হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ধর্মীয় গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও কর্মী মরহুম মোহাম্মদ রুস্তামলুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর ভাই এক স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধে তাঁর ব্যক্তিত্বের কম আলোচিত দিকগুলো তুলে ধরেছেন। দুই দশকেরও বেশি সময়ের সাংবাদিকতা, সত্য তুলে ধরার সংগ্রাম, বেলায়াতের প্রতি আনুগত্য, পেশাগত নৈতিকতা, মানুষের প্রতি আন্তরিকতা এবং বাবা-মায়ের প্রতি তাঁর অসাধারণ শ্রদ্ধাবোধ-সবই সেখানে স্থান পেয়েছে।
আজ সেই বেদনাময় দিনের এক বছর পূর্ণ হলো-যেদিন আমার ভাই মোহাম্মদ চিরদিনের জন্য আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তাঁর প্রস্থান আমাদের পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী এবং সমগ্র গণমাধ্যম অঙ্গনের হৃদয়ে এমন এক শোকের ছাপ রেখে গেছে, যার ভার আজও আমি গভীরভাবে অনুভব করি।
সময় হয়তো মানুষকে প্রিয়জনের অনুপস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখায়, কিন্তু তাদের শূন্যস্থান কখনো পূরণ করতে পারে না। আজও যখনই কলম হাতে নিই, প্রিয় মোহাম্মদ ভাইয়ের কণ্ঠ যেন কানে ভেসে আসে-সেই উপদেশগুলো, যা আমার কাছে সাংবাদিকতাকে শুধু একটি পেশা নয়, বরং এক ঐশী দায়িত্বে পরিণত করেছিল।
মোহাম্মদ আমার কাছে শুধু একজন ভাই ছিলেন না; তিনি ছিলেন জীবনের শিক্ষক, আন্তরিক উপদেষ্টা, কঠিন সময়ের সহযাত্রী এবং নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল আদর্শ। অনেকেই তাঁকে একজন আদর্শ, বিপ্লবী ও বেলায়াত-অনুগত সাংবাদিক হিসেবে চিনতেন। কিন্তু আমি খুব কাছ থেকে তাঁর ঈমান, নিষ্ঠা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, বিনয় এবং দায়িত্বশীলতার সাক্ষী ছিলাম-যা তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রকাশ পেয়েছে।
মোহাম্মদ দুই দশকেরও বেশি সময় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর কাছে সাংবাদিকতা কোনো চাকরি ছিল না; এটি ছিল এক ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন সাংবাদিক তার কলমের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবেন। কারণ প্রতিটি শব্দ সমাজের চিন্তা-চেতনাকে গঠনও করতে পারে, আবার ক্ষতিগ্রস্তও করতে পারে। তাই তিনি সবসময় সততা, বিশ্বস্ততা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করেছেন এবং ইসলামী জ্ঞান ও মূল্যবোধ তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সত্যের সেবায় গণমাধ্যমকে নিয়োজিত করা।
মোহাম্মদ ইসলামী বিপ্লবকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তবে সেই ভালোবাসা আবেগনির্ভর ছিল না; বরং গভীর বিশ্বাস ও আদর্শিক উপলব্ধি থেকে উৎসারিত ছিল। তিনি ‘বেলায়াত ফকিহ’-কে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার দৃঢ় ভিত্তি মনে করতেন এবং বিশ্বাস করতেন, একজন প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিকের উচিত বিলায়াত ও বিপ্লবের আদর্শ রক্ষার প্রথম সারিতে থাকা। সত্যের পক্ষে তিনি কখনো আপস করতেন না। যখনই অনুভব করতেন যে বিপ্লবের মূল্যবোধ বা বিলায়াতের মর্যাদা আক্রান্ত হচ্ছে, তখন স্পষ্টভাষী, যুক্তিনিষ্ঠ ও সাহসী অবস্থান গ্রহণ করতেন।
শহীদ ইমাম আয়াতুল্লাহুল উজমা সাইয়্যিদ আলী খামেনেয়ী-এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল ভাষায় প্রকাশের অতীত। তিনি সবসময় তাঁর বক্তব্য ও নির্দেশনাকে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করতেন। বহুবার তিনি আমাকে বলেছিলেন, একজন প্রকৃত সাংবাদিকের উচিত নিজের লেখা ও বক্তব্যকে ওয়িলায়াতে ফকিহের মানদণ্ডে বিচার করা, বিপ্লবের নেতার নির্দেশনা তুলে ধরতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা এবং শত্রুপক্ষের প্রচারযুদ্ধের ভিড়ে ইসলামী বিপ্লবের সত্যকে হারিয়ে যেতে না দেওয়া।
তিনি প্রায়ই বলতেন, সাংবাদিকের কাজ শুধু সংবাদ প্রকাশ করা নয়; বরং বিপ্লবের লক্ষ্য ও আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সত্যকে তুলে ধরা।
তাঁর দৃষ্টিতে গণমাধ্যম ছিল ‘ব্যাখ্যা ও সত্য তুলে ধরার জিহাদের দুর্গ’, আর সাংবাদিক ছিলেন সেই ময়দানের যোদ্ধা। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাংবাদিকের দায়িত্ব শুধু দৈনন্দিন সংবাদ প্রকাশে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অধ্যয়ন, বিশ্লেষণ, উচ্চমানের বিষয়বস্তু তৈরি এবং আলেম ও মারজায়ে তাকলিদের চিন্তাধারা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে শত্রুর বর্ণনাযুদ্ধ ও মানসিক যুদ্ধের মোকাবিলা করা।
মোহাম্মদ আলেম-উলামা, হাওযা ইলমিয়া এবং ধর্মীয় চিন্তাবিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি সর্বদা তাঁদের কণ্ঠস্বর সমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, গণমাধ্যম মানুষের সঙ্গে ইসলামের বিশুদ্ধ জ্ঞানের সংযোগস্থল হওয়া উচিত। আর একজন ধর্মীয় সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো সঠিক ও প্রভাবশালী ভাষায় ধর্ম, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা এবং ন্যায়বিচারের বার্তা সমাজে পৌঁছে দেওয়া।
তবে তাঁর পেশাগত গুণাবলির পাশাপাশি যে বৈশিষ্ট্যটি সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল ছিল, তা হলো বাবা-মায়ের প্রতি তাঁর অসাধারণ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তিনি বিশ্বাস করতেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি বাবা-মায়ের সন্তুষ্টির মধ্যেই নিহিত এবং তাঁদের দোয়া ছাড়া কোনো সাফল্য স্থায়ী হতে পারে না।
জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে দ্বিধায় পড়লে তিনি সবার আগে বাবার কাছে যেতেন, পরামর্শ নিতেন এবং তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা থেকে উপকৃত হতেন। বহু বছরের সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত অবস্থান থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো নিজেকে বাবা-মায়ের দিকনির্দেশনা থেকে মুক্ত মনে করেননি।
তিনি সবসময় আমাদের বলতেন, প্রথম এবং শেষ কথা বাবা-মায়ের কাছ থেকেই শোনা উচিত।
মতভেদ থাকলেও তিনি কখনো তাঁদের সামনে ঔদ্ধত্য দেখাতেন না; বরং সর্বোচ্চ ভদ্রতা ও বিনয়ের সঙ্গে নিজের কথা প্রকাশ করতেন। এই আচরণ ছিল পবিত্র কুরআন এবং আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর ঈমানেরই প্রতিফলন। আজ তাঁর বিদায়ের এক বছর পরও এই চরিত্র আমার জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুপ্রেরণার উৎস।
মোহাম্মদ ছিলেন হাসিখুশি, আন্তরিক ও মানুষের আপনজন। অসংখ্য তরুণ সাংবাদিক তাঁর অভিজ্ঞতা, নৈতিকতা এবং পরামর্শ থেকে উপকৃত হয়েছেন। তিনি কখনো নিজের জ্ঞান অন্যদের কাছ থেকে গোপন রাখতেন না। অন্যের সাফল্যকে নিজের সাফল্য বলেই মনে করতেন। কোনো সাংবাদিকের সাহায্যের প্রয়োজন হলে তিনি নিঃস্বার্থভাবে সময় দিতেন এবং নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতেন।
আজ তাঁর অনুপস্থিতির এক বছর পর আমি আগের চেয়ে আরও বেশি উপলব্ধি করি যে আমাদের গণমাধ্যম জগতের প্রয়োজন মোহাম্মদ রুস্তামলুর মতো সাংবাদিক-যারা নিজেদের কলম বিক্রি করবেন না, ব্যক্তিস্বার্থের জন্য সত্যকে বিসর্জন দেবেন না, প্রতিযোগিতার চেয়ে নৈতিকতাকে অগ্রাধিকার দেবেন এবং গণমাধ্যমকে ধর্ম, জনগণ ও ইসলামী বিপ্লবের সেবার একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করবেন।
নিঃসন্দেহে, প্রিয় মোহাম্মদ আমাদের জন্য শুধু হাজার হাজার সংবাদ, প্রতিবেদন ও প্রবন্ধ রেখে যাননি; তিনি রেখে গেছেন ঈমান, নিষ্ঠা, বিলায়াতের প্রতি আনুগত্য, পেশাগত নৈতিকতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধের এক অমূল্য উত্তরাধিকার। যারা তাঁকে চিনতেন, তাঁদের সবার জন্য এই উত্তরাধিকার আজও পথের প্রদীপ হয়ে আছে।
সবশেষে, মহান আল্লাহর দরবারে আন্তরিক প্রার্থনা করি—তিনি যেন আমার ভাই মোহাম্মদ রুস্তামলুকে, যিনি ছিলেন গণমাধ্যমের এক নিষ্ঠাবান খাদেম এবং ইসলামী বিপ্লবের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক ক্ষুদ্র সৈনিক, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.), আহলে বাইত (আ.), ইসলামী বিপ্লবের শহীদগণ, গণমাধ্যমের শহীদগণ এবং শহীদ ইমাম আয়াতুল্লাহুল উজমা সাইয়্যিদ আলী খামেনেয়ী-এর সঙ্গে সমবেত করেন এবং আমাদেরও সত্য, ন্যায়, বেলায়াত ও সত্য-প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পথে অবিচল থাকার তাওফিক দান করেন।
আলী রুস্তামলু
আপনার কমেন্ট