাঁর বক্তব্য, অবস্থান এবং কয়েক দশকজুড়ে দেওয়া ভাষণের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। ভৌগোলিকভাবে দূরে থাকলেও চিন্তা ও আদর্শের দিক থেকে তাঁরা তাঁর খুব কাছাকাছি ছিলেন। তাঁদের মনে এমন এক নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি গড়ে উঠেছিল, যার তুলনা ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়।

এ প্রসঙ্গে ‘আলাল-আহদ’ (على العهد) পডকাস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লেবাননের সাবেক পাবলিক সিকিউরিটির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আব্বাস ইব্রাহিম একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার বর্ণনা দেন, যা রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক—উভয় দিক থেকেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

তিনি বলেন, ‘একদিন শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। আলাপের একপর্যায়ে আমি তাঁকে জানাই যে, আমাকে ইরান সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ইরান থেকে তাঁর জন্য কিছু নিয়ে আসতে হবে কি না। তিনি পাল্টা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি নিজে কিছু চাও?” আমি বললাম, “আমার একমাত্র ইচ্ছা হলো হযরত সাইয়্যেদ নেতা আলী খামেনেয়ীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা।” তিনি হেসে বললেন, “ইনশাআল্লাহ, তা হবে।”’

জেনারেল আব্বাস ইব্রাহিম বলেন, ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই সুযোগ এসে যায়। আমি তেহরানে একটি সরকারি বৈঠকে ইরানের নিরাপত্তামন্ত্রীর সঙ্গে বসেছিলাম। বৈঠক শুরুর এক ঘণ্টাও পেরোয়নি, এমন সময় একজন কর্মকর্তা এসে মন্ত্রীর হাতে একটি কাগজ তুলে দেন। মনে হলো, তাঁকে হঠাৎ করেই জানানো হয়েছে যে বৈঠক শেষ করতে হবে। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “সাইয়্যেদ, বৈঠক এখানেই শেষ। আমরা দুঃখিত।” এরপর তিনি নিজেই আমাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। গাড়ির দরজার কাছে এসে বললেন, “ইশ! আমরাও যদি আপনার সঙ্গে যেতে পারতাম!” তখনই আমার মনে হলো, নিশ্চয়ই আমাকে কোনো বিশেষ স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরপর আমাকে যে স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অ্যাডমিরাল আলী শামখানি এবং গোলাম আলী হাদ্দাদ-আদেলও ছিলেন। প্রায় পাঁচ মিনিট পর আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.) কক্ষে প্রবেশ করেন। তিনি উপস্থিত সবাইকে সালাম জানান এবং লেবাননের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর তিনি নিজের কাঁধের কেফিয়াহ খুলে আমার গলায় পরিয়ে দিয়ে বলেন, “ফিলিস্তিন মুসলিম উম্মাহর কাঁধে অর্পিত এক স্থায়ী দায়িত্ব ও আমানত। আমার সালাম সাইয়্যেদের কাছে পৌঁছে দিও। তোমাকে স্বাগত।”’

জেনারেল আব্বাস ইব্রাহিম জানান, ওই সাক্ষাতের পর তিনি আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.)–এর ইমামতিতে জোহরের নামাজ আদায় করেন। এরপর তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেন। তাঁর ভাষায়, এটিই ছিল সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে তাঁর প্রথম ও একমাত্র সাক্ষাৎ। কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ তাঁর জীবনে গভীর ও স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষ করে নেতার উপদেশ ও বার্তাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল—ফিলিস্তিন মুসলিম উম্মাহর কাঁধে অর্পিত এক স্থায়ী দায়িত্ব ও আমানত।

জেনারেল আব্বাস ইব্রাহিমের এই অভিজ্ঞতা শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.)–এর চিন্তা, আদর্শ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ফিলিস্তিন প্রশ্নের কেন্দ্রীয় অবস্থানকে আবারও স্পষ্ট করে। ফিলিস্তিন তাঁর বিভিন্ন ভাষণ, সাক্ষাৎ ও রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে। তিনি প্রতিটি সুযোগে এ ইস্যুর গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এবং মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টি ফিলিস্তিনের দিকে নিবদ্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.)–এর দৃষ্টিতে ফিলিস্তিন কোনো সাময়িক রাজনৈতিক ইস্যু বা কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়; বরং এটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর একটি মৌলিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তি ও রাষ্ট্র—উভয়ের ওপর অর্পিত একটি ধর্মীয় ও নৈতিক কর্তব্য। তাঁর মতে, ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন এবং সেখানকার প্রতিরোধ আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো মূলত অবিচার, দখলদারিত্ব ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ারই ধারাবাহিকতা। এটি এমন একটি মুক্তিকামী আন্দোলনের অংশ, যার লক্ষ্য শুধু ভূখণ্ডের মুক্তি নয়, বরং মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha