বৃহস্পতিবার ২০ আগস্ট ২০২৬ - ১১:৪৭
বাহরাইনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সতর্কবার্তা

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে বাহরাইনের মানবাধিকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির অব্যাহত অবনতির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইইউর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাহরাইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠন গঠন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক পরিবেশের অভাব এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নীতির অসামঞ্জস্যও তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে মতপ্রকাশ, সমাবেশ ও সংগঠন গঠনের স্বাধীনতার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ, আটক ব্যক্তিদের প্রতি দুর্ব্যবহার, নির্যাতনের অভিযোগ এবং কারাগারগুলোর নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১১ সালের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনে অংশগ্রহণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ১৩ জন বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এখনও দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তাদের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুইজন নাগরিকও রয়েছেন। এছাড়া মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাহরাইন একটি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে রাজনৈতিক দল গঠন এখনও নিষিদ্ধ। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ। বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতিতে দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব এবং জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার ঘাটতিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

এতে বাহরাইনের জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ নিষ্পত্তি বিভাগ, বন্দি ও আটক ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক কমিটি, বিশেষ তদন্ত ইউনিট এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার অভাব মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত, বন্দিদের জীবনমান উন্নয়ন এবং কারাগার ও আটককেন্দ্র তদারকির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

প্রতিবেদনে বাহরাইনের নতুন ‘প্রেস ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া আইন’-এর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আইনটি প্রকাশনা-সংক্রান্ত অপরাধে কারাদণ্ডের পরিবর্তে আর্থিক জরিমানার বিধান চালু করলেও, জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা বা জননৈতিকতার অজুহাতে গণমাধ্যম স্থগিত বা বিষয়বস্তু সীমিত করার প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। ইইউর আশঙ্কা, এই বিধান অনলাইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করতে এবং গণমাধ্যমের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করতে ব্যবহৃত হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (RSF)-এর ২০২৫ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে বাহরাইনের অবস্থান ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫৭তম। ২০২৪ সালে দেশটির অবস্থান ছিল ১৭৩তম।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, ২০২৫ সালজুড়ে তারা এবং তাদের সদস্য রাষ্ট্রগুলো বাহরাইনের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। এটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত অষ্টম ইইউ-বাহরাইন মানবাধিকার সংলাপের ধারাবাহিকতার অংশ। পর্যবেক্ষণের প্রধান ক্ষেত্র ছিল মানবাধিকার চর্চা, বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন। ইইউ বাহরাইন সরকারকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার আহ্বান জানিয়ে স্বাধীন মতপ্রকাশ সীমিত করে এমন আইন পরিহার এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে।

প্রতিবেদনে বাহরাইনে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, মৃত্যুদণ্ড বিলোপ, মতপ্রকাশ ও সংগঠন গঠনের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, বন্দি ও আটক ব্যক্তিদের প্রতি ন্যায্য আচরণ এবং কারাগারের পরিবেশ উন্নত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বৈত নাগরিকত্বধারী যেসব ব্যক্তি বাহরাইনে কারাবন্দি বা দণ্ডিত রয়েছেন, তাদের বিষয়েও আলোকপাত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের শেষাংশে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন, ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং সহাবস্থান ও ধর্মীয় স্বাধীনতা-সংশ্লিষ্ট সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক সংলাপ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (GCC)-এর মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ, সহযোগিতা ও যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরিচালিত একটি প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha