বুধবার ৫ আগস্ট ২০২৬ - ১৭:০৪
«আরবাঈন» ও «সান্তিয়াগো»: অস্তিত্বের অর্থের সন্ধানে

অস্ট্রিয়ায় নিযুক্ত ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা বলেন: আরবাঈন ও কামিনো ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের দিক থেকে ভিন্ন হলেও, উভয়ই মানুষকে অর্থ, সত্য, স্রষ্টা এবং নিজের প্রকৃত সত্তার অনুসন্ধানের দিকে আহ্বান জানায়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘আত্মার পথসমূহ’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীটি দুই বৃহৎ তীর্থ ঐতিহ্যের তুলনামূলক উপস্থাপনাকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইমাম হুসাইনের আরবাঈন উপলক্ষে পদযাত্রা এবং খ্রিস্টীয় সেন্ট জেমস (কামিনো) তীর্থপথের পদযাত্রা। অস্ট্রিয়ায় ইরানের সাংস্কৃতিক দপ্তরের উদ্যোগে ভিয়েনার ‘ইরানি হিকমাহ হাউস’-এ প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করা হয়।

অনুষ্ঠানে গবেষক, ধর্ম ও সংস্কৃতির আন্তঃসংলাপে আগ্রহী ব্যক্তিবর্গ, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, কূটনীতিক এবং ধর্মীয় অধ্যয়নে আগ্রহী বহু মানুষ উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত অতিথিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও আগ্রহের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে অস্ট্রিয়ায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা এবং রাজনৈতিক দর্শন, সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত অধ্যয়নের অধ্যাপক রেজা গোলামি ‘ঐশ্বরিক ক্ষেত্রের দিকে অগ্রযাত্রা; আত্মচিন্তা, আধ্যাত্মিকতা ও সংলাপের এক যাত্রা’ শীর্ষক বক্তব্য প্রদান করেন।

তিনি বলেন, পদযাত্রাভিত্তিক তীর্থযাত্রা মানুষের জীবনের অন্যতম মূল্যবান সুযোগ, যা তাকে নিজের কাছে ফিরে আসা, আত্মপর্যালোচনা এবং স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার সুযোগ দেয়।

তিনি উল্লেখ করেন, এ ধরনের যাত্রায় মানুষ দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা ও কোলাহল থেকে দূরে সরে জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলো নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ পায়। তাঁর ভাষায়, ধর্মীয় তীর্থযাত্রা কেবল স্থান পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং এটি একটি অন্তর্গত ভ্রমণ, যেখানে মানুষ অতীতকে পুনর্মূল্যায়ন করে, ভবিষ্যতের পথ সংশোধন করে এবং মানব অস্তিত্বের সত্যকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে।

গোলামি বলেন, প্রকৃত সাফল্য কেবল ক্ষমতা, সম্পদ বা বস্তুগত অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সফল প্রচেষ্টা হলো সেই প্রচেষ্টা, যা মানুষকে আরও নৈতিক, দয়ালু, বিনয়ী, দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল করে তোলে। তিনি নৈতিক জীবনকে স্রষ্টার নৈকট্য লাভের পথ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, পদযাত্রাভিত্তিক তীর্থযাত্রা ত্যাগ, ক্ষমা, ধৈর্য, সহমর্মিতা এবং নিঃস্বার্থ সেবার মতো গুণাবলির বাস্তব অনুশীলন।

অস্ট্রিয়ায় ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা আরবাঈন পদযাত্রাকে আধুনিক বিশ্বের মানবিক সংহতি ও নৈতিক জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, প্রতি বছর প্রায় দুই কোটি তীর্থযাত্রীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই আধ্যাত্মিক আয়োজনে স্বেচ্ছাসেবামূলক সেবা, উদারতা, পারস্পরিক সহানুভূতি এবং ইরাকি জনগণের পক্ষ থেকে কোটি মানুষের আতিথেয়তা নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের এক অনন্য উদাহরণ, যা বর্তমান সমাজকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

তিনি সেন্ট জেমসের তীর্থপথ (কামিনো)-এর প্রসঙ্গ তুলে বলেন, আরবাঈন ও কামিনো ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের দিক থেকে ভিন্ন হলেও উভয়ই মানুষকে অর্থ, সত্য, স্রষ্টা এবং নিজের প্রকৃত সত্তার অনুসন্ধানের দিকে আহ্বান জানায়। ধর্মীয় পার্থক্য সংলাপের বাধা নয়; বরং একে অপরকে গভীরভাবে বোঝার এবং আরও নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিশ্ব গড়ার জন্য সহযোগিতার সুযোগ।

গোলামি আরও বলেন, ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের মধ্যে সংলাপ বিস্তারে এ ধরনের প্রদর্শনীর গুরুত্ব অনেক। দুই মহান তীর্থ ঐতিহ্যের ছবি পাশাপাশি উপস্থাপন করা এই সত্যকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে শিল্প সংস্কৃতি ও ধর্মের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার পথ উন্মুক্ত করতে পারে।

শেষে তিনি বলেন, তীর্থযাত্রার প্রকৃত মূল্য নিহিত থাকে মানুষের অন্তরে সৃষ্ট পরিবর্তনের মধ্যে। যদি মানুষ এই যাত্রার পর আরও দয়ালু, নৈতিক ও দায়িত্বশীল হয়ে ফিরে আসে, তবে সেই তীর্থযাত্রা তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করেছে।

«সেন্ট জেমস»: ধর্মগুলোর সহাবস্থান ও শান্তির পথ

পরবর্তীতে সেন্ট জেমসের তীর্থপথ (কামিনো)-এর অভিজ্ঞ গাইড এবং ‘পশ্চিমের দিকে ১০০০ কিলোমিটার; সেন্ট জেমসের পথে নতুন আত্মসত্তার সন্ধানে’ বইয়ের লেখক পিটার হাইডার (Peter Haider) এই পথের ঐতিহাসিক পটভূমি, আধ্যাত্মিক দিক এবং তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

তিনি বলেন, সান্তিয়াগোর পথের শিকড় খ্রিস্টপূর্ব যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এই পথ নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে এবং পরবর্তীতে এটি খ্রিস্টীয় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থপথে পরিণত হয়েছে।

হাইডার ইতিহাসের কিছু সময়ের সমালোচনামূলক দিকও তুলে ধরেন, যখন রাজনৈতিক ও সামরিক উদ্দেশ্যে সেন্ট জেমসের নামের অপব্যবহার করা হয়েছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমানে এই পথ শান্তি, সহনশীলতা এবং বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, কামিনো এখন আর কেবল একটি খ্রিস্টীয় তীর্থযাত্রা নয়; বরং বিভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষ নানা উদ্দেশ্য নিয়ে এই পথে অংশগ্রহণ করেন। এই পথ সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং ভিন্ন জীবনধারাকে বোঝার এক শিক্ষালয়ে পরিণত হয়েছে, যা মানুষের মধ্যে সংলাপের জন্য মূল্যবান ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

হাইডার তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, একটি মানসিক সংকট ও কর্মজীবনের ক্লান্তির পর তাঁর এই যাত্রার সূচনা হয়েছিল। ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ কামিনো পথ অতিক্রম তাঁর জীবনকে পরিবর্তন করে দেয়।

তিনি বলেন, দীর্ঘ পদযাত্রার কয়েক দিন পর মানুষের মন দৈনন্দিন জীবনের চাপ থেকে মুক্ত হতে শুরু করে এবং আত্ম-অনুসন্ধান, গভীর চিন্তা ও আধ্যাত্মিক পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই অভিজ্ঞতা তাঁর সঙ্গে আধ্যাত্মিক ও খ্রিস্টীয় মূল্যবোধের পুনঃসংযোগ ঘটিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সেন্ট জেমসের পথে তীর্থযাত্রী ও পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে পর্যটনকেন্দ্রিকতার কারণে এর আধ্যাত্মিক দিক দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এই পথের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

শেষে হাইডার আরবাঈন ও সেন্ট জেমসকে কেন্দ্র করে যৌথ প্রদর্শনী আয়োজনকে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ শক্তিশালী করার একটি মূল্যবান উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও উভয় ঐতিহ্য মানুষকে আত্মপরিচয়, সত্য, শান্তি এবং আত্মিক উৎকর্ষের দিকে আহ্বান জানায়।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha