হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরের ওপর দুটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। টোকিওতে নিযুক্ত ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা শাহরুজ ফালাহাতপিশে, যিনি বর্তমানে হিরোশিমায় অনুষ্ঠিত ইরানি চলচ্চিত্র সপ্তাহে অংশ নিতে সেখানে অবস্থান করছেন, এই মানবিক বিপর্যয় এবং মানবজাতির জন্য এর চিরন্তন সতর্কবার্তা নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। নিচে তার সারাংশ উপস্থাপন করা হলো।
ধ্বংসস্তূপ থেকে শান্তির প্রতীক
প্রতি বছর ৬ আগস্ট হিরোশিমায় শান্তির ঘণ্টা বাজানো হয় এবং পুরো শহর এক মিনিট নীরবতা পালন করে। এই সংক্ষিপ্ত আচারটির পেছনে রয়েছে প্রায় সাত দশকের ধারাবাহিক পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরকে বিশ্বশান্তির প্রতীকে রূপান্তর করা হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে হিরোশিমা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নগরী। কিন্তু পারমাণবিক হামলার মাত্র চার বছর পর জাপানের পার্লামেন্ট বিশেষ আইন পাস করে শহরটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শান্তির শহর’ ঘোষণা করে। এরপর ১৯৫৫ সালে শান্তি স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়, ১৯৬৮ সালে ‘হিরোশিমা পিস কালচার ফাউন্ডেশন’ গঠিত হয় এবং বিস্ফোরণস্থলের নিকটে অবস্থিত আংশিকভাবে টিকে থাকা গেনবাকু গম্বুজ সংরক্ষণ করে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
জাপানিরা তাদের ক্ষত লুকিয়ে রাখেনি; বরং সেটিকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে শান্তির বার্তা প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে।
একটি শহরের কূটনৈতিক ভূমিকা
হিরোশিমার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল ‘মেয়রস ফর পিস’ (শান্তির জন্য মেয়রগণ) নেটওয়ার্ক। ১৯৮২ সালে হিরোশিমার তৎকালীন মেয়রের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই নেটওয়ার্কে বর্তমানে বিশ্বের ১৬৬টি দেশের আট হাজারেরও বেশি শহর যুক্ত রয়েছে।
নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, জাপানের পর ইরানেই এই নেটওয়ার্কের সদস্য শহরের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এক হাজারেরও বেশি ইরানি শহর এর সদস্য এবং ২০১৬ সাল থেকে তেহরান এ নেটওয়ার্কে ইরানের প্রধান প্রতিনিধি শহর হিসেবে কাজ করছে।
এছাড়া পারমাণবিক বোমা হামলায় বেঁচে যাওয়া মানুষদের (হিবাকুশা) স্মৃতিচারণ সংরক্ষণ, নথিভুক্তকরণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সেই অভিজ্ঞতা পৌঁছে দেওয়ার জন্য "মেমোরি সাকসেসরস" (স্মৃতির উত্তরসূরি) নামে একটি কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে অনুরণিত এক ঐতিহ্য
প্রতি বছর ৬ আগস্ট শান্তি স্মৃতি উদ্যানে নির্দিষ্ট নিয়মে স্মরণানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ছয়টায় উদ্যান জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। সকাল আটটায় ‘কেনসুই’ নামে একটি অনুষ্ঠান হয়, যেখানে মৃত্যুর সময় তৃষ্ণার্ত মানুষদের স্মরণে পানি উৎসর্গ করা হয়।
একই সময়ে আগের এক বছরে নতুন করে শনাক্ত হওয়া নিহতদের নাম স্মারক নিবন্ধনে যুক্ত করা হয়। বর্তমানে এই নিবন্ধনে ৩ লাখ ৪৯ হাজারেরও বেশি মানুষের নাম সংরক্ষিত রয়েছে।
সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে-যে মুহূর্তে ১৯৪৫ সালে বোমাটি বিস্ফোরিত হয়েছিল-শান্তির ঘণ্টা বাজে, শহরের সাইরেন বেজে ওঠে এবং সবাই এক মিনিট নীরবতা পালন করে। এরপর হিরোশিমার মেয়র বার্ষিক শান্তি ঘোষণা পাঠ করেন, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতাদের কাছেও পাঠানো হয়। স্থানীয় শিক্ষার্থীরা শান্তির অঙ্গীকার পাঠ করে এবং বিশ্বশান্তির প্রতীক হিসেবে সাদা কবুতর উড়িয়ে দেওয়া হয়।
সন্ধ্যায় হাজার হাজার কাগজের প্রদীপ শান্তির বার্তাসহ মোটোইয়াসু নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যা প্রতি বছর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
ধ্বংসাবশেষ থেকে পর্যটনকেন্দ্র
হিরোশিমা তার নগর পরিকল্পনাকেও এই স্মৃতিচর্চার অংশ করেছে। বোমা হামলার আগের কিছু ট্রাম এখনও শহরে চলাচল করে। প্রশস্ত "শান্তি বুলেভার্ড" দর্শনার্থীদের স্মৃতি উদ্যানে নিয়ে যায়। প্রতি বছর লাখো পর্যটক এই স্থান পরিদর্শন করেন।
গত বছর প্রায় ২৫ লাখ মানুষ জাদুঘর ও স্মৃতি উদ্যান পরিদর্শন করেন, যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ছিলেন বিদেশি। এতে শুধু শান্তির বার্তাই ছড়ায়নি, বরং শহরের হোটেল, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় অর্থনীতিও উপকৃত হয়েছে।
এক কাগজের সারসের গল্প
হিরোশিমার সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকগুলোর একটি হলো অরিগামি কাগজের সারস। সাদাকো সাসাকি নামের এক কিশোরী, যিনি পারমাণবিক বিকিরণের কারণে পরবর্তীকালে অসুস্থ হয়ে মারা যান, সুস্থ হয়ে ওঠার আশায় এক হাজার কাগজের সারস বানানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর এই গল্প কাগজের সারসকে বিশ্বব্যাপী শান্তির প্রতীকে পরিণত করেছে। আজও বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ হিরোশিমায় কাগজের সারস নিয়ে আসেন বা স্মৃতি উদ্যানে উৎসর্গ করেন।
লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি
নিবন্ধের শেষ অংশে লেখক যুক্তি দিয়েছেন যে, হিরোশিমার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়ের স্মৃতি সংরক্ষণ, শান্তির ভাষায় আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরা, স্মৃতিচর্চার জন্য স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, বিশ্বব্যাপী শহরগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং নতুন প্রজন্মকে এই ইতিহাসের ধারক হিসেবে প্রস্তুত করার মাধ্যমে বিভিন্ন জাতি তাদের অতীতের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাকে শান্তি, মানবিক সচেতনতা ও আন্তর্জাতিক সংলাপের একটি ইতিবাচক ভিত্তিতে রূপ দিতে পারে।
তিনি উপসংহারে বলেন, হিরোশিমা দেখিয়ে দিয়েছে যে ধৈর্য, সৃজনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি জাতির বেদনাময় স্মৃতিও বিশ্বমানবতার জন্য স্থায়ী আশা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং শান্তির বার্তায় পরিণত হতে পারে।
আপনার কমেন্ট