মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট ২০২৬ - ০৯:৫৫
হিজাবের ধারাবাহিকতা রক্ষায় প্রয়োজন বিশ্বাস ও সচেতন নির্বাচন

ইসলামি সংস্কৃতিতে হিজাব শুধু বাহ্যিক পোশাক নয়; বরং এটি এমন একটি নৈতিক মূল্যবোধের অংশ, যার সঙ্গে লজ্জাশীলতা, পবিত্রতা, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সম্পর্কের সুস্থতা ও পরিবারের দৃঢ়তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই হিজাবের প্রতি অবহেলাকে কেবল বাহ্যিক চেহারার পরিবর্তন হিসেবে দেখা যায় না।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইসলামি ঐক্য পার্টির কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্য ও নারী বিভাগের পরিচালক এফতেখারুসসাদাত সাজ্জাদি বলেন, হিজাব তখনই স্থায়ী হবে, যখন তা ‘নির্দেশ’ থেকে ‘বিশ্বাসে’ এবং ‘বাহ্যিক বাধ্যবাধকতা’ থেকে সচেতন ও মর্যাদাপূর্ণ নির্বাচনে পরিণত হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে হিজাবের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা কি কেবল ব্যক্তিগত রুচি ও পছন্দের পরিবর্তন, নাকি এর পেছনে বৃহত্তর কোনো সাংস্কৃতিক লড়াই রয়েছে—এ প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে এমন কিছু সাংস্কৃতিক প্রবাহ কাজ করছে, যা সমাজের লজ্জাশীলতা, পবিত্রতা ও পরিচয়ের সীমারেখা পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, যখন লজ্জাশীলতাকে একটি নৈতিক গুণের পরিবর্তে পুরোনো বা প্রতিবন্ধক বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন সমাজের নৈতিক সীমারেখা রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, বিপ্লবের শহীদ নেতা বিগত বছরগুলোতে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সাংস্কৃতিক হামলা সম্পর্কে বারবার সতর্ক করেছেন। এ ধরনের প্রক্রিয়ায় মানুষের আচরণ পরিবর্তনের আগে তাদের মূল্যবোধ ও মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়।

জনাবা সাজ্জাদি বলেন, এই পরিবর্তন সবসময় প্রকাশ্য স্লোগানের মাধ্যমে ঘটে না। কখনো গণমাধ্যম, বিনোদন, বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নির্দিষ্ট জীবনধারার ধারাবাহিক প্রচারের মাধ্যমেও মানুষের রুচি ও সামাজিক মানদণ্ডে পরিবর্তন আনা হয়। অবশ্য প্রতিটি হিজাববিহীন নারীকে কোনো বাহ্যিক প্রবাহ বা পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা যায় না; একই সঙ্গে মানুষের রুচি ও সামাজিক মানদণ্ড পরিবর্তনে সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমভিত্তিক প্রবাহগুলোর ভূমিকাও উপেক্ষা করা উচিত নয়।

লজ্জাশীলতা দুর্বল হওয়ার প্রভাব
লজ্জাশীলতা দুর্বল হওয়ার ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত পর্যায়ে এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষের মূল্যকে অতিরিক্তভাবে বাহ্যিক চেহারা ও অন্যের দৃষ্টিতে কতটা আকর্ষণীয়—এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়, সেখানে ক্রমাগত তুলনা, উদ্বেগ, আত্ম-অসন্তুষ্টি, পরিচয় সংকট এবং কিছু ক্ষেত্রে বিষণ্নতার মতো মানসিক সমস্যার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

সামাজিক পর্যায়েও নৈতিক সীমারেখা দুর্বল হয়ে গেলে নারী-পুরুষের সম্পর্ক আরও পৃষ্ঠতলনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক বিভিন্ন কারণ পারিবারিক আস্থা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধকে দুর্বল করে দিতে পারে।

তিনি বলেন, ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা ও দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি পরিবার যদি ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সেখানে আবেগগত দূরত্ব, দ্বন্দ্ব এবং শেষ পর্যন্ত পারিবারিক ভাঙন দেখা দিতে পারে।

শুধু আইন প্রয়োগে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না
হিজাব ও পবিত্রতার বিষয়টিকে বহুমাত্রিক দৃষ্টিতে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সাজ্জাদি বলেন, শুধু প্রশাসনিক বা আইনশৃঙ্খলাজনিত পদক্ষেপের মাধ্যমে সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায় না। হিজাবের প্রয়োজনীয়তা ও দর্শন তরুণ প্রজন্মের কাছে স্পষ্ট হতে হবে; তবেই তা স্থায়ী রূপ পাবে।

তিনি বলেন, পরিবার, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ ও গণমাধ্যমকে হিজাবের সঙ্গে মানবিক মর্যাদা, পরিচয় ও পরিবারের সুস্থতার সম্পর্ক নিয়ে গভীর ও যুক্তিনির্ভর সংলাপ তৈরি করতে হবে। এমন সংলাপ প্রয়োজন, যেখানে প্রশ্নপ্রবণ তরুণরা তথ্যভিত্তিক ও গ্রহণযোগ্য উত্তর পাবে।

ইতিবাচক ও বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপনা প্রয়োজন
সাংস্কৃতিক ক্ষতি মোকাবিলায় গণমাধ্যমের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসংখ্য আকর্ষণীয় বার্তার বিপরীতে শুধু ‘এটি করা যাবে না’—এমন বক্তব্য যথেষ্ট নয়।

সমাজের প্রয়োজন মর্যাদাপূর্ণ নারী, সুস্থ পরিবার এবং সফল ও ঈমানদার তরুণের শৈল্পিক, আকর্ষণীয় ও বিশ্বাসযোগ্য ইতিবাচক উপস্থাপনা। এমন একটি আদর্শ তুলে ধরতে হবে, যেখানে পবিত্রতা, প্রাণবন্ততা, অগ্রগতি ও সামাজিক অংশগ্রহণ পরস্পরের বিরোধী নয়।

তরুণদের মধ্যে গণমাধ্যম-সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে সাজ্জাদি বলেন, তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞাপন, আদর্শ নির্মাণ এবং মানুষের মনোযোগকে কেন্দ্র করে পরিচালিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে জানতে হবে। ‘আদর্শ জীবন’ হিসেবে উপস্থাপিত প্রতিটি ছবিকে তারা যেন অনিবার্য সত্য হিসেবে গ্রহণ না করে।

আইন প্রয়োগ হতে হবে সম্মানজনক
আইনের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনকে সম্মান করতে হবে এবং তা বাস্তবায়নও করতে হবে। জনসমাগমস্থলে পোশাকসংক্রান্ত আইন ও বিধি মেনে চলা নাগরিকদের সামাজিক দায়িত্বের অংশ। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগ হতে হবে স্পষ্ট, সবার জন্য সমান, সম্মানজনক এবং ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও অপমানজনক আচরণ থেকে মুক্ত।

তিনি বলেন, সংস্কৃতি ও আইন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। আইন সাধারণ সামাজিক মানদণ্ডকে সুরক্ষা দেয়, আর সংস্কৃতি সেই মানদণ্ডকে অর্থ ও ভিত্তি প্রদান করে।

তিনি আরও বলেন, নতুন প্রজন্মের প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করে যেমন লজ্জাশীলতা ও পবিত্রতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া সম্ভব নয়, তেমনি নৈতিক সীমারেখাগুলোও পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া যায় না। সঠিক পথ হলো আইন, যুক্তিনির্ভর বোঝাপড়া, শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং পরিবারকে শক্তিশালী করার সমন্বিত প্রয়াস।

তিনি বলেন, “হিজাব তখনই স্থায়ী হবে, যখন তা ‘নির্দেশ’ থেকে ‘বিশ্বাসে’ এবং ‘বাহ্যিক বাধ্যবাধকতা’ থেকে সচেতন ও মর্যাদাপূর্ণ নির্বাচনে পরিণত হবে।”

সাংস্কৃতিক শিকড় রক্ষার আহ্বান
তিনি শেষদিকে প্রশ্ন তোলেন, যদি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মানুষের পোশাক পরিবর্তনের আগেই তার নিজের সম্পর্কে, পরিবার সম্পর্কে এবং মূল্যবোধ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে দেয়, তাহলে আমাদের দায়িত্ব কি কেবল বাহ্যিক পরিবর্তনের মোকাবিলা করা? নাকি মানুষের পরিচয় ও লজ্জাশীলতা রক্ষার জন্য সমাজের সাংস্কৃতিক শিকড়গুলোও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন?

তিনি বলেন, লজ্জাশীলতা ও পবিত্রতার বিষয়টিকে কেবল বাহ্যিক পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বিস্তৃত পরিসরে দেখতে হবে। এর সুরক্ষায় একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক, শিক্ষামূলক, গণমাধ্যমভিত্তিক, পারিবারিক ও আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha