হাওজা নিউজ এজেন্সি: আশুরাকে যদি সত্য ও অসত্যের চূড়ান্ত সংঘর্ষের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়, তবে আরবাঈনের জিয়ারত আমাদের জানায়—এই সংঘাত কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, কোন কোন কারণ মুসলিম সমাজকে সেই মর্মান্তিক পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল এবং ভবিষ্যতে কীভাবে এমন বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
এই জিয়ারত শুধু ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আন্দোলনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে না; বরং সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি জাতির পতনের অন্তর্নিহিত কারণগুলোও উন্মোচন করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই এসব কারণ কোনো সমাজে পুনরাবৃত্তি হয়েছে, তখনই সেই সমাজকে ভয়াবহ মূল্য দিতে হয়েছে।
আশুরা: অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা থেকে মানবমুক্তির সংগ্রাম
আরবাঈনের জিয়ারতের সূচনায় ইমাম জাফর আস-সাদিক (আ.) ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আত্মত্যাগের মূল লক্ষ্য এভাবে বর্ণনা করেছেন—
وَبَذَلَ مُهْجَتَهُ فِيكَ لِيَسْتَنْقِذَ عِبَادَكَ مِنَ الْجَهَالَةِ وَحَيْرَةِ الضَّلَالَةِ
অর্থাৎ, তিনি আপনার সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, যাতে আপনার বান্দাদের অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত করতে পারেন।
এই বক্তব্য স্পষ্ট করে যে, আশুরার লক্ষ্য কেবল একজন জালিম শাসকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল না; বরং মানবজাতিকে দুটি মারাত্মক বিপদ—অজ্ঞতা এবং পথভ্রষ্টতার বিভ্রান্তি—থেকে উদ্ধার করা।
এখানে অজ্ঞতা বলতে শুধু শিক্ষার অভাব বোঝানো হয়নি; বরং এমন এক মানসিক অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে মানুষ সত্যকে চিনতে ব্যর্থ হয় অথবা চিনেও তা উপেক্ষা করে। আর পথভ্রষ্টতার বিভ্রান্তি হলো এমন এক অবস্থা, যখন অপপ্রচার, বিকৃতি ও মিথ্যা প্রচারণার কারণে সমাজ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়ের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
কারবালার প্রান্তরে এমনই ঘটেছিল। অনেকেই মনে করেছিল, তারা ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করছে; অথচ বাস্তবে তারা আল্লাহর মনোনীত প্রতিনিধির বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছিল।
দুনিয়ার মোহ: একটি সমাজের অধঃপতনের সূচনা
আরবাঈনের জিয়ারতে আশুরার বিরোধী শক্তির প্রথম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে—
وَقَدْ تَوَازَرَ عَلَيْهِ مَنْ غَرَّتْهُ الدُّنْيَا"
অর্থাৎ, যারা দুনিয়ার মোহে প্রতারিত হয়েছিল, তারা সবাই তাঁর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।
কারবালার শত্রুরা প্রথমে তরবারি হাতে নেয়নি; তারা আগে নিজেদের হৃদয় দুনিয়ার মোহের কাছে সমর্পণ করেছিল। এখানে দুনিয়া বলতে শুধু ধন-সম্পদ নয়; ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা, খ্যাতি এবং রাজনৈতিক স্বার্থও বোঝানো হয়েছে।
দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি বিশেষ করে সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ তখন সত্যের মাপকাঠি হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান, আল্লাহর সন্তুষ্টি নয়।
এই মানসিকতাই কুফার বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নীরব থাকতে বাধ্য করেছিল। কেউ উমাইয়া শাসকদের সমর্থন করেছিল, আবার কেউ সরাসরি উমর ইবনে সাদের বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল।
এক সর্বনাশা লেনদেন
এরপর জিয়ারতে বলা হয়েছে—
بَاعَ حَظَّهُ بِالْأَرْذَلِ الْأَدْنَى وَشَرَى آخِرَتَهُ بِالثَّمَنِ الْأَوْكَسِ.
অর্থাৎ, সে তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট পার্থিব স্বার্থের বিনিময়ে নিজের চিরস্থায়ী সৌভাগ্য বিকিয়ে দিয়েছে এবং অতি নগণ্য মূল্যে নিজের পরকাল বিসর্জন দিয়েছে।
এটি এমন এক লেনদেন, যেখানে মানুষ সাময়িক ক্ষমতা, ক্ষণস্থায়ী সম্পদ বা অল্পকালের মর্যাদার বিনিময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও চিরস্থায়ী মুক্তি হারিয়ে ফেলে।
পবিত্র কুরআন এমন লেনদেনকে "স্পষ্ট ক্ষতি" (খুসরানুন মুবীন) বলে অভিহিত করেছে।
কারবালার শিক্ষা হলো—বাতিলের পক্ষে দাঁড়ানো সবাই অজ্ঞ ছিল না; অনেকে সত্যকে চিনত, কিন্তু সত্যের পাশে দাঁড়ানোর মূল্য দিতে প্রস্তুত ছিল না।
প্রবৃত্তির অনুসরণ: যখন নফস ওহির স্থলাভিষিক্ত হয়
আরবাঈনের জিয়ারতে আরও বলা হয়েছে—
وَتَغَطْرَسَ وَتَرَدَّى فِي هَوَاهُ
অর্থাৎ, সে অহংকারে অন্ধ হয়েছে এবং নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে গিয়ে ধ্বংসের দিকে পতিত হয়েছে।
অহংকার ও কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ মানুষের বিবেক ও বিচারবোধকে অন্ধ করে দেয়। যখন ব্যক্তিগত কামনা-বাসনা, গোত্রীয় স্বার্থ, ক্ষমতার লোভ কিংবা সামাজিক মর্যাদা রক্ষার আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর নির্দেশের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন মানুষ সুস্পষ্ট সত্যও প্রত্যাখ্যান করতে দ্বিধা করে না।
কারবালার ইতিহাসে এমন বহু মানুষের কথা পাওয়া যায়, যারা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মর্যাদা সম্পর্কে অবগত ছিল; তবুও অহংকার, লোভ কিংবা ভয়ের কারণে তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারেনি।
মুনাফিকি: প্রকাশ্য শত্রুর চেয়েও ভয়ংকর
জিয়ারতে এরপর সতর্ক করে বলা হয়েছে,
وَأَطَاعَ أَهْلَ الشِّقَاق وَالنِّفَاقِ وَحَمَلَةَ الْأَوْزَارِ.
অর্থাৎ, সে বিভেদ সৃষ্টিকারী, মুনাফিক এবং পাপের বোঝা বহনকারীদের অনুসরণ করেছে।
যে সমাজ আল্লাহপ্রদত্ত নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো নেতৃত্বের অনুসারী হয়ে যায়। তখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করে মুনাফিকি, আদর্শের বিকৃতি এবং দুনিয়াকেন্দ্রিক চিন্তাধারা।
বনি উমাইয়া আশুরার বহু আগেই জনমতকে বিপথগামী করার পরিকল্পনা শুরু করেছিল। জাল হাদিস প্রচার, আহলে বাইত (আ.)-এর ফজিলত গোপন করা, ইমাম আলী (আ.)-এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো, ভোগবাদকে উৎসাহিত করা এবং ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধ বিকৃত করার মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে সমাজকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
সুতরাং আশুরা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের আদর্শিক বিচ্যুতি ও পরিকল্পিত বিকৃতির অনিবার্য পরিণতি।
আশুরা কি আবারও ঘটতে পারে?
আরবাঈনের জিয়ারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—আশুরা কেবল অতীতের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়।
যে সমাজ দুনিয়ার মোহ, ব্যক্তিস্বার্থ, নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে আপস, কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ, অহংকার এবং মুনাফিকদের নেতৃত্বকে গ্রহণ করবে, সেই সমাজও একসময় সত্যের বিপক্ষে দাঁড়াতে পারে—যদিও সময়, স্থান ও পরিস্থিতি ভিন্ন হবে।
অতএব, আরবাঈনের জিয়ারত শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্যও এক চিরন্তন সতর্কবার্তা।
মুক্তির পথ
এসব বিচ্যুতির বিপরীতে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শ ছিল—
فَجَاهَدَهُمْ فِيكَ صَابِرًا مُحْتَسِبًا
অর্থাৎ, তিনি ধৈর্য, নিষ্ঠা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশায় তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন।
ধৈর্য, একনিষ্ঠতা, দূরদৃষ্টি, আল্লাহপ্রদত্ত নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য এবং ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে স্থান দেওয়াই ছিল ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শিক্ষা।
মুসলিম সমাজ যদি আশুরার মতো বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি থেকে রক্ষা পেতে চায়, তবে তাকে এই শিক্ষায় ফিরে আসতে হবে—সত্যের মানদণ্ড ক্ষমতা নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশিত নেতৃত্ব; প্রচারণা নয়, বরং প্রজ্ঞা; আর ব্যক্তিস্বার্থ নয়, বরং ঈমান, ইখলাস ও নৈতিক দৃঢ়তা।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে আরবাঈনের জিয়ারত কেবল একটি জিয়ারতের পাঠ নয়; এটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ, নৈতিক আত্মসমালোচনা এবং সচেতনতা সৃষ্টির এক চিরন্তন ঘোষণাপত্র। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কাফেলায় থাকা এবং ইয়াজিদের বাহিনীতে যোগ দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে সময় বা ভূগোল নয়; বরং মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, সিদ্ধান্ত এবং জীবনাচরণ।
আপনার কমেন্ট