হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, বন্দর আব্বাসের জুমার ইমাম হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন মোহাম্মদ আবাদিজাদে এ সপ্তাহের জুমার খুতবায় পাহলভি শাসনকে নির্দোষ বা মহিমান্বিত করার কিছু মহলের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে বলেন, আজ অনেকেই পাহলভি শাসনকে কলঙ্কমুক্ত করতে চান। অথচ ইরানের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা উচিত।
তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে পাহলভির একটি বক্তব্য দেখলাম। সেখানে তিনি বলেছিলেন, কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের অধিকার নিয়ে কোনো দরকষাকষি হতে পারে না এবং জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তের বৈধতা নেই। কিন্তু কেউ কি তাকে জিজ্ঞেস করবে-বাহরাইনকে কীভাবে ইরান থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছিলেন? তখন কি ইরানের জনগণের সম্মতি নিয়েছিলেন?
বন্দর আব্বাসের জুমার ইমাম আরও বলেন, যখন আরারাত পর্বতমালা তুরস্কের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন, তখন কি জনগণের সম্মতি নিয়েছিলেন? আপনাদের নীরব থাকা উচিত। যারা পাহলভি শাসনকে কলঙ্কমুক্ত করার চেষ্টা করছেন, তাদেরও নীরব থাকা উচিত-যাতে আমাদের তরুণরা ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো ভুলে না যায়।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আবাদিজাদে বলেন, আমাদের বুদ্ধিজীবীদের উচিত নয় রেজা খানের ভাবমূর্তি পরিষ্কার করার জন্য বই লেখা। আমি এ বিষয়টির রাজনৈতিক দিক নিয়ে কথা বলছি না; শুধু চাই, সেই সময়ের অপরাধগুলোর দলিল হিসেবে এটি ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হোক। পাহলভি শাসন টিকে থাকলে ইরানের মানচিত্র বিড়াল থেকে ইঁদুরে পরিণত হতো।
তিনি বলেন, ইরানের মানচিত্র ছিল সিংহের মতো; তারা এর এত অংশ বিলিয়ে দিয়েছিল যে তা শেষ পর্যন্ত বিড়ালে পরিণত হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, ইসলামী বিপ্লব এই প্রক্রিয়ার অবসান ঘটায় এবং গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের জনগণ দেশের অস্তিত্ব ও ভূখণ্ড রক্ষায় প্রতিরোধ করে আসছে। এই জাতি ও তার মহত্ত্বকে সাধুবাদ জানাই। শত্রুদের এই দেশের এক বিঘত জমিও দখল করতে দেওয়া উচিত নয়।
শহীদ বিপ্লবী নেতা ইমাম রেজার (আ.) পাশে হাবিব ইবনে মাজাহিরের মতো ছিলেন ইমাম হুসাইনের (আ.) পাশে
বন্দর আব্বাসের জুমার ইমাম ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতার দাফনের চল্লিশতম দিন ঘনিয়ে আসার কথা উল্লেখ করে বলেন, আমরা আমাদের শহীদ ইমামের দাফনের চল্লিশতম দিনের দ্বারপ্রান্তে ছিলাম। মাশহাদুর রেজায় মানুষ ইমাম রেজার (আ.) পাশাপাশি আমাদের শহীদ ইমামের প্রতিও নিজেদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছে।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আবাদিজাদে বলেন, ইমাম রেজার (আ.) জন্য শহীদ বিপ্লবী নেতা যেমন ছিলেন, ইমাম হুসাইনের (আ.) জন্য হাবিব ইবনে মাজাহিরও তেমন ছিলেন। শাহাদাত আল্লাহর বান্দাদের জন্য এক মহৎ গৌরব। আমাদের শহীদ ইমাম বারবার দোয়া করতেন এবং শহীদদের পরিবারের সদস্যদের বলতেন, ‘দোয়া করুন, আমিও যেন আপনাদের সন্তানদের পথের সঙ্গী হতে পারি।’ তাঁর সেই দোয়া কবুল হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই মহান ব্যক্তির শাহাদাতের চল্লিশতম দিনে যখন আমরা পবিত্র ইমামদের (আ.) ইতিহাস ও তাঁদের মর্যাদা স্মরণ করি, তখন তাঁদের সেই গুণাবলির কিছু ঝলক আমাদের শহীদ ইমামের জীবনেও দেখতে পাই।
তিনি সমগ্র বিশ্বের ক্ষমতা নিজের হাতে থাকা সত্ত্বেও অত্যন্ত সাদাসিধে ও জাহিদসুলভ জীবনযাপন করতেন। বর্তমান নেতাও সেই শহীদ ইমামের মতোই সাদাসিধে জীবনযাপন করেন-এটি ইরানি জাতির জন্য গৌরবের বিষয়।
শহীদদের রক্তের পূর্ণ প্রতিশোধ বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের অঙ্গীকার থেকে পিছপা হব না
বন্দর আব্বাসের জুমার ইমাম বলেন, ইরানের জনগণ বিপ্লব ও শহীদদের পথ রক্ষার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে। আমাদের প্রিয় নেতার অনুসরণ করে আমরা বলছি-হে আমাদের শহীদ ইমাম, আমরা আপনার সঙ্গে অঙ্গীকার করছি যে বিপ্লব ও আপনার পথের প্রতিরক্ষা এবং শহীদদের ও আপনার রক্তের প্রতিশোধের জন্য আমরা বিন্দুমাত্র পিছপা হব না।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আবাদিজাদে বলেন, এই প্রতিশোধের বিষয়টি ভুলে যাওয়া উচিত নয় এবং ভুল আচরণের মাধ্যমে এটিকে প্রশ্নবিদ্ধও করা উচিত নয়। এই প্রতিশোধ সেই পথেরই অংশ, যে পথে শিয়া মুসলমানরা ইমাম হুসাইনের (আ.) শাহাদাতের ১৪০০ বছর পরও প্রতিশোধের আহ্বান জানিয়ে আসছে এবং আল্লাহর প্রতিশোধগ্রহণকারী-অর্থাৎ ইমাম মাহদি (আ.)-এর অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি বলেন, শিয়া ১৪০০ বছর ধরে এই প্রতিশোধের অপেক্ষায় রয়েছে এবং নিঃসন্দেহে আল্লাহর এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে। এই মহান অঙ্গীকার আশুরা থেকে শুরু হয়েছে এবং আজ তা শহীদ বিপ্লবী নেতার রক্তের প্রতিশোধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
শত্রুর মোকাবিলার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি
বন্দর আব্বাসের জুমার ইমাম বলেন, শত্রুকে তার অবস্থানে থামিয়ে দিতে হলে আমাদের দুটি ক্ষেত্রে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে হবে। প্রথমত, জিহাদ ও শত্রুর মোকাবিলার ক্ষেত্রে-যা আমাদের যোদ্ধারা করছেন। দ্বিতীয়ত, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আবাদিজাদে বলেন, আমাদের যোদ্ধারা জনগণের মাথার ওপর থেকে যুদ্ধের ছায়া দূর করছেন, আর প্রতিশোধ এই জাতির ওপর নিরাপত্তার ছায়াকে সুদৃঢ় করবে, যাতে শত্রু আর হত্যাকাণ্ড বা সন্ত্রাসী হামলা চালানোর সাহস না পায়।
তিনি বলেন, আজ প্রতিশোধই শত্রুকে তার অবস্থানে ফিরিয়ে দিতে পারে-তুমি হত্যা করেছ, তার মূল্য তোমাকে দিতে হবে। এই ইসলামী সংস্কৃতিকে শুধু ব্যক্তিগত ফিকহ ও কিসাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়। বরং শহীদ ইমাম ও অন্যান্য শহীদদের শাহাদাতকে সামাজিক ফিকহ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করা উচিত।
বন্দর আব্বাসের জুমার ইমাম আরও বলেন, শহীদ ইমামের রক্তের প্রতিশোধের দাবি জনগণের অধিকার রয়েছে এবং ফিকহুল হুকুমাহ বা শাসনব্যবস্থার ফিকহেও এ বিষয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। রাজনৈতিক শাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলিমদের নেতা নিজেই এর দাবিদার-শুধু শহীদ ইমামের সন্তান হিসেবে নয়; বরং ইসলামী রাষ্ট্রের ওয়ালিয়ে আমর ও শাসক হিসেবেও তিনি শহীদ ইমামের রক্তের প্রতিশোধের দাবিদার।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আবাদিজাদে বলেন, এই প্রতিশোধের বিষয়টি তা পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
৩৩ দিনের যুদ্ধ অঞ্চলের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিয়েছিল
খুতবার আরেক অংশে তিনি লেবাননের হিজবুল্লাহর ৩৩ দিনের যুদ্ধের বার্ষিকীর প্রসঙ্গ তুলে বলেন, আজ লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন বৈশ্বিক ইহুদিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ৩৩ দিনের যুদ্ধের বার্ষিকীতে লেবাননের প্রতিরোধের ইতিহাসের সেই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি স্মরণ করা উচিত।
বন্দর আব্বাসের জুমার ইমাম বলেন, ৩৩ দিনের যুদ্ধের পর সমীকরণ বদলে যায়। লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন ইহুদিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে ৩৩ দিনের যুদ্ধের আগের ও পরের দুই পর্যায়ে ভাগ করেছে। কারণ ওই যুদ্ধে ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠী পরাজিত হয় এবং অঞ্চলের ক্ষমতার চিত্র পরিবর্তিত হয়।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আবাদিজাদে বলেন, এই বিজয় শুধু হিজবুল্লাহই কাজে লাগায়নি; সমগ্র প্রতিরোধ ফ্রন্ট এর সুফল পেয়েছে। আজ এই বিজয়ের ধারায় ইরানি জনগণ প্রতিরোধ ফ্রন্টকে নিজেদের পাশে দেখতে পাচ্ছে-ফিলিস্তিন, ইরাক, ইয়েমেনের প্রতিরোধ এবং আরও কিছু ফ্রন্ট, যারা নীরবে প্রতিরোধের প্রতি সমর্থন ধারণ করে আছে; এর মধ্যে আজারবাইজান, পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশও রয়েছে।
তিনি লেবাননের প্রতিরোধকে সমর্থনের ক্ষেত্রে শহীদ বিপ্লবী নেতার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, ৩৩ দিনের যুদ্ধ যখন কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন শহীদ ইমাম বলেছিলেন: ‘নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনারা এই যুদ্ধে বিজয়ী হবেন এবং যোদ্ধারা এই যুদ্ধে বিজয়ী হবে।’
বন্দর আব্বাসের জুমার ইমাম শেষে জোর দিয়ে বলেন, ৩৩ দিনের যুদ্ধে প্রতিরোধের বিজয় প্রতিরোধের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল এবং দেখিয়ে দিয়েছিল যে ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো আঞ্চলিক ক্ষমতার সমীকরণ পরিবর্তন করতে পারে।
আপনার কমেন্ট