বৃহস্পতিবার ২৩ জুলাই ২০২৬ - ১৩:৪৫
ইসলামের সেবা করা আল্লাহপ্রদত্ত এক গৌরব

কারবালা হলো মানুষের চরিত্র গঠনের বিদ্যালয় শীর্ষক সেমিনারে আল্লামা গোলাম মুর্তজা আলভী বলেছেন, ইসলামের সেবা করা আল্লাহপ্রদত্ত এক মহান সম্মান, যা দায়িত্ববোধ, আত্মত্যাগ ও অবিচলতার সঙ্গে পালন করা উচিত।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, আশুরার সংস্কৃতির প্রসার, শিক্ষা ও চরিত্র গঠনমূলক কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা এবং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শিক দায়িত্ব তুলে ধরার লক্ষ্যে পেশোয়ারে ইরানি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, মিনহাজুল কুরআন পেশোয়ার-এর সহযোগিতায় ‘কারবালা: চরিত্র গঠনের বিদ্যালয়’ শীর্ষক একটি শিক্ষামূলক সেমিনারের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পেশোয়ারে ইরানি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রধান হুসাইন চাকামী, লাহোরের শিক্ষা উন্নয়ন বিভাগের (EPD) উপ-মহাপরিচালক আল্লামা হাসান মাহমুদ জামাআতী, লাহোর থেকে আগত মিনহাজুল কুরআনের আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিভাগের পরিচালক আল্লামা গোলাম মুর্তজা আলভী, এছাড়া আলেম, চিন্তাবিদ, বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং মিনহাজুল কুরআনের সদস্যবৃন্দ।

এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল আশুরার আন্দোলন কীভাবে একজন মুমিন মানুষের চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখে তা ব্যাখ্যা করা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের দায়িত্ব তুলে ধরা এবং পরিবার ও সমাজে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের একটি মডেল হিসেবে ‘মারকাযে ইলম’ প্রকল্প পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

কারবালা মানবজাতির জন্য এক অমূল্য শিক্ষার ভাণ্ডার

অনুষ্ঠানের শুরুতে হুসাইন চাকামী বলেন, এ ধরনের সভা আশুরার সংস্কৃতি ও কারবালার বার্তা জীবন্ত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তিনি বলেন, কারবালা এবং তার ঘটনাবলি মানবজাতির জন্য, বিশেষ করে ইসলামী ও ধর্মীয় সমাজের জন্য সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও মূল্যবান শিক্ষামূলক সম্পদ।

তিনি আরও বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আন্দোলনের তিনটি প্রধান ভিত্তি ছিল-বীরত্ব ও আত্মত্যাগ, ভালোবাসা ও আবেগ, প্রজ্ঞা, আল্লাহর আনুগত্য, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব।

তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সেই বিখ্যাত উক্তির কথা স্মরণ করেন-আমার সঙ্গীদের চেয়ে অধিক বিশ্বস্ত কোনো সঙ্গী আমি জানি না।

তিনি বলেন, হযরত আব্বাস (আ.), আলী আকবর (আ.), হাবীব ইবনে মাযাহির, হুর ইবনে ইয়াজিদ রিয়াহী, কাসিম ইবনে হাসান, হযরত জয়নাব (সা.) এবং ইমামের অন্যান্য পরিবার ও সঙ্গীরা প্রত্যেকেই নৈতিক গুণাবলির উজ্জ্বল প্রতীক।

চাকামী বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.) নিজেই বীরত্ব, আত্মসম্মান, ক্ষমাশীলতা ও ধৈর্যের সর্বোচ্চ আদর্শ। হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ.) বিশ্বস্ততা, বীরত্ব ও শিষ্টাচারের শিক্ষা দেন। হুর ইবনে ইয়াজিদ রিয়াহী তওবা ও সৌভাগ্যের প্রতীক, আর হযরত জয়নাব (সা.) পবিত্রতা ও ধৈর্যের এক মহান আদর্শ।

তিনি আরও বলেন, আশুরার বিকেলের পর হযরত জয়নাব (সা.) এমন হৃদয়বিদারক শোকবাণী প্রদান করেছিলেন, যা বন্ধু ও শত্রু-সকলকেই কাঁদিয়েছিল। কারবালার নারী ও শিশুরাই এই ঘটনার প্রকৃত বার্তাবাহক ছিলেন এবং তারা এই মহাবিপর্যয়ের গভীরতা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেন।

তিনি উল্লেখ করেন, কারবালায় নারীদের শিক্ষামূলক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অনেক সাহাবি তাঁদের স্ত্রীর উৎসাহেই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। যেমন, যুহাইর ইবনে কায়ন যদি তাঁর স্ত্রীর উৎসাহ না পেতেন, তবে তিনি কারবালায় যোগ দিতেন না।

তিনি বলেন, আজকের যুগের শিমর ও ইয়াজিদ হলো বিশ্বের ঔদ্ধত্যবাদী ও অত্যাচারী শক্তিগুলো, যারা মুসলিম উম্মাহর জীবন ও সম্পদের ওপর আঘাত হানছে এবং নিজেদের অমানবিক লক্ষ্য পূরণে কোনো অপরাধ থেকেই বিরত থাকছে না।

নিজের বক্তব্যের শেষাংশে তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জীবনের শেষ মুহূর্তের মুনাজাত থেকে কিছু অংশ পাঠ করেন, যেখানে ইমাম আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতা, সাহায্য প্রার্থনা এবং তাঁর অসীম ক্ষমতা ও রহমতের প্রশংসা করেছেন।

ইসলামের দাওয়াতের দায়িত্ব কখনো শেষ হয় না

আল্লামা হাসান মাহমুদ জামাআতী তাঁর বক্তব্য শুরু করেন কুরআনের এই আয়াত দিয়ে-তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে।

তিনি বলেন, আল্লাহ প্রত্যেক যুগেই কিছু মুমিনকে মানুষকে সৎপথে আহ্বান করা, সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব দিয়েছেন।

তাঁর মতে, নবুওয়াতের সমাপ্তির সঙ্গে মানুষের হিদায়াতের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি; বরং সেই দায়িত্ব এখন মুসলিম উম্মাহ এবং দাওয়াতি আন্দোলনের ওপর ন্যস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, কুরআনে বারবার তাওহীদ, তাকওয়া এবং অতীত জাতিগুলোর ইতিহাস আলোচনার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, মানুষ সবসময় আল্লাহর দিকনির্দেশনার প্রয়োজন অনুভব করে।

বর্তমান যুগের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক সংকট সম্পর্কে তিনি বলেন, বিশ্বাসগত বিভ্রান্তি, নৈতিক অবক্ষয়, ধ্বংসাত্মক গণমাধ্যমের প্রভাব এবং ইসলামী মূল্যবোধ থেকে সমাজের দূরে সরে যাওয়া আজকের বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ইয়াজিদের শাসনামলের অনেক মিল রয়েছে।

তিনি বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আন্দোলন কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; বরং সমাজ সংস্কার, ধর্ম বিকৃতি প্রতিরোধ এবং ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষার এক চিরন্তন আদর্শ। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল ধর্মকে পুনর্জীবিত করা এবং আল্লাহর নির্দেশ পালন করা, রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন নয়।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মিনহাজুল কুরআন আন্দোলন ইসলামের দাওয়াতি দায়িত্ব পালনের একটি বাস্তব উদাহরণ। এই আন্দোলনের সদস্যরা মানুষকে আহ্বান, সমাজ সংস্কার এবং সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে নবীদের মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি ‘মারকাযে ইলম’ প্রকল্পের পরিচয় দিয়ে বলেন, এটি পরিবার ও মহল্লাভিত্তিক কুরআন ও ইসলামী শিক্ষার প্রসারে কার্যকর একটি উদ্যোগ।

তিনি সতর্ক করে বলেন, মুসলিম বিশ্বের বহু সমস্যার মূল কারণ হলো সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব পালনে মুসলমানদের অবহেলা। এই দায়িত্ব পরিত্যাগ করলে অযোগ্য ব্যক্তিরা ইসলামী সমাজের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

ইসলামের সেবা করা এক ঐশী গৌরব

আল্লামা গোলাম মুর্তজা আলভী তাঁর বক্তব্যে বলেন, ইসলাম সর্বশেষ ঐশী ধর্ম এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। আল্লাহ এর সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

তিনি ইসলামের স্থায়িত্বের তিনটি মৌলিক ভিত্তির কথা উল্লেখ করেন-শাহাদাতের সংস্কৃতি, সত্যের বাণীকে সমুন্নত রাখা, ধর্মের নবায়ন।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, শাহাদাতের সংস্কৃতি বহিরাগত শত্রুর হাত থেকে ইসলামকে রক্ষা করে, সত্যের বাণী সমুন্নত রাখা অভ্যন্তরীণ বিকৃতি প্রতিরোধ করে এবং ধর্মের নবায়ন সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও ইসলামী জ্ঞানকে সংরক্ষণ করে।

তিনি বলেন, আহলে বাইত (আ.) এই তিনটি নীতির পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি এবং ইমাম হুসাইন (আ.) সত্য রক্ষা ও ধর্ম বিকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের সর্বোচ্চ আদর্শ। আশুরার আন্দোলন যুগে যুগে ইসলামের রক্ষার আদর্শ হয়ে থাকবে।

তিনি বলেন, আজ এই দায়িত্ব সুসংগঠিত ধর্মীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে অব্যাহত রাখতে হবে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক মিনহাজুল কুরআন আন্দোলন ধর্ম রক্ষা, সত্য প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামী জ্ঞান পুনর্জাগরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

তিনি তাঁর বক্তব্যের বড় একটি অংশ উৎসর্গ করেন ধর্মের সেবার মর্যাদা ব্যাখ্যা করতে। পার্থিব পেশার সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ইসলামের সেবা করা আল্লাহপ্রদত্ত এক গৌরব। এই দায়িত্ব পালন করতে হবে দায়িত্ববোধ, আত্মত্যাগ এবং অবিচলতার সঙ্গে।

হযরত ইয়াকুব (আ.), হযরত ইউসুফ (আ.) এবং হযরত ইউনুস (আ.)-এর জীবনের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধৈর্য, দৃঢ়তা এবং আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি আত্মসমর্পণ ইসলামের দাওয়াতি কর্মীদের প্রধান গুণ। তিনি সাংস্কৃতিক সেবার পথকে ‘কারবালার পথ’ হিসেবে বর্ণনা করেন-যে পথ বিশ্বস্ততা, ধৈর্য এবং কষ্ট সহ্য করার প্রস্তুতি দাবি করে।

তিনি বক্তব্যের শেষে বলেন, ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সফলতার প্রধান শর্ত হলো ইখলাস (নিষ্কলুষ আন্তরিকতা)। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য ছাড়া খ্যাতি, পদমর্যাদা বা মানুষের প্রশংসার জন্য কোনো কাজ করা উচিত নয়। তিনি সংগঠনের সদস্যদের ঐক্য বজায় রাখা, ধারাবাহিকভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া, ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে দূরে থাকা এবং আন্তরিকতার চেতনা শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।

কারবালার আদর্শ যুগে যুগে মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা

অনুষ্ঠানের শেষ বক্তা ছিলেন পেশোয়ার মিনহাজুল কুরআন ইনস্টিটিউটের সভাপতি মির্জা শাহিদ বেগ।

তিনি বলেন, কারবালার আন্দোলন প্রতিটি যুগে অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সত্য প্রতিষ্ঠার পথে মুক্তিকামী ও বিপ্লবী মানুষদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কারবালার শিক্ষা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সব সঙ্গীর জীবনকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে-তাঁরা বৃদ্ধ হোন বা যুবক, নারী হোন বা পুরুষ, এমনকি শিশু হলেও। এই আদর্শ মুসলিম উম্মাহ এবং বিশ্বের সব স্বাধীনচেতা মানুষের মধ্যে ঈমানদার, সচেতন ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার ভিত্তি স্থাপন করেছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha