বুধবার ১২ আগস্ট ২০২৬ - ১৬:৫৭
অভিভাবকত্বের ভীতি: শিক্ষাব্যবস্থার ঘাটতিতেই যার শিকড়

তরুণদের মধ্যে অভিভাবকত্ব নিয়ে যে ভীতি তৈরি হচ্ছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ শিক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি। ইরানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যাওয়ার পেছনের সংকটকে শুধু অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। তরুণদের মধ্যে সন্তান গ্রহণ নিয়ে যে অনীহা ও ভীতি তৈরি হচ্ছে, তার পেছনে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং জীবনযাত্রার ধরনে রূপান্তরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মন্তব্য করেছেন আজারবাইজান পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের হাওজায়ে ইলমিয়া পরিষদের শিক্ষার্থী ও স্নাতকবিষয়ক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ হাসান হাশেমি।

তাবরিজে হাওজা নিউজ এজেন্সি’র এক সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ হাসান হাশেমি ইরানে জনসংখ্যা হ্রাসের অন্তর্নিহিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকগুলো বিশ্লেষণ করেন। এ সংকট মোকাবিলায় তিনি সাফল্য ও সামাজিক পুঁজি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার পুনর্মূল্যায়ন, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, গণমাধ্যমের লক্ষ্যভিত্তিক ভূমিকা, এলাকাভিত্তিক পরিবার সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আশা ও আস্থা পুনরুদ্ধারের মতো পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন।

জনসংখ্যা হ্রাসের মূল কারণ কী?
সাংবাদিক: জনসংখ্যা বৃদ্ধির সূচকের ধারাবাহিক অবনতির প্রেক্ষাপটে ইরানে পরিবার সম্প্রসারণে অনাগ্রহের মূল কারণগুলো কী বলে আপনি মনে করেন?

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন হাশেমি: জনসংখ্যাগত এই জটিল সংকটের সমাধান কেবল অর্থ কিংবা আর্থিক প্রণোদনার মধ্যে খুঁজলে চলবে না। এর মৌলিক সমাধান নিহিত রয়েছে সাংস্কৃতিক পরিবেশ পরিবর্তন এবং আমাদের মৌলিক মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবনের মধ্যে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনমনে সন্তান গ্রহণকে ‘উন্নতির পথে বাধা’, ‘জীবনে সীমাবদ্ধতা’ এবং ‘অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা’—এ ধরনের ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এটি একটি গভীর বাস্তবতার অত্যন্ত সরলীকৃত ব্যাখ্যা।

যতদিন সমাজে সন্তানকে একটি ‘আর্থিক বোঝা’ হিসেবে দেখা হবে, ততদিন সন্তান গ্রহণের প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে না। কিন্তু সন্তানকে যদি ‘পরিবার ও পরিচয়ের সম্প্রসারণ’ এবং একটি ‘আধ্যাত্মিক ও সামাজিক সম্পদ’ হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা যায়, তাহলে জনমনে তার অবস্থানও পরিবর্তিত হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের সামাজিক মূল্যায়নব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার জন্য একটি ব্যাপক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

গণমাধ্যমের ভূমিকা
সাংবাদিক: গণমাধ্যম ও আদর্শ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এই নেতিবাচক ধারণা পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে?

হুজ্জাতুল ইসলাম হাশেমি: এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রচারমাধ্যমে একাকিত্বকেন্দ্রিক জীবনযাপন এবং ছোট পরিবারের এমন এক আদর্শিক চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, যার সঙ্গে ইরানের সাংস্কৃতিক বাস্তবতার যথেষ্ট মিল নেই।

এই বিচ্ছিন্নতা দূর করতে বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র ও অন্যান্য গণমাধ্যম-উপকরণ তৈরি করতে হবে, যেখানে বড় পরিবারের প্রাণবন্ত জীবনযাত্রা তুলে ধরা হবে। তবে এই আদর্শ নির্মাণ যেন স্লোগাননির্ভর হয়ে না পড়ে, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।

যেসব নারী উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনে সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি সফলভাবে মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের জীবন ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরা একটি শক্তিশালী অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।

সাফল্যের সংজ্ঞা কি বদলে গেছে?
সাংবাদিক: বর্তমান সমাজে ‘সাফল্য’ বা ‘অগ্রগতি’র ধারণাও বদলে গেছে বলে মনে হয়। সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্তে এই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির কী প্রভাব পড়েছে?

জনাব হাশেমি: ঠিক তাই। এ ক্ষেত্রে একটি নীরব প্রতিবন্ধকতা হলো ‘সাফল্য’ বা ‘কৃতকার্যতা’র অর্থের পরিবর্তন। বর্তমানে সাফল্যের মানদণ্ড মূলত সম্পদ সঞ্চয়, পেশাগত উন্নতি এবং উচ্চশিক্ষাগত অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পরিবার সম্প্রসারণকে শুধু আর কোনো গুণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং অনেক সময় এটিকে ব্যক্তিগত অগ্রগতির পথের প্রতিবন্ধক হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।

অথচ ইসলামী-ইরানি বিশ্বদৃষ্টিতে সন্তানকে রিজিকের প্রশস্ততা ও আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের জন্য জাতীয় পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশ্বের জনসংখ্যা-সংক্রান্ত নীতিতে অগ্রসর দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, ফ্রান্স বা সুইডেনের মতো দেশগুলো শুধু অর্থনৈতিক সহায়তার প্যাকেজের ওপর নির্ভর করেনি; বরং এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে সন্তান গ্রহণকে জাতীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

পরিবারে সন্তান নিয়ে আলোচনা কতটা জরুরি?
সাংবাদিক: পরিবারে এ বিষয়ে আলোচনার অভাব কতটা ক্ষতিকর?
জনাব হাশেমি: এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক দম্পতির মধ্যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং কতজন সন্তান নেওয়া হবে—এসব নিয়ে পারিবারিক আলোচনা প্রায় হারিয়ে গেছে।

তরুণ দম্পতিরা প্রায়ই এ বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে বিষয়টি অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের ওপর ঠেলে দেন। এই দীর্ঘসূত্রতা শেষ পর্যন্ত স্থায়ী অনাগ্রহে পরিণত হতে পারে।

এ ধরনের আলোচনা শুধু অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এর মধ্যে নৈতিকতা, মানসিক বিকাশ এবং অভিভাবকত্বের অস্তিত্বগত ও দার্শনিক তাৎপর্যও অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করতে হবে।

শিক্ষাব্যবস্থা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের করণীয়
সাংবাদিক: ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, আলেমসমাজ এবং শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে ‘অভিভাবকত্বের ভীতি’ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে?
জনাব হাশেমি: হাওজাহসমূহ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে সমাজের মূল্যবোধ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এখন প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের মানসিকতা ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আধুনিক ভাষায় পরিবার ও পারিবারিক জীবনের গুরুত্ব তুলে ধরা।

শুধু প্রচলিত হাদিস ও ধর্মীয় বক্তব্য বারবার উপস্থাপন করে, কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের মানসিক জটিলতা ও প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।

অন্যদিকে, তরুণদের সন্তান গ্রহণ থেকে দূরে সরে যাওয়ার একটি বড় কারণ হলো ‘অভিভাবকত্বজনিত উদ্বেগ’ এবং সন্তান লালন-পালনের দক্ষতার অভাব।

দুঃখজনকভাবে মাধ্যমিক পর্যায় থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, দাম্পত্যজীবন এবং সন্তান প্রতিপালনের দক্ষতা শেখানোর ক্ষেত্রে খুব কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমাদের তরুণরা প্রায় কোনো প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা ছাড়াই বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও হাওজাহসমূহকে দ্রুত এই ঘাটতি পূরণ করতে হবে।

একসন্তান পরিবার ও পারিবারিক সহায়তার সংকট
সাংবাদিক: বর্তমানে একসন্তান পরিবার ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে দাদা-দাদি, নানা-নানিসহ বর্ধিত পরিবারের সহায়তাও কমে গেছে। এর বিকল্প কী হতে পারে?
জনাব হাশেমি: একসন্তান পরিবার একটি নীরব মহামারির মতো হয়ে উঠেছে। অনেক বাবা-মা মনে করেন, একমাত্র সন্তান থাকলে তারা তাকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিতে পারবেন। কিন্তু বিভিন্ন মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের পরিস্থিতি শিশুর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক মেলামেশার দুর্বলতা এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণ হতে পারে।

অন্যদিকে, একাধিক সন্তান এমন একটি স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে শিশুরা সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ ও প্রতিকূলতা মোকাবিলার দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায়।

একই সঙ্গে বর্ধিত পরিবারের কাঠামো দুর্বল হয়ে যাওয়ায় অনেক দম্পতি সন্তান প্রতিপালনের পথে নিজেদের একাকী মনে করেন। এর একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে—নগর কর্তৃপক্ষ ও সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে ‘পরিবার সহায়তা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করা।

এসব এলাকাভিত্তিক কেন্দ্রে অস্থায়ী শিশুযত্নসেবা, স্থানীয় পরামর্শসেবা এবং অন্যান্য সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। এতে বাবা-মায়ের ওপর থাকা মানসিক চাপের একটি অংশ কমানো সম্ভব হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিলম্বিত বিয়ে ও ভবিষ্যৎ
সাংবাদিক: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক প্রভাব এবং বিয়েতে বিলম্বের এই সময়ে সংকট থেকে উত্তরণ ও সামাজিক আশাবাদ পুনরুদ্ধারের কী পথ দেখছেন?

জনাব হাশেমি:  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভোগবাদী, আনন্দকেন্দ্রিক এবং সন্তানহীন ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপনের ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে।

এর মোকাবিলার পথ শুধু ফিল্টারিং বা নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা নয়। বরং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং মানসম্পন্ন গণমাধ্যম-উৎপাদনের সহায়তায় প্রাণবন্ত পরিবারগুলোর আনন্দ, আবেগ ও অর্জনের গল্প মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে।

দেখাতে হবে, অভিভাবকত্ব কীভাবে একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের পরিপক্বতা এবং মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে, উপযুক্ত বয়সে বিয়ে না হওয়া সরাসরি জন্মহারের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই সহজ ও স্বল্পব্যয়ী বিয়েকে উৎসাহিত করা এবং দাম্পত্যজীবনের প্রথম কয়েক বছরে তরুণ দম্পতিদের সহায়তা করা অত্যন্ত জরুরি।

জনসংখ্যাগত সংকটের কেন্দ্রে ‘আশার সংকট’
সবশেষে আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, জনসংখ্যাগত সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে ‘আশার সংকট’। যে দম্পতি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো উজ্জ্বল ও স্থিতিশীল চিত্র দেখতে পান না, তারা এই অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে আরেকটি মানুষকে পৃথিবীতে নিয়ে আসতে স্বাভাবিকভাবেই অনাগ্রহী হবেন।

সুতরাং যেকোনো জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের পূর্বশর্ত হলো জনআস্থা পুনর্গঠন এবং সামাজিক আশাবাদ পুনরুজ্জীবিত করা।

এই ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য সরকার, বুদ্ধিজীবী সমাজ, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সর্বাত্মক সমন্বয় প্রয়োজন। ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও কৃত্রিম নায়ক তৈরির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দায়িত্বশীল বাবা-মাকে সমাজের প্রকৃত নায়ক এবং ভবিষ্যৎ ইরানের নির্মাতা হিসেবে তুলে ধরতে হবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha