রবিবার ১৯ জুলাই ২০২৬ - ১৭:১০
জোলানিকে ইরাকের পরামর্শ: লেবানন থেকে দূরে থাকুন

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে ‘সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট’ মুহাম্মদ আল-জোলানি (আহমদ আল-শারা) ইরাক সরকারের পক্ষ থেকে একটি ‘পরামর্শ’ পেয়েছেন-যাতে তাকে লেবাননের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার কথা বলা হয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, এই বার্তাটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো দামেস্ককে এমন একটি ভূমিকায় ঠেলে দেওয়া, যেখানে তারা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইরাকের বার্তায় এ বিষয়ে একটি ‘সতর্কবার্তা’ ছিল যে: ‘লেবাননের ক্ষেত্রে সিরিয়ার যেকোনো সম্পৃক্ততা সরাসরি সিরিয়ার জন্যই পরিণতি বয়ে আনবে।‘

ইরাকি পক্ষ দামেস্ককে জানিয়েছে: যদি লেবাননের শিয়া জনগণ বা হিজবুল্লাহ সিরিয়ার ভূখণ্ড থেকে কোনো হুমকির মুখোমুখি হয়, তাহলে ইরাকের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো নিষ্ক্রিয় থাকবে না।

এছাড়া বলা হয়েছে: লেবাননের দিকে সিরিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপের জবাব ইরাকের পক্ষ থেকে সিরিয়ার দিকে অনুরূপ পদক্ষেপের মাধ্যমে আসতে পারে।

সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, বাগদাদ সতর্ক করেছে যে, দামেস্ক যদি এই পথে এগিয়ে যায়, তাহলে এমন নিরাপত্তাগত ও আঞ্চলিক পরিণতির দরজা খুলে যাবে যা সিরিয়ার স্বার্থে নয় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা বা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টাতেও সহায়ক হবে না।

সূত্রের দাবি অনুযায়ী, আল-জোলানি ইরাকি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন যে, মার্কিন সরকার সত্যিই তাকে লেবানন ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বলেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, তিনি এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তিনি আরও বলেছেন, দামেস্ক লেবাননের ঘটনায় হস্তক্ষেপ করতে চায় না এবং অতীতের হস্তক্ষেপমূলক নীতিতেও ফিরে যেতে চায় না। বর্তমান পর্যায়ে সিরিয়ার নেতৃত্বের অগ্রাধিকার হলো দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নতুন কোনো সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি না করা।

এদিকে, সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি চলতি মাসে দামেস্ক সফরের পরিকল্পনা করছেন। এই সফরে তিনি সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।

সূত্র অনুযায়ী, আল-জাইদি আল-জোলানির সঙ্গে কয়েকটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করবেন। এর মধ্যে রয়েছে:

  • সিরিয়ায় তেল সরবরাহ,
  • বানিয়াস শোধনাগারের তেল পরিবহন লাইন পুনরায় চালু করা,
  • ইরাকি বাজারে সিরিয়ার পণ্য প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করা।

এই ইরাকি কর্মকর্তা সিরিয়ার নেতৃত্বের সঙ্গে ‘সিরিয়ার শিয়াদের পরিস্থিতি এবং তাদের অধিকার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা প্রদান ও ধর্মীয় স্থানগুলোর সুরক্ষা-বিশেষ করে হজরত জয়নাব (সা.আ.)-এর মাজার’ সম্পর্কেও আলোচনা করবেন।

এছাড়া দামেস্কের কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতার পথে সিরিয়ার বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ বাড়ানোর উপায় নিয়েও আলোচনা হবে।

আল-জাইদি আল-জোলানির সঙ্গে সেই লেবানিজ ও সিরিয়ানদের বিষয়ও উত্থাপন করবেন, যারা সাবেক সরকারের পতনের পর হামসের উপকণ্ঠের গ্রামগুলো থেকে বাস্তুচ্যুত বা স্থানান্তরিত হয়েছেন। তাদের প্রত্যাবর্তনের জন্য উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরির বিষয়েও আলোচনা হবে।

উল্লেখ্য, আল-জাইদির সফরসূচিতে উমাইয়া মসজিদ এবং হজরত জয়নাব (সা.আ.)-এর মাজার পরিদর্শন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি দুই দেশের মধ্যে ধর্মীয় কার্যক্রম পুনরুজ্জীবনের অংশ হিসেবে এই পবিত্র মাজারে ইরাকি জিয়ারতকারীদের আগমন পুনরায় শুরু করার ঘোষণা দিতে পারেন।

ইরাকের এই বার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র দামেস্ককে লেবানন ইস্যুতে ভূমিকা নেওয়ার জন্য ক্রমবর্ধমান চাপ দিচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলোকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সিরিয়াকে সম্পৃক্ত করার সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে তারা এটিকে বাস্তব কার্যকর পরিকল্পনার চেয়ে রাজনৈতিক উসকানি ও গণমাধ্যমভিত্তিক চাপ হিসেবে দেখছে।

তারা আরও উল্লেখ করেছে যে, তুরস্ক ও আঞ্চলিক পক্ষগুলোর মাধ্যমে হিজবুল্লাহর কাছে পাঠানো আগের সিরীয় বার্তাগুলোতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, দামেস্ক লেবাননের বিষয়ে সংঘাতে আগ্রহী নয় এবং অতীতের অধ্যায় বন্ধ করতে চায়।

এই অবস্থানগুলো এমন কিছু বিশ্লেষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছে যে, তুরস্কের স্পষ্ট সমর্থন ছাড়া এ ধরনের কোনো সিরীয় সম্পৃক্ততা সম্ভব নয়। এখন পর্যন্ত সেই সমর্থন পাওয়া যায়নি, কারণ আঙ্কারা এমন কোনো পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন যেখানে সিরিয়া ও লেবাননে ইসরায়েলের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে পারে।

পর্যবেক্ষক সূত্রগুলো বলছে, ইরাকের এই বার্তাকে ইরাকে শহীদ ইমাম সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর জাঁকজমকপূর্ণ জানাজার পরবর্তী আঞ্চলিক পরিস্থিতি থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। তারা এই জানাজাকে অঞ্চলের শিয়া মহলে ব্যাপক সংগঠন ও সংহতির একটি নিদর্শন হিসেবে দেখছে।

এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সিরিয়ার যেকোনো সংঘাতকে শুধু লেবানন বা সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখা হবে না; বরং এটি অঞ্চলের নতুন নতুন ক্ষেত্রে সংঘাত বিস্তারের একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha