বৃহস্পতিবার ৬ আগস্ট ২০২৬ - ১২:৫৯
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শের অনুসারীরা কখনো জালিমদের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না

নাইজেরিয়ার ইসলামিক মুভমেন্টের নেতা শাইখ ইব্রাহিম জাকযাকি সুলেজা শহরে অনুষ্ঠিত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আরবাঈন পদযাত্রার সমাপনী অনুষ্ঠানে বলেন, ইসলামী সংস্কৃতিতে আরবাঈন জিয়ারতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এবং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শের অনুসারীরা জুলুমের কাছে নতি স্বীকার করার চেয়ে শাহাদাতকে অধিক মর্যাদাপূর্ণ মনে করেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, আবুজার নিকটবর্তী সুলেজা শহরের কেন্দ্রীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানে শাইখ জাকযাকি বক্তব্য দেন।

ইসলামী সংস্কৃতিতে আরবাঈন জিয়ারতের গুরুত্ব

বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, আজ কারবালার ময়দানে ইমাম হুসাইন (আ.), তাঁর পরিবার এবং বিশ্বস্ত সঙ্গীদের শাহাদাতের চল্লিশতম দিন।

আরবাঈন জিয়ারতের ইতিহাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৬১ হিজরি সাল থেকেই মহানবী (সা.)-এর সাহাবি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ আনসারির মাধ্যমে এটি মুসলমানদের মধ্যে একটি স্থায়ী সুন্নত ও ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, কারবালার ঘটনার পর জাবির ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কবর জিয়ারত করেন, সেখানে শোক প্রকাশ করেন এবং ইমামকে সম্বোধন করেন, যদিও তিনি জানতেন যে বাহ্যিকভাবে কোনো উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়।

মহানবী (সা.)-এর একটি হাদিস উদ্ধৃত করে শাইখ জাকযাকি বলেন, যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়কে ভালোবাসে, কিয়ামতের দিন সে তাদের সঙ্গেই থাকবে; আর যে তাদের কর্মকে ভালোবাসে, সে তাদের আমলের অংশীদার হবে।

তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন, আমরা ইমাম হুসাইন (আ.), তাঁর পরিবার এবং তাঁর সঙ্গীদের ভালোবাসি, তাঁদের পথ ও আদর্শকে ভালোবাসি এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের তাঁদের সঙ্গেই পুনরুত্থিত করেন।

আরবাঈন: একজন মুমিনের পরিচয়

শাইখ জাকযাকি কারবালায় আরবাঈনের বিশাল সমাবেশের কথা উল্লেখ করে বলেন, ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর একটি হাদিস অনুযায়ী আরবাঈন জিয়ারত একজন মুমিনের অন্যতম নিদর্শন।

তিনি বলেন, এই জিয়ারত শুধু কারবালায় উপস্থিত ব্যক্তিদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; দূরে থেকেও এটি পালন করা যায়।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে আরবাঈন পালিত হচ্ছে, যা আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষা ও আদর্শকে জীবন্ত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

আহলে বাইত (আ.)-এর স্মৃতি কখনো মুছে যাবে না

শাইখ জাকযাকি ইয়াজিদের দরবারে হযরত জয়নাব (সা.)-এর ঐতিহাসিক ভাষণের কথা উল্লেখ করে বলেন, তিনি ইয়াজিদকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, আহলে বাইত (আ.)-এর নাম ও স্মৃতি কখনো মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, আজও বিশ্বজুড়ে মানুষ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর স্মৃতি অম্লান রেখেছে এবং ইয়াজিদ ও তার আদর্শকে প্রত্যাখ্যান করছে।

তিনি আরও বলেন, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য আল্লাহ আহলে বাইত (আ.)-কে মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।

হায়হাত মিনাজ-জিল্লাহ’-ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পথ

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর অবস্থানের প্রসঙ্গ টেনে শাইখ জাকযাকি বলেন, অত্যাচারীদের কাছে আত্মসমর্পণ কিংবা শাহাদাত-এই দুই পথের মধ্যে তিনি শাহাদাতের পথ বেছে নিয়েছিলেন এবং ঘোষণা করেছিলেন, হায়হাত মিনাজ-জিল্লাহ (অপমান ও লাঞ্ছনা আমাদের জন্য নয়)।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর অনুসারীরা কখনো জালিমদের সামনে মাথা নত করবে না।

তার ভাষায়, আল্লাহ আমাদের সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন; তাই আমরা অপমানিত মানুষের শাসনের অধীনে জীবনযাপন মেনে নেব না।

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শ: দৃঢ়তা ও প্রতিরোধের শিক্ষা

শাইখ জাকযাকি বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শ মুসলমানদের জন্য অসংখ্য শিক্ষা বহন করে। তিনি উল্লেখ করেন, ৪৭ বছর আগে ইরানের ইসলামি বিপ্লবও এই আদর্শ থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়েছিল।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সত্ত্বেও ইরান দুর্বল হয়ে পড়েনি; বরং আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। তাঁর মতে, এটি মুসলিম বিশ্বের জন্য গর্বের বিষয়।

তিনি আরও বলেন, এটাই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শের শিক্ষা-আমরা আত্মসমর্পণের চেয়ে শাহাদাতকে অগ্রাধিকার দিই।

আহলে বাইত (আ.)-এর অনুসারীদের বিজয়ের প্রত্যাশা

তিনি বলেন, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিজয় তাদেরই, যারা ইমাম হুসাইন (আ.), ইমাম আলী (আ.), মহানবী (সা.) এবং ইমাম মাহদি (আ.)-এর পথ অনুসরণ করে।

তিনি ইমাম মাহদি (আ.)-কে এই ধারার নেতৃত্বদানকারী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তাঁর আবির্ভাব ঘটবে এবং ইসলাম বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হবে। তখন এই আদর্শের অনুসারীরা সংখ্যালঘু ও দুর্বল অবস্থা থেকে সম্মান ও শক্তির অবস্থানে পৌঁছাবে।

আরবাঈনের শহীদদের স্মরণ

শাইখ জাকযাকি ১৪৩৫ হিজরিতে কানো অভিমুখী আরবাঈন পদযাত্রায় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ২১ জন শোকপালনকারী ও জিয়ারতকারীর স্মরণে শ্রদ্ধা জানান।

তিনি বলেন, নানা ধরনের চাপ ও বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় কার্যক্রম বন্ধ হবে না।

তার ভাষায়, আপনারা গুলি করুন বা না করুন, আমরা আমাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড বন্ধ করব না।

শিগগিরই সবাই আমাদের পাশে থাকবে

বক্তব্যের শেষ অংশে তিনি জনগণের জীবনযাত্রা ও কল্যাণের প্রতি রাষ্ট্রের উদাসীনতার সমালোচনা করে বলেন, এই পরিস্থিতি চিরকাল থাকবে না।

বিরোধীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আজ আমাদের সংখ্যা কম মনে করে ভাববেন না যে সবসময় এমনই থাকবে। আমরা এই দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করি এবং খুব শিগগিরই দেখবেন, দেশের মানুষ আমাদের পাশেই থাকবে।

তিনি উপসংহারে বলেন, ইনশাআল্লাহ, এটি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি-এই দ্বীন চিরস্থায়ী থাকবে এবং প্রতিষ্ঠিত থাকবে।

শেষে শাইখ ইব্রাহিম জাকযাকি উপস্থিত সবার সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য দোয়া করেন।

সমাপনী অনুষ্ঠান

সুলেজায় আরবাঈন পদযাত্রার সমাপনী অনুষ্ঠান সকাল ১০টায় ইত্তিহাদুশ-শুআরা দলের মাদহ ও নাশিদ পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হয়। এরপর হারিসাওয়াইন্তিজার সাংস্কৃতিক দল নাট্য পরিবেশনা করে। শাইখ জাকযাকির বক্তব্যের আগে IM Production কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি নাটক মঞ্চস্থ করে।

অনুষ্ঠানটি মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত চলতে থাকে এবং শাইখ ইব্রাহিম জাকযাকির সমাপনী বক্তব্য ও দোয়ার মাধ্যমে শেষ হয়।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha