হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, পর্ব ৩:
হাদীস চর্চা ও বর্ণনার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার বিরূপ ফলাফল ও মারাত্মক ধ্বংসাত্মক প্রভাব:
সাহাবাগণ কর্তৃক হাদীস বর্ণনা না করা অথবা হাদীসের চর্চা মারাত্মক ভাবে কমে যাওয়া ও হ্রাস পাওয়া: আব্দুল্লাহ ইবনে আবিস সাফার বলেন: আমি শা'বীকে বলতে শুনেছি: আমি ইবনে উমরের (রা) সাথে এক বছর উঠাবসা করছি (থেকেছি)। কিন্তু আমি তাঁকে কখনো রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে কোনো কিছুই (হাদীস) বর্ণনা করতে শুনিনি। (দ্রঃ সুনান-ই ইবনে মাজা, হাদীস নং ২৬,পৃ:১৫)
সায়িব ইবনে ইয়াযীদ বলেন:আমি মদীনা থেকে মক্কা পর্যন্ত সা'দ ইবনে মালিকের (রা) সফরসঙ্গী ছিলাম। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে আমি তাঁকে নবী (সা) থেকে একটি হাদীসও বর্ণনা করতে শুনি নি।।(দ্রঃ সুনান-ই ইবনে মাজা, হাদীস নং ২৯,পৃ:১৫)
হযরত উমরের (রা) আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে অথবা তাঁদের অনেকেরই হাদীস ও সুন্নাহ সংক্রান্ত জ্ঞান সীমিত ছিল বিধায় সাহাবাগণ হাদীস কম রেওয়ায়েত করতেন।
হাদীস চর্চা ও বর্ণনা কমে যাওয়ার কারণে সাহাবাদের অনেকেরই হাদীস ভুলে যাওয়া:
আব্দুর রহমান ইবনে আবী লাইলা বলেন: আমরা যাইদ ইবনে আরকামকে (রা) বললাম: রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে আমাদেরকে হাদীস শোনান। "তখন তিনি বললেন:আমরা বার্ধক্যে উপনীত হয়েছি এবং ভুলে গেছি (আমাদের স্মরণশক্তিও লোপ পেয়েছে)। আর রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে হাদীস (বর্ণনা করা) অত্যন্ত কঠিন (বিষয়)।"।(দ্রঃ সুনান-ই ইবনে মাজা, হাদীস নং ২৫,পৃ:১৫)
বার্ধক্য জনিত কারণে ভুলে যাওয়াটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক।তাই হযরত আবূ বকর (রা) ও হযরত উমর (রা) যদি হাদীস বর্ণনা,লিপিবদ্ধ করন ও সংকলন নিষিদ্ধ না করতেন তাহলে যাইদ ইবনে আরকামের (রা) মতো সাহাবীরা রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। তাই বার্ধক্যে স্মরণশক্তি কমে গেলেও কোনো অসুবিধা ছিল না। আর এ থেকে প্রমাণিত হয় যে হাদীস বর্ণনা করার মত হাদীস লিপিবদ্ধ করণ নিষিদ্ধ ছিল এবং সাহাবারা (রা) হাদীস লিপিবদ্ধ করা থেকেও হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন।
আমর ইবনে মাইমূন বলেন: আমি নিশ্চিত ভাবে প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা রাতে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রা) কাছে যেতাম। আমি কখনো তাঁকে বলতে শুনিনি যে তিনি বলেছেন: হযরত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন। অত:পর যখন এক বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা রাতে বললেন: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন। রাবী বলেন:(এ কথা বলে) তিনি মাথা নীচু করেন।
রাবী আরো বলেন:এরপর আমি তাঁর দিকে তাকালাম। তখন তিনি দণ্ডায়মান ছিলেন এবং তার জামার বোতাম খোলা ছিল। অবশ্য তাঁর চক্ষুদ্বয় অশ্রু বর্ষণ করছিল এবং শিরাগুলো ফুলে উঠেছিল। তিনি (ইবনে মাসউদ) বললেন: তিনি (সা) এতটুকু বলেছিলেন অথবা এর চাইতে কম কিংবা বেশি অথবা এর নিকটবর্তী কিছু কিংবা এর অনুরূপ কিছু।(দ্রঃ সুনান-ই ইবনে মাজা, হাদীস নং ২৩,পৃ:১৪-১৫)
মুহাম্মদ ইবনে সীরীন বলেন: হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) যখনই রাসূলুল্লাহ (সা) কোনো হাদীস বর্ণনা করতেন তখন বর্ণনা শেষে বলতেন: আও কামা ক্বলা রাসূলুল্লাহ [অথবা রাসূলুল্লাহর (সা) কথার অনুরূপ অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা) যা বলেছেন তার অনুরূপ কিছু]। (দ্রঃ সুনান-ই ইবনে মাজা, হাদীস নং ২৪,পৃ:১৫)
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে হযরত আনাস ইবনে মালিকের (রা) মতো বহু হাদীস বর্ণনা কারী সাহাবীও (মুকসির مکثر) স্মরণশক্তির দুর্বলতায় আক্রান্ত হয়ে ছিলেন বিধায় বলতেন: অথবা রাসূলুল্লাহর (সা) কথা ও বাণীর অনুরূপ কিছু।যা হোক স্মৃতি শক্তির দুর্বলতাও কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াত না যদি হাদীস বর্ণনা ও লিপিবদ্ধ করা সংক্রান্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারী ও বলবৎ করা না হত।
সর্বদাই তিনি (হযরত উমর) এই ব্যাপারে (হাদীস প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে) কঠোর সাবধানতা অবলম্বন করিতেন। বিশিষ্ট সাহাবীগণ ব্যতীত অন্য কাহাকেও হাদীস বর্ণনা করার অনুমতি দিতেন না। হযরত শাহ ওলীউল্লাহ লিখিয়াছেন: হযরত উমর (রা) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদকে একটি দল সহ কূফায় প্রেরণ করেন এবং উবাদা ইবনে সামেত ও আবুদ্দারদাকে সিরিয়ায় প্রেরণ করিয়া তথাকার শাসনকর্তা আমীর মুয়াবিয়া ইবনে আবূ সুফিয়ানকে বিশেষ ভাবে লিখিয়া পাঠান যেন
ইহাদের বর্ণিত হাদীস হইতে বেশী কিছু প্রচার করা না হয়। (দ্রঃ আল-ফারূক,১ম খণ্ড,পৃ:১৮৯)
এ থেকে বোঝা যায় যে খিলাফত প্রশাসন গুটিকয়েক বিশিষ্ট সাহাবী ব্যতীত সাধারণ সাহাবা ও জনগণকে হাদীস বর্ণনার অনুমতি দিত না। ব্যস এ কারণে হাদীস চর্চা ও বর্ণনা অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে ও কমে যায়। আর আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ও সাদ ইবনে মালিকের মতো বিশিষ্ট সাহাবীও হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকতেন। আবার বিশিষ্ট সাহাবী যাইদ ইবনে আরকামকে হাদীস বর্ণনা করার অনুরোধ করা হলে তিনি বার্ধক্য জনিত কারণে স্মরণশক্তি কমে যাওয়ার কথা বলে হাদীস বর্ণনা করার ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করেন। যদি বিশিষ্ট সাহাবীদের এমন অবস্থা হয় তাহলে অন্যান্য সাহাবাদের এবং সাধারণ জনগণের অবস্থা যে কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়।
সাহাবাদের মধ্যে হাদীস চর্চা ও বর্ণনা কমে যাওয়া এবং একশো বছর ধরে হাদীস চর্চা, বর্ণনা, পঠনপাঠন, লিখন ও সংকলনে নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে মহানবীর (সা) আহলুল বাইতের (আ) ফাযায়েল অর্থাৎ মহৎ গুণাবলী সম্পর্কে জনগণের অজ্ঞ থাকা এবং ইসলামের চিরশত্রু তুলাকা বনী উমাইয়ার খিলাফত (রাজতন্ত্র) প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হওয়া।
বনী উমাইয়া খিলাফত প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম উম্মাহর মাঝে মিথ্যা জাল বানোয়াট (মওদূ' موضوع) হাদীস এবং ইয়াহূদী ও আহলে কিতাবের মিথ্যা কুসংস্কারাচ্ছন্ন কল্পকাহিনী ও উপাখ্যান সমূহ অর্থাৎ ইসরাইলীয়াতের সয়লাব হওয়া
হাদীস ও সুন্নাহ বর্ণনা ও সংকলনে নিষেধাজ্ঞা বা হাদীস ও সুন্নাহ কম বর্ণনার আদেশের কারণে মহানবীর (সাঃ) পবিত্র আহলুল বাইতের (আ) সঠিক পরিচিতি ও ফাযায়েলের হাদীস সমূহের সাথে তখনকার মুসলিম উম্মাহর সঠিক ভাবে পরিচিত না হওয়ার দরুন অন্যান্য সাহাবা এবং আহলুল বাইতের শত্রুদের গুণাবলীর (ফাযায়েল) মিথ্যা, বানোয়াট ও জাল হাদীসের ব্যাপক প্রসার ও প্রচলন করা হয়।
চলবে…
ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক মুহাম্মদ মুনীর হুসাইন খান
আপনার কমেন্ট