মঙ্গলবার ১৮ আগস্ট ২০২৬ - ১১:২৫
সমকামিতার পাপের বিপদ: ফিতরাত ভুলে যাওয়া থেকে নিয়ামতের পরিবর্তন

আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরাতের পথ থেকে বিচ্যুতি মানুষের ওপর আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতগুলোকে তার কাঙ্ক্ষিত রূপ থেকে সরিয়ে দিতে পারে; “রহমতের বৃষ্টি”কে “শাস্তির পাথরে” পরিণত করতে পারে-এমন একটি চিত্র মানুষকে পাপের পরিণতি নিয়ে চিন্তা করতে, আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরাতে ফিরে আসতে এবং আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা করতে আহ্বান জানায়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, মানুষ সৃষ্টির শুরুতে যেন একটি শূন্য পাত্রের মতো, তবে জীবনের চলার পথে সে বিভিন্ন রীতি-নীতি, চিন্তাধারা ও মূল্যবোধ-সত্য ও অসত্য উভয় ধরনের-দ্বারা প্রভাবিত হয়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাও তার দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে। তা সত্ত্বেও আল্লাহ মানুষের অন্তরে এমন এক আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরাত এবং সত্যকে চেনা ও সত্যের পথে চলার অন্তর্নিহিত প্রবণতা স্থাপন করেছেন, যাতে সে পরিবেশের বিভিন্ন প্রভাবের মধ্যেও সত্যের পথ চিনতে পারে এবং সেই পথে অগ্রসর হতে পারে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এ সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন:

«فَأَقِمْ وَجْهَکَ لِلدِّینِ حَنِیفًا فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِی فَطَرَ النَّاسَ عَلَیْهَا لَا تَبْدِیلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَٰلِکَ الدِّینُ الْقَیِّمُ وَلَٰکِنَّ أَکْثَرَ النَّاسِ لَا یَعْلَمُونَ.» (روم/ ۳۰)

অতএব, তুমি নিজেকে একনিষ্ঠভাবে তোমার প্রতিপালকের বিশুদ্ধ দ্বীনের দিকে নিবদ্ধ করো। এটাই সেই ফিতরাত, যার ওপর আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।

কখনো উদাসীনতা ও অজ্ঞতা মানুষের অস্তিত্বকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে যে সে নিজের আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরাতের সত্যকে ভুলে যায় এবং নিজের ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ফিতরাত ও আল্লাহর হেদায়াতের পথ থেকে দূরে সরে যায়। ফলে সত্যের সন্ধানে তার অন্তরের আহ্বানকে পথপ্রদর্শক না বানিয়ে সে প্রবৃত্তির আকাঙ্ক্ষা ও পরিবেশগত প্রভাবের অধীনে নিজের আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরাত ও পথের বিপরীত কোনো পথ বেছে নেয়।

এই আলোচনার গুরুত্বের একটি কারণ হলো-আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরাতকে ভুলে যাওয়া কিংবা তার পথ পরিবর্তন করা আল্লাহর নিয়ামতের পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।

এ বিষয়ে কোরআনের একটি উদাহরণের দিকে লক্ষ্য করা যাক।

লূত (আ.)-এর জাতির ঘটনা

কওমে লূত এমন একটি জাতি ছিল, যারা ‘লূত’ (আ.)-এর নবুয়তের সময় বিভিন্ন কবিরা গুনাহ, যার মধ্যে লূতীয় কর্মও অন্তর্ভুক্ত ছিল, সংঘটিত করার কারণে শাস্তির সম্মুখীন হয়েছিল। ঐতিহাসিক সূত্রগুলো অনুযায়ী, তারা এসব কবিরা গুনাহ পরিত্যাগ না করায় শেষ পর্যন্ত আল্লাহর আজাবে আক্রান্ত হয়।

পবিত্র কোরআন কওমে লূতের শাস্তিকে তাদের জনপদকে উল্টে দেওয়া এবং আকাশ থেকে পাথর বর্ষণের মাধ্যমে বর্ণনা করেছে:

«وَأَمْطَرْنَا عَلَیْهِمْ مَطَرًا فَانْظُرْ کَیْفَ کَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِینَ.» (اعراف/ ۸۴)

আর আমরা তাদের ওপর এমন এক বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলামপাথরের বৃষ্টিযা তাদের চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ধ্বংস করে দিয়েছিল। অতএব, দেখো অপরাধীদের পরিণতি কী হয়েছিল।

আরও বলা হয়েছে:

«فَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا جَعَلْنَا عَالِیَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَیْهَا حِجَارَةً مِنْ سِجِّیلٍ مَنْضُودٍ.» (هود/ ۸۲)

আর যখন আমাদের আদেশ এসে পৌঁছল, তখন আমরা সেই জনপদকে উল্টে-পাল্টে দিলাম এবং তাদের ওপর একের পর এক স্তূপীকৃত পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করলাম-যেগুলো ছিল জমাটবদ্ধ মাটির পাথর।

অতএব, ইসলামের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার দৃষ্টিতে, মানুষের আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরাতের পথ থেকে দূরে সরে যাওয়ার এবং আল্লাহর নিয়ামতের পরিবর্তনের কারণ হতে পারে-এমন পাপগুলোর মধ্যে লেখক “সমকামিতা” কে উল্লেখ করেছেন।

পাপ ও আল্লাহর নির্দেশের অবাধ্যতা নিয়ামতকে তার কাঙ্ক্ষিত রূপ থেকে পরিবর্তিত করে এবং রহমতের বৃষ্টিকে শাস্তির পাথরে পরিণত করে-এমন একটি চিত্র, যা মানুষকে পাপের আধ্যাত্মিক পরিণতি নিয়ে চিন্তা করতে, আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরাতে ফিরে আসতে এবং আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা করতে আহ্বান জানায়।

এ কারণেই আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.)-এর দোয়ায়ে কুমাইলের এই বাণীর গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

«اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِیَ الذُّنُوبَ الَّتِی تُغَیِّرُ النِّعَمَ

হে আল্লাহ! যেসব পাপ নিয়ামতকে পরিবর্তন করে দেয়, সেসব পাপ আমাকে ক্ষমা করে দিন।

কারণ একজন মুমিনের উচিত বিপদ দূর করার জন্য-অর্থাৎ পাপের প্রভাব ও পরিণতি থেকে মুক্তির জন্য-এবং বিপদ প্রতিহত করার জন্য-অর্থাৎ পাপে পতিত হওয়া ও নিয়ামত পরিবর্তনের বিষয়টি প্রতিরোধ করার জন্য-আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা করা এবং আত্মসংশোধনের পথে অগ্রসর হওয়া।

একটি প্রশ্নের উত্তর

প্রশ্ন: ধর্মীয় শিক্ষায় যদি সমকামিতাকে আল্লাহর শাস্তি ও নিয়ামত পরিবর্তনের কারণ বলা হয়, তাহলে বর্তমান সমাজে, বিশেষত পশ্চিমা সমাজগুলোতে, সমকামীরা কেন আল্লাহর শাস্তির সম্মুখীন হচ্ছে না? বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা আল্লাহর নিয়ামতও ভোগ করছে-এর ব্যাখ্যা কী?

এই প্রশ্নের উত্তরের শুরুতেই যে বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত তা হলো, প্রতিশ্রুত শাস্তির ধারণাটি শুধু ইসলামের শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

বাইবেলের রোমীয়দের পত্রে বলা হয়েছে:

এই কারণে ঈশ্বর তাদের লজ্জাজনক কামনার হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। এমনকি তাদের নারীরাও স্বাভাবিক যৌনসম্পর্কের পরিবর্তে অস্বাভাবিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে। একইভাবে পুরুষেরাও নারীদের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক ত্যাগ করে পরস্পরের প্রতি কামনায় জ্বলেছে। পুরুষ পুরুষের সঙ্গে লজ্জাজনক কাজ করেছে এবং তাদের বিপথগামিতার উপযুক্ত শাস্তি তারা নিজেদের মধ্যেই পেয়েছে।
-রোমীয় ১:২৬–২৭

অর্থাৎ বাইবেলও সমকামিতার বিচ্যুতির উপযুক্ত শাস্তির কথা উল্লেখ করেছে। সেই শাস্তি কী ধরনের?

লেবীয় পুস্তকে এর শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে:

...আর কোনো পুরুষের সঙ্গে নারীর মতো শয়ন করবে না; এটি জঘন্য কাজ... তোমরা এসব কোনো কাজের দ্বারা নিজেদের অপবিত্র করো না... দেশও অপবিত্র হয়েছে; তাই আমি তার অপরাধের শাস্তি দেব এবং দেশ তার অধিবাসীদের উগরে দেবে... অতএব তোমরা আমার বিধি ও বিচারসমূহ পালন করবে...
-লেবীয় ১৮:২২, ২৪–২৬

লেখাটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পৃথিবীর ক্রোধ ও প্রতিশোধ বলতে সেই শাস্তিকেই বোঝানো হয়েছে, যা আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরাত ও মানব-প্রকৃতির প্রতি অবহেলার ফল; কোরআনেও যার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে:

«فَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا جَعَلْنَا عَالِیَهَا سَافِلَهَا... .» (هود/ ۸۲)

আর যখন আমাদের আদেশ এসে পৌঁছল, তখন আমরা সেই জনপদকে উল্টে-পাল্টে দিলাম...

অতএব, লেখকের মতে, প্রতিশ্রুত শাস্তির ধারণাটি শুধু ইসলামের শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

শাস্তি বিলম্বিত হওয়া কি কাজটির অনুমোদনের প্রমাণ?

এই প্রশ্নের উত্তরে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: আল্লাহর শাস্তি বিলম্বিত হওয়া, কিংবা কোনো ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামত ভোগ করতে থাকা এবং দৃশ্যত তার নিয়ামত পরিবর্তিত না হওয়া-কোনোটিই সেই কাজের অনুমোদনের প্রমাণ নয়।

মহান আল্লাহ কোরআনে এমন লোকদের সম্পর্কে বলেন, যারা আল্লাহর নির্দেশ ভুলে গেছে, অথচ বাহ্যিকভাবে নিয়ামত ভোগ করছে:

«فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُکِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَیْهِمْ أَبْوَابَ کُلِّ شَیْءٍ حَتَّیٰ إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُبْلِسُونَ.» (انعام/ ۴۴)

হ্যাঁ, যখন (তাদেরকে দেওয়া) উপদেশ কোনো কাজে এল না এবং তারা যে বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা ভুলে গেল, তখন আমরা তাদের জন্য সব ধরনের নিয়ামতের দরজা খুলে দিলাম; এমনকি তারা সম্পূর্ণ আনন্দিত হয়ে তাতে মগ্ন হয়ে গেল। অতঃপর হঠাৎ আমরা তাদের পাকড়াও করলাম এবং কঠোর শাস্তি দিলাম। তখন তারা সবাই হতাশ হয়ে পড়ল এবং তাদের জন্য আশার সব দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

এই কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি আরোপিত একটি বাণীতে বলা হয়েছে:

«إِذَا رَأَیْتَ اَللَّهَ یُعْطِی عَلَی اَلْمَعَاصِی فَإِنَّ ذَلِکَ اِسْتِدْرَاجٌ مِنْهُ

যদি তুমি দেখো যে আল্লাহ পাপাচারীদের দুনিয়াবি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছেন, তবে জেনে রেখো-এটি তাঁর পক্ষ থেকে ইস্তিদরাজ (ধীরে ধীরে পতনের দিকে নিয়ে যাওয়া)।
-তাফসির নূরুস সাকালাইন, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৭১৮

অতএব, ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে ইস্তিদরাজ আল্লাহর একটি বিধান বা রীতি। অর্থাৎ কেউ যদি নিজেকে আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরাতের পথ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়, অথচ একই সঙ্গে আল্লাহর নিয়ামত ভোগ করতে থাকে, তাহলে তার জানা উচিত যে সে ধ্বংসের পথে অগ্রসর হতে পারে। সাময়িক স্বাচ্ছন্দ্য ও শাস্তির অনুপস্থিতি কখনোই পাপী ব্যক্তির প্রতি আল্লাহর রহমতের নিশ্চিত প্রমাণ নয়।

এই বিষয়টির গুরুত্ব এত বেশি যে আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.) আমাদের এভাবে সতর্ক করেছেন:

«یَا ابْنَ آدَمَ، إِذَا رَأَیْتَ رَبَّکَ سُبْحَانَهُ یُتَابِعُ عَلَیْکَ نِعَمَهُ وَ أَنْتَ تَعْصِیهِ، فَاحْذَرْهُ

হে আদমসন্তান! যখন তুমি দেখবে যে তোমার প্রতিপালক তোমার ওপর একের পর এক নিয়ামত বর্ষণ করছেন, অথচ তুমি তাঁর অবাধ্যতা করছ, তখন তাঁকে ভয় করো-পাছে তাঁর কঠিন শাস্তি তোমার জন্য অপেক্ষা করে।
-নাহজুল বালাগা, হিকমত ২৫

সমকামিতার পাপের বিপদ এবং সেই বিপদের প্রতি ইঙ্গিতকারী দলিল সম্পর্কে আরও অনেক আলোচনা রয়েছে। তবে সংক্ষিপ্ততার জন্য লেখক এখানে এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ করেছেন।

মুস্তাফা আমিনি

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha