রবিবার ১৬ আগস্ট ২০২৬ - ১৮:১৩
শালীনতা ও হিজাব কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় নয়; এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সমগ্র সমাজের দায়িত্ব

হাওজায়ে ইলমিয়ার অধ্যাপিকা নাদা হেকমতনিয়া বলেছেন, হিজাব ও শালীনতা (আফাফ) কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার একক দায়িত্ব নয়; বরং এটি মানবিক মর্যাদা ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সামাজিক অঙ্গীকার। সমাজের প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে এর বিকাশ ও সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: এক সাক্ষাৎকারে নাদা হেকমতনিয়া নতুন প্রজন্মের মধ্যে হিজাব ও শালীনতার সংস্কৃতি জোরদারের উপায় সম্পর্কে বলেন, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্মানজনক ও আন্তরিক সংলাপ। এমন এক মা, যিনি সন্তানকে তিরস্কারের আগে তার কথা শোনেন; এমন এক শিক্ষক, যিনি নিজেই শালীনতা ও সংযমের আদর্শ; এমন এক পিতা, যিনি সন্তানকে দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্মানের শিক্ষা দেন—এসবই ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে তোলে।

তিনি বলেন, আইন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তারা পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের বিকল্প হতে পারে না। অনেক সময় হিজাব ও শালীনতার মতো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোকে কেবল প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে সমাধান করতে গেলে মানুষের মনে দ্বিধা ও নানা প্রশ্নের জন্ম নেয়।

অধ্যাপিকা নাদা হেকমতনিয়া আরও বলেন, বর্তমান সমাজে হিজাব ও শালীনতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এ অবস্থায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য এবং তাদের প্রতিনিধিদের আচরণের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা দিলে তা জনআস্থা ও সামাজিক পুঁজি ক্ষয় করতে পারে। কারণ জনগণ বিশেষত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নেতাদের শুধু নির্দেশদাতা হিসেবে নয়, বরং আদর্শ ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করে।

তার মতে, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের প্রতিটি আচরণ—এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তাদের নীরবতাও—এক ধরনের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বার্তা বহন করে। ফলে ব্যক্তিগত আচরণও জনপরিসরে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়।

তিনি বলেন, মানুষ ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ধরনের পোশাক বা সামাজিক উপস্থিতি বেছে নিতে পারে। তবে যখন কোনো ব্যক্তি সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় বা শিক্ষামূলক নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকেন, তখন তার বাহ্যিক আচরণ আর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয় না। যদি কোনো ধর্মীয় প্রতীক বা পোশাক এক স্থানে গুরুত্ব পায়, কিন্তু অন্য স্থানে তা উপেক্ষিত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় সৃষ্টি হতে পারে যে বিষয়টি গভীর বিশ্বাসের পরিবর্তে পরিস্থিতিনির্ভর।

তিনি স্পষ্ট করেন, এর অর্থ ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ নয়। তবে যদি কোনো প্রতীক বা পোশাক একজন ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে থাকে, তাহলে তার মধ্যে ধারাবাহিকতা ও সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় তা ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করতে পারে।

তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্ম উপদেশের চেয়ে বাস্তব জীবনের উদাহরণকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা মানুষ কী বলছে এবং বাস্তবে কী করছে—এই দুইয়ের মধ্যে মিল খোঁজে। যখন তারা কথার সঙ্গে কাজের অমিল দেখতে পায়, তখন মূল্যবোধের প্রতি তাদের আস্থা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

তার ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে মানুষ আর কোনো বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না; বরং প্রশ্ন করে, “যিনি এ কথা বলছেন, তিনি নিজে কি তা মেনে চলেন?” এ ধরনের প্রশ্নই একজন ব্যক্তির আদর্শিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।

তিনি আরও বলেন, আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল স্লোগান বা প্রচারণার মাধ্যমে অর্জিত হয় না; বরং তা গড়ে ওঠে কথা, কাজ ও উপস্থাপনার মধ্যে সামঞ্জস্যের মাধ্যমে। বাহ্যিক রূপই ধর্মের সবকিছু নয়, কিন্তু জনপরিসরে সেটিই মানুষের কাছে প্রথম বার্তা পৌঁছে দেয়।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তিনি মানুষের কাছে শুধু বক্তব্য উপস্থাপন করেননি; বরং নিজের জীবনাচরণের মাধ্যমে তার শিক্ষা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। তিনি যা প্রচার করতেন, তা পালনেও সবার আগে এগিয়ে থাকতেন।

হিজাব ও শালীনতা-সংক্রান্ত সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সমস্যার জন্য শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা আধুনিক ফ্যাশনকে দায়ী করা সহজ সমাধান মনে হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত সমাধান নিহিত রয়েছে আত্মসংশোধন ও আত্মসমালোচনার মধ্যে।

তিনি বলেন, আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা এবং ব্যক্তিগত আচরণের মাধ্যমে মূল্যবোধকে জীবন্ত করে তোলা। আমরা যদি নতুন প্রজন্মের কাছে হিজাব ও শালীনতার গুরুত্ব তুলে ধরতে চাই, তাহলে প্রথমে নিজেদের জীবনেই তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। সমাজে শালীনতা প্রতিষ্ঠার সূচনা হতে হবে পরিবার, ব্যক্তিজীবন এবং দৈনন্দিন আচরণ থেকে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha