রবিবার ২৩ আগস্ট ২০২৬ - ১৭:৩৫
বারো ইমামের জননী

ইসলামের ইতিহাসের পুনঃপাঠে হজরত খাদিজা কুবরা (সা.আ.)-এর নাম এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো, যার আলো উৎসারিত হয়েছিল গভীর ঈমান, দূরদর্শিতা ও আল্লাহর প্রতি গভীর উপলব্ধি থেকে। তিনি ছিলেন সেই মহান নারীদের একজন, যিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রিসালাত কেবল একটি ধর্মীয় আহ্বান নয়; বরং তাওহিদের ভিত্তিতে মানুষকে পুনর্গঠন এবং একটি ঐশী সভ্যতা প্রতিষ্ঠার মহান আন্দোলন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: জাহেলিয়াতের মক্কায় সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদাই ছিল সম্মানের প্রধান মানদণ্ড। কিন্তু হজরত খাদিজা (সা.আ.) সেই প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন মুমিন নারীর আত্মিক শক্তি, সচেতনতা ও আত্মত্যাগও ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর জীবন যেন ঘোষণা করেছিল—আমার সম্পদ, সামর্থ্য ও সামাজিক মর্যাদা ঈমানের সেবায় নিয়োজিত হবে।

এভাবেই বিজয় অর্জিত হওয়ার আগেই ‘ইনফাক’—অর্থাৎ আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয়ের প্রকৃত তাৎপর্য প্রকাশ পেয়েছিল। ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী বলেছেন,

“হজরত খাদিজা কুবরার আত্মত্যাগ না থাকলে, মহানবী (সা.)-এর এই বিশাল ও ঝুঁকিপূর্ণ আন্দোলন হয়তো শুরুর দিকেই এমন দৃঢ়তা অর্জন করতে পারত না। তিনি তাঁর সম্পদ দিয়েছেন, তাঁর মর্যাদা দিয়েছেন, এমনকি নিজের জীবনও উৎসর্গ করেছেন; কারণ তিনি ঈমান এনেছিলেন।”

মক্কার সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক পরিবেশে হজরত খাদিজা (সা.আ.)-এর এই আত্মত্যাগ ছিল এক অসাধারণ সাহসী পদক্ষেপ। বিজয় ও ক্ষমতা অর্জনের আগেই, চরম প্রতিকূলতার মধ্যে তিনি তাঁর সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলেন, যাতে তাওহিদভিত্তিক একটি সভ্যতার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

পবিত্র কোরআনও বিজয়ের আগে আল্লাহর পথে ব্যয় ও সংগ্রামকারীদের বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। কারণ ক্ষমতা ও সাফল্য আসার আগেই ঈমান ও আত্মত্যাগের প্রমাণ দেওয়াই সত্যতার অন্যতম মাপকাঠি।

সূরা আল-হাদিদের ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

لَا یَسْتَوِی مِنْکُمْ مَنْ أَنْفَقَ مِنْ قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ

“তোমাদের মধ্যে যারা বিজয়ের আগে ব্যয় করেছে ও সংগ্রাম করেছে, তারা সমান নয়।”

এই দৃষ্টিকোণ থেকে হজরত খাদিজা (সা.আ.) ছিলেন এর অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

শিয়া ইসলামের দৃষ্টিতে ইসলামের ইতিহাসে নারীর ভূমিকা কোনো গৌণ ভূমিকা নয়; বরং নারী অর্থ, আদর্শ ও মূল্যবোধের অন্যতম বাহক। যেমন হজরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.) ইমামতের হুজ্জত বা প্রমাণস্বরূপ এক অনন্য মর্যাদা ধারণ করেছেন, তেমনি হজরত খাদিজা (সা.আ.) ছিলেন রিসালাতের অন্যতম প্রধান আশ্রয় ও ভিত্তি। মহানবী (সা.)-এর জীবনে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। তিনি শুধু মহানবী (সা.)-এর প্রতি ঈমান আনেননি; বরং সেই ঈমানকে তাঁর সমগ্র জীবন দিয়ে বাস্তবায়ন করেছেন।

ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী হজরত খাদিজা (সা.) সম্পর্কে বলেছেন,

“হজরত খাদিজা মজলুমা; হজরত খাদিজা (সালামুল্লাহ আলাইহা) অপরিচিত। এখন আপনারা তাঁকে এগারো ইমামের মা বলেন; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি বারো ইমামের মা। কারণ তিনি আমিরুল মুমিনিনকে নিজের কোলে, নিজের স্নেহময় আশ্রয়ে এবং নিজের জীবনের পরিমণ্ডলে কয়েক বছর পর্যন্ত লালন-পালন করেছিলেন।”

— হজরত খাদিজা (সা.আ.)-এর স্মরণে আয়োজিত এক সমাবেশে বক্তব্য, ২০ মে ২০১৬

এই বক্তব্য হজরত খাদিজা (সা.আ.)-এর ঐতিহাসিক ভূমিকার ব্যাপ্তিকে আরও স্পষ্ট করে। হজরত ফাতিমা (সা.আ.) যেমন নবুয়তের ধারাবাহিকতার সঙ্গে ইমামতের যোগসূত্র বহন করেছেন, তেমনি হজরত খাদিজা (সা.আ.) ছিলেন সেই ধারার প্রাথমিক ভিত্তিগুলোর অন্যতম। এভাবে নবুয়ত ও ইমামতের মধ্যে বেলায়েতের যে ধারাবাহিকতা, তার ইতিহাসে খাদিজা (সা.আ.)-এর ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

হজরত আলী (আ.)-এর শৈশবের কয়েকটি বছর হজরত খাদিজা (সা.আ.)-এর স্নেহময় পরিবেশে অতিবাহিত হওয়াকে নবুয়ত ও ইমামতের মধ্যকার সম্পর্কের একটি বাস্তব ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হিসেবেও দেখা যায়।

এই দৃষ্টিতে হজরত খাদিজা (সা.আ.) কেবল ভালোবাসা ও আবেগের প্রতীক নন; তিনি ছিলেন ঈমানের প্রজ্ঞা ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের এক অনন্য উদাহরণ। সচেতন সিদ্ধান্ত, সম্পদ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে তিনি মহানবী (সা.)-এর রিসালাতের পথকে সুগম করেছিলেন।

আবু তালিব (আ.) যদি ছিলেন মহানবী (সা.)-এর বাহ্যিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান রক্ষক, তবে হজরত খাদিজা (সা.আ.) ছিলেন তাঁর মানসিক প্রশান্তি ও অন্তর্গত শক্তির প্রধান আশ্রয়। যখন বাইরে থেকে মানুষ মহানবী (সা.)-কে প্রত্যাখ্যান ও বিরোধিতা করছিল, তখন খাদিজা (সা.আ.) ছিলেন তাঁর জন্য শান্তি, ভালোবাসা ও নির্ভরতার এক দৃঢ় স্তম্ভ।

রিসালাতের সূচনাপর্বে হজরত খাদিজা (সা.আ.) মহানবী (সা.)-এর জন্য এমন এক নিরাপদ ও সমর্থনপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যা তাঁর মহান দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আজকের ভাষায় এটিকে একটি মহান আদর্শিক আন্দোলনের মানসিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

প্রত্যেক ঐশী আন্দোলনের টিকে থাকার জন্য একটি ঈমানদার আশ্রয় প্রয়োজন। হজরত খাদিজা (সা.আ.) ছিলেন সেই আশ্রয়ের প্রথম ও উজ্জ্বল আদর্শগুলোর একজন। তিনি দেখিয়েছেন, একজন নারীও ইতিহাসের কেন্দ্রে অবস্থান করে একটি মহান পরিবর্তনের ভিত্তি নির্মাণ করতে পারেন।

খাদিজা-সুলভ নারীত্ব মানে নিজের ভূমিকার একটি নতুন সংজ্ঞা তৈরি করা—ঈমান, অর্থনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সক্রিয় থাকা, অথচ ভালোবাসা, মমতা ও কোমলতার সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখা।

হজরত খাদিজা (সা.আ.)-এর ঘর থেকেই হজরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর মতো মহীয়সী নারীর আবির্ভাব। আর ফাতিমা (সা.আ.)-এর মাধ্যমে বেলায়েতের মহান ধারার বিকাশ ঘটে। এভাবে ইসলামের ইতিহাসে নারীর ঈমান, ত্যাগ ও সচেতন ভূমিকা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে একটি গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে।

ইতিহাসে যেসব ঐশী আন্দোলন ঈমান ও আত্মত্যাগের ভিত্তিতে এগিয়ে গেছে—কারবালার মহান আন্দোলন থেকে শুরু করে ইরানের ইসলামী বিপ্লব পর্যন্ত—সেগুলোকে এই দীর্ঘ আদর্শিক ধারার বিভিন্ন অধ্যায় হিসেবে দেখা যেতে পারে।

আজকের গণমাধ্যম ও চিন্তাগত যুদ্ধের যুগেও হজরত খাদিজা (সা.আ.)-এর জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:

ঈমান হতে হবে প্রজ্ঞাভিত্তিক, ভালোবাসা হতে হবে সঠিক লক্ষ্যনির্দেশিত এবং নারীকে হতে হবে পরিবার ও সমাজের পাশাপাশি সভ্যতা নির্মাণেরও অন্যতম ভিত্তি।

হজরত খাদিজা (সা.আ.) আমাদের শিখিয়েছেন—পৃথিবীর মহান পরিবর্তন অনেক সময় নীরবতা, প্রজ্ঞা ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই মহান আত্মাদের হাতে সংঘটিত হয়।

হজরত খাদিজা (সালামুল্লাহ আলাইহা)—এমন এক মহীয়সী নারী, যিনি জাহেলিয়াতের অন্ধকারের সামনে ঈমানের দৃঢ়তা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তাঁর জীবন দিয়ে যেন ঘোষণা করেছিলেন: সত্যের একটি মূল্য আছে, আর সেই মূল্য পরিশোধ করতে আমি প্রস্তুত।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha