বৃহস্পতিবার ৬ আগস্ট ২০২৬ - ১৩:৪৮
শিয়া-সুন্নি ঐক্যের নতুন দিগন্ত: প্রতাপপুরে ইরানি প্রতিনিধিদলের ঐতিহাসিক সফর

প্রতাপপুর (পশ্চিমবঙ্গ), ৬ আগস্ট: শিয়া-সুন্নি বিভেদ ভুলে ঐক্যের নতুন অধ্যায় রচিত হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার প্রতাপপুরে-যেখানে ইরানের উচ্চপদস্থ আলেম ও দার্শনিকের প্রতিনিধিদল ঐতিহাসিক সফর শেষে শিয়া-সুন্নি সংহতি কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার প্রতাপপুর পরিণত হলো আন্তর্জাতিক ইসলামী সংহতির এক উজ্জ্বল মিলনক্ষেত্রে। ইরানের এক উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল সেখানে পৌঁছেছেন শিয়া ও সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহাবস্থানের বার্তা নিয়ে।

প্রতিনিধিদলে ছিলেন:

· ডক্টর আলী কানাভাতি-পবিত্র উদ্ধারকারী আন্তর্জাতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক।

· ডক্টর মোহাম্মদ কাশিজাদে-তেহরানের শহীদ রাজাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক।

· হুজ্জাতুল ইসলাম শেখ ইব্রাহিম জারগার-ইসলামী সংস্কৃতি ও চিন্তাধারা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহকারী অধ্যাপক এবং ইমাম রেজা (আ.) সেমিনারি ইনস্টিটিউট অফ হায়ার এডুকেশন ফর ফিকহ অ্যান্ড হিউম্যান সায়েন্সেস-এর পরিচালক।

সফরের মূল লক্ষ্য: বিভেদ ভুলে ঐক্যের পথে

প্রতাপপুরের স্থানীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক বিশেষ সমাবেশে তারা বলেন, ইসলামের মূলভিত্তি হলো তাওহিদ (একত্ববাদ) এবং মানুষের সেবা। শিয়া-সুন্নি নামক বিভাজন কৃত্রিম; প্রকৃত ইসলামে স্থান রয়েছে ভ্রাতৃত্ব ও সংলাপের।

ডক্টর কানাভাতি তাঁর বক্তব্যে ভারতের বহুধর্মীয় সমাজকে ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন এবং বলেন, প্রতাপপুরের মাটি আজ প্রমাণ করছে যে ধর্মীয় পার্থক্য কখনোই সহাবস্থানের বাধা নয়-বরং তা হতে পারে পরস্পরকে জানার ও সম্মান করার সুযোগ।

ডক্টর কাশিজাদে শিক্ষাক্ষেত্রে শিয়া-সুন্নি যৌথ পাঠ্যক্রম তৈরির ওপর জোর দেন এবং ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর শিক্ষাকে সকল মুসলিমের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে উল্লেখ করেন।

শেখ ইব্রাহিম জারগার তাঁর বক্তব্যে কোরআনের আয়াত ‘ইন্নামাল মু’মিনুনা ইখওয়াতুন’ (মুমিনরা তো ভাই ভাই) তুলে ধরে বলেন, আমরা যদি এই আয়াতকে আত্মস্থ করতে পারি, তাহলে কোনো মতবিরোধ আমাদের দুর্বল করতে পারবে না।

স্থানীয় উলামা ও সাধারণ মানুষের সাড়া

প্রতাপপুরের বিশিষ্ট আলেম রুহুল আমিন বলেন, ইরানি পণ্ডিতদের এই উদ্যোগ অতীব প্রশংসনীয়। তাঁদের মধ্যে আমরা কোনো আধিপত্যবাদিতা দেখিনি, বরং দেখেছি আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা।

এক তরুণ ছাত্র জানান, আমরা বড় হয়েছি শুনে যে শিয়া-সুন্নি পরস্পর শত্রু। কিন্তু আজ সরাসরি তাঁদের কথা শুনে বুঝলাম, মূল সমস্যা হলো অজ্ঞতা-আর সমাধান হলো জ্ঞান ও সংলাপ।

সভার শেষে ঐতিহাসিক ঘোষণা

প্রতিনিধিদল ঘোষণা করে যে, আগামী দিনে প্রতাপপুরে একটি ‘শিয়া-সুন্নি সংহতি কেন্দ্র’ স্থাপন করা হবে, যেখানে উভয় সম্প্রদায়ের পণ্ডিতরা একত্রে গবেষণা করবেন, সেমিনার আয়োজন করবেন এবং ধর্মীয় বিদ্যালয়ে যৌথ শিক্ষাক্রম চালু করবেন। এছাড়া, জিকরা ইনস্টিটিউট এবং পবিত্র উদ্ধারকারী ইনস্টিটিউট প্রতাপপুরের মাদ্রাসাগুলোতে স্কলারশিপ ও ইসলামী নীতিশাস্ত্রের ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে।

বিশ্বমানবতার বার্তা

শেষ পর্যায়ে ডক্টর কানাভাতি সবার উদ্দেশে বলেন, আমরা এখানে এসেছি ইরান থেকে, কিন্তু আমাদের ভাষ্য হলো সমগ্র মানবতার জন্য। শিয়া-সুন্নি ঐক্য শুধু মুসলিমদের স্বার্থে নয়, বরং বিশ্বশান্তির জন্যও অপরিহার্য। প্রতাপপুরের এই সভা হোক সেই পথের সূচনা।

সভা শেষ হয় সকলের যৌথ দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে-এমন এক ঐক্যের সুরে, যা ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সকলকে আবদ্ধ করেছিল।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha