মঙ্গলবার ২১ জুলাই ২০২৬ - ১৫:৩১
কুফরের নেতাদের বিরুদ্ধে মোকাবিলার কুরআনি নির্দেশের রহস্য কী?

হুজ্জাতুল ইসলাম খালিলপুর বলেছেন: ‘আইম্মাতুল কুফর’ অর্থ কুফরের পথপ্রদর্শক, নেতা, কর্ণধার, মতাদর্শবিদ, তাত্ত্বিক ও পথিকৃৎ। তারাই নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য ও রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে সমাজকে কুফর ও সত্যের সাথে শত্রুতার পথে পরিচালিত করে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘ফাকাতিলু আইম্মাতাল কুফর’ (অতএব তোমরা কুফরের নেতাদের সাথে যুদ্ধ কর)-এই নির্দেশটি চুক্তিভঙ্গকারী ও আক্রমণকারী নেতাদের বিরুদ্ধে মোকাবিলার নির্দেশ দেয়, যাতে তাদের ফ্যাসাদ ও শত্রুতা অব্যাহত না থাকে। এই আয়াতটি সূরা তওবার প্রারম্ভিক আয়াতের ধারাবাহিকতায় নাজিল হয়েছে; সেই আয়াতগুলিতে সেই মুশরিকদের কথা বলা হয়েছে, যারা মুসলিমদের সাথে চুক্তি করেছিল, কিন্তু পরে নিজেদের চুক্তি ভঙ্গ করে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুতা ও প্ররোচনায় লিপ্ত হয়।

এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা ও তাফসীরের জন্য আমরা হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আলী খালিলপুর-যিনি কোমের হাওজায়ে ইলমিয়্যাহ-এর অন্যতম অধ্যাপক-এর সাথে সাক্ষাৎকারে বসেছি।

সাক্ষাৎকারের পূর্ণ বিবরণ নিচে পড়ুন;

প্রশ্ন: যেহেতু ইসলাম শান্তি ও করুণার ধর্ম এবং অসংখ্য আয়াত শান্তি ও সহিষ্ণুতার উপর জোর দিয়েছে, তাই সূরা তওবার (সূরার ১২ নং আয়াতের) ফাকাতিলু আইম্মাতাল কুফর-এর বিধান কীভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? এই আয়াত কি ইসলামে শান্তির অনুমোদনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়?

উত্তর: এর উত্তর হলো, এই আয়াতটি কোনো মুক্ত ও শর্তহীন বিধান নয়, বরং এটি একটি সীমাবদ্ধ ও শর্তসাপেক্ষ বিধান যা একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এবং নির্দিষ্ট শর্তাবলীর সাথে নাজিল হয়েছে। উত্তরের জন্য আমাদের শানে নুযূল (অবতরণের প্রেক্ষাপট) এবং আয়াতের মধ্যেই উল্লিখিত শর্তগুলোর দিকে লক্ষ্য করতে হবে।

পবিত্র কুরআন এই আয়াতে ফরমান: «وَ إِن نَّکَثُوا أَیْمَانَهُم مِّن بَعْدِ عَهْدِهِمْ وَ طَعَنُوا فِی دِینِکُمْ فَقَاتِلُوا أَئِمَّةَ الْکُفْرِ» অর্থাৎ, যদি তারা নিজেদের অঙ্গীকারের পর নিজেদের শপথ ভঙ্গ করে এবং তোমাদের ধর্মে কটাক্ষ করে, তবে তোমরা কুফরের ইমামদের (নেতাদের) সাথে যুদ্ধ কর। সুতরাং পদক্ষেপ গ্রহণের শর্ত হলো দুটি জিনিস: চুক্তি ভঙ্গ করা এবং ধর্মে কটাক্ষ করা।

এই দুটি শর্ত প্রমাণ করে যে জিহাদের বিধানটি একটি প্রতিরক্ষামূলক বিধান এবং শত্রুর বিশ্বাসঘাতকতা ও সক্রিয় শত্রুতার বিপরীতে একটি প্রতিক্রিয়া। যতক্ষণ শত্রু নিজেদের চুক্তিতে বিশ্বস্ত থাকে এবং শত্রুতা ও কটাক্ষ না করে, ততক্ষণ এই বিধান কার্যকর হওয়ার ভিত্তি মোটেই তৈরি হয় না। বরং এমন পরিস্থিতিতে পবিত্র কুরআন স্পষ্টভাবেই শান্তি ও সহিষ্ণুতার নির্দেশ দেয়। সূরা আনফালের ৬১ নং আয়াতটি লক্ষ্য করুন, যেখানে ফরমান: «وَ إِن جَنَحُوا لِلسَّلْمِ فَاجْنَحْ لَهَا»; যদি শত্রু শান্তির দিকে ঝুঁকে, তাহলে তুমিও শান্তির দিকে ঝুঁকো।

এছাড়াও সূরা মুমতাহিনার ৮ নং আয়াতে একটি সার্বজনীন নীতি বর্ণনা করা হয়েছে: «لَا یَنْهَاکُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِینَ لَمْ یُقَاتِلُوکُمْ فِی الدِّینِ وَ لَمْ یُخْرِجُوکُم مِّن دِیَارِکُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَ تُقْسِطُوا إِلَیْهِمْ»; যারা তোমাদের সাথে ধর্মের ব্যাপারে যুদ্ধ করে নি এবং তোমাদেরকে নিজেদের ঘর থেকে বের করে দেয় নি, তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। অর্থাৎ সকল মানুষের সাথে ন্যায়বিচার ও সদ্ব্যবহার ইসলামের একটি মৌলিক নীতি।

শহীদ ইমাম হযরত আয়াতুল্লাহিল উযমা ইমাম খামেনেয়ী (রহ.) নিজেদের তাফসীরে এই বিষয়টির উপর অত্যন্ত জোর দিয়েছেন যে, “ইসলামি ব্যবস্থা ঐ সকল রাষ্ট্রের সাথে, যারা শত্রুতার নীতি গ্রহণ করে নি, সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতে এবং শান্তি গ্রহণ করতে বাধ্য।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, “যদি শত্রু মিথ্যাবাদী ও ধূর্ত হয় এবং শান্তির হাত বাড়ায়, কিন্তু ভিতরে বিষাক্ত ছুরি লুকিয়ে রাখে (যেমন অপরাধী আমেরিকা), তবে কুরআন ফরমান: «فَلَا تَهِنُوا وَ تَدْعُوا إِلَی السَّلْمِ»; দুর্বল হয়ো না এবং দুর্বলতার অবস্থান থেকে শান্তির দাওয়াত দিও না।” তাই সেই শান্তিই মূল্যবান যা সম্মান ও শক্তির অবস্থান থেকে হয়, অপমানজনক শান্তি নয়।

প্রশ্ন: এই আয়াতে ফাকাতিলুহুম (তাদের সাথে যুদ্ধ কর) বা ফাকাতিলুল কুফর (কুফরের সাথে যুদ্ধ কর) না বলে ফাকাতিলু আইম্মাতাল কুফর (কুফরের ইমাম/নেতাদের সাথে যুদ্ধ কর) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আইম্মাতুল কুফর বলতে কাদের উদ্দেশ্য করা হয়েছে এবং এই শব্দগত পার্থক্য আমাদের জন্য কী গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে?

উত্তর: এটি এই আয়াতের ঠিক কেন্দ্রবিন্দু ও সূক্ষ্মতা। ‘আইম্মা’ শব্দটি, যা ‘ইমাম’-এর বহুবচন, একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বার্তা বহন করে। কুরআন আমাদের শেখায় যে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়াবলী বিশ্লেষণে আমাদের অতিমাত্রায় দেখা উচিত নয়। একটি সমাজ বা শত্রুপক্ষের সকল ব্যক্তিকে একই চোখে দেখা উচিত নয়; বরং ফিতনার উৎস ও মূল শিকড় চিহ্নিত করতে হবে।

‘আইম্মাতুল কুফর’ অর্থ কুফরের পথপ্রদর্শক, নেতা, কর্ণধার, মতাদর্শবিদ, তাত্ত্বিক ও পথিকৃৎ। তারাই নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য ও রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে সমাজকে কুফর ও সত্যের সাথে শত্রুতার পথে পরিচালিত করে। শহীদ ইমাম হযরত আয়াতুল্লাহিল উযমা ইমাম খামেনেয়ী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) এ প্রসঙ্গে ফরমান: “কুরআন বলতে চায় না যে প্রতিটি কাফিরের সাথে যুদ্ধ করো যে চুক্তি ভঙ্গ করেছে, বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম সামাজিক বিষয় বিবৃত করছে; একটি বৈশ্বিক স্কেলের বিধান।”

তিনি এই কুফরের নেতাদের “সমাজের পুঁজভর্তি গ্রন্থি” বলে অভিহিত করেছেন, যারা মানুষের মুসলিম হওয়া ও হিদায়াত পাওয়ার প্রধান বাধা। সাধারণ মানুষ সাধারণত এই নেতাদের প্রভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে এবং যদি এই পুঁজভর্তি গ্রন্থিগুলো দূর করা যায়, তবে মানুষের জন্য চিন্তাভাবনা ও সঠিক পছন্দের পথ সুগম হয়। এই পার্থক্য ইসলামের বুদ্ধিদীপ্ত ও যুক্তিসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে, যা যুদ্ধকে আধিপত্যবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্বের সাথে সংজ্ঞায়িত করে, সাধারণ মানুষের সাথে নয়-যারা প্রায়শই সেই দমনমূলক ব্যবস্থার শিকার।

প্রশ্ন: এই নেতাদের সাথে যুদ্ধের লক্ষ্য ও দর্শন কী এবং এই সংঘাতের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কী?

উত্তর: চূড়ান্ত লক্ষ্য আয়াতের শেষাংশেই বর্ণনা করা হয়েছে, অর্থাৎ «لَعَلَّهُمْ یَنتَهُونَ»-যাতে তারা বিরত হয় এবং কুফর ও শত্রুতা থেকে ফিরে আসে। এটি প্রমাণ করে যে লক্ষ্য ধ্বংস ও হত্যা নয়, বরং প্রতিরোধ ও শত্রুতার অবসান ঘটানো। যুদ্ধ একটি মাধ্যম, লক্ষ্য নয়। চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। এটি আক্রমণকারী ও চুক্তিভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরক্ষামূলক ও প্রতিক্রিয়ামূলক বিধান, যাতে তাদের অত্যাচার ও ষড়যন্ত্র অব্যাহত না থাকে।

এর পাশাপাশি, সূরা কাসাসের ৪১ নং আয়াতে এই দলটিকে «أَئِمَّةً یَدْعُونَ إِلَی النَّارِ» (যারা মানুষকে আগুনের দিকে ডাকে) হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম স্বৈরতন্ত্র ও আধিপত্যবাদের প্রবাহের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, যা মানবতাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

এই সংগ্রামের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি একটি সংস্কারমূলক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। যেমন একজন চিকিৎসক শরীরকে বাঁচাতে ক্যান্সারযুক্ত গ্রন্থি অপসারণ করে, তেমনি ইসলামি সমাজও মানবতাকে স্বৈরশাসকদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য থেকে মুক্ত করতে সেই দুর্নীতির উৎসগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাধ্য। শহীদ ইমাম হযরত আয়াতুল্লাহিল উযমা সৈয়দ আলী খামেনেয়ী (রহ.) এই বিধানটিকে একটি “বৈশ্বিক স্কেলের বিধান” হিসেবে বিবেচনা করেন যা সব সময় ও স্থানের জন্য একটি কৌশলগত নীতি নির্ধারণ করে।

প্রশ্ন: এই আয়াতের সমসাময়িক বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্য কীভাবে হয় এবং আজকের দিনে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য এর বার্তা কী?

উত্তর: আয়াতগুলোর বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োগ কুরআনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাগুলোর মধ্যে একটি, যা লক্ষ্য করা উচিত। আজকে ‘আইম্মাতুল কুফর’ এবং ‘যারা আগুনের দিকে ডাকে এমন ইমাম’ -এর সুস্পষ্ট উদাহরণ হলো বৈশ্বিক আধিপত্যবাদ, বিশেষ করে দখলদার ইসরায়েলি শাসন, প্রতিশ্রুতিভঙ্গকারী আমেরিকা এবং অন্যান্য আধিপত্যবাদী শক্তি, যারা আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করে এবং ঐশী নীতিতে কটাক্ষ করে ইসলাম ও মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।

তবে আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে এই দৃষ্টিভঙ্গি কখনোই বিশ্বের সকল মানুষের সাথে শত্রুতা বোঝায় না। আধিপত্যবাদী নেতা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তাধারার একটি মৌলিক নীতি, যা শহীদ ইমামও বারবার জোর দিয়েছেন।

আজকের দিনের জন্য এই আয়াতের বার্তা হলো “আধিপত্যবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বুদ্ধিদীপ্ত সংগ্রাম”, “অত্যাচারী আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ”, এবং সেই সাথে “শান্তি ও ন্যায়বিচারের দরজা খুলে দেওয়া”-যে সমস্ত জাতি এই ব্যবস্থাগুলোর অত্যাচারের বোঝা বহন করছে তাদের জন্য। এই হলো খাঁটি মুহাম্মদি (সা.)-এর ইসলাম, যা অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে, কিন্তু কখনোই জাতিগুলোর সাথে যুদ্ধ চায় না এবং প্রতিটি মানুষের জন্য, তাদের ধর্ম বা মত নির্বিশেষে, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে।

পরিশেষে, এই আয়াত হলো ‘অত্যাচার ও ষড়যন্ত্রের’ বিরুদ্ধে জাগরণ ও দায়িত্ববোধের আহ্বান; ‘ফিতনার কর্ণধারদের’ বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত যুদ্ধ, ‘ন্যায়বিচার’ ও ‘মানবিক মর্যাদা’ পুনরুদ্ধারের জন্য।

খাঁটি মুহাম্মদি (সা.)-এর ইসলাম, এই শিক্ষাগুলোর ওপর নির্ভর করে, শুধু করুণার ধর্মই নয়, বরং সম্মান, কৌশল ও বুদ্ধিদীপ্ত সংগ্রামের ধর্ম-যা মানবজাতির কল্যাণকে ঝুঁকির মুখে ফেলে এমন প্রতিটি বিষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এবং শেষ পর্যন্ত, অত্যাচারী ও জালিমদের বিরুদ্ধে ধৈর্য, দৃঢ়তা ও সমস্ত শক্তি প্রস্তুত রেখে দাঁড়াতে হবে, যাতে বিজয় ও সাফল্য আমাদের নসিব হয়, ইনশাআল্লাহ।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha