হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,
সংক্ষিপ্তসার:
পবিত্র কুরআন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মি (অক্ষরজ্ঞানহীন) হওয়া, নববী হাদিসের সাথে এর সুস্পষ্ট পার্থক্য, আরবি ভাষার শীর্ষস্থানীয় বাগ্মীদের এর সমতুল্য রচনা উপস্থাপনে অপারগতা, এবং পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোর সাথে এর সামঞ্জস্য-এই সব কারণে তা মানবরচিত হতে পারে না। আর এর মনগড়া হওয়ার দাবি, নকলি ও ঐতিহাসিক প্রমাণ দ্বারা খণ্ডিত হয়। এই গ্রন্থ, যার বিস্তৃত আইন-বিধান রয়েছে এবং কোনো অসামঞ্জস্যতা নেই, তা মানবসামর্থ্যের ঊর্ধ্বে এবং এর ঐশী প্রকৃতি প্রমাণ করে।
উত্তর:
কিছু প্রাচ্যবিদ ও সন্দেহ-উত্থাপনকারীরা পবিত্র কুরআনকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রচনা ও নিজ হাতে লিখিত গ্রন্থ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তারা দাবি করে যে, মুহাম্মদ (সা.) আরবি ভাষার জ্ঞান এবং পূর্ববর্তী উৎসসমূহের ওপর নির্ভর করে কুরআন রচনা করেছেন। এরপর তিনি মানুষের আস্থা অর্জন এবং পার্থিব উদ্দেশ্য-যেমন নেতৃত্ব ও শাসনক্ষমতা লাভ-হাসিল করার জন্য কুরআনকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ বলে দাবি করেছেন।
কখনো কখনো এই মতটিকে আরও পরিশীলিত ভাষায় এভাবে উপস্থাপন করা হয় যে, কুরআনের অর্থসমূহ অদৃশ্য জগত থেকে মুহাম্মদ (সা.)-এর অন্তরে প্রকাশিত হয়েছিল; এরপর তিনি নিজের রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী সেই অর্থগুলোকে শব্দের পোশাক পরিয়েছেন এবং সেগুলোকে ‘আল্লাহর কালাম’ নামে অভিহিত করেছেন। [১]
প্রথম দৃষ্টিতে এই দাবির সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন জড়িয়ে আসে-কুরআনের বালাগাত ও ফাসাহাতের সঙ্গে নবীজির হাদিসের পার্থক্য কেন? এবং কেন হাদিসের ভাষাগত মান তুলনামূলকভাবে নিম্নতর?
এর উত্তর হলো: যদি কুরআন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রচনা হতো, তাহলে প্রত্যাশা করা যেত যে তাঁর সব বক্তব্য-কুরআন ও হাদিস উভয়ই-বালাগাতের একই স্তরের হবে। কিন্তু কুরআন ও হাদিসের মধ্যে যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে, সেটিই কুরআনের ঐশী উৎসের অন্যতম বড় প্রমাণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কবি বা আরবের খ্যাতনামা ফাসিহ বক্তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না এবং ফাসাহাত ও বালাগাতের জন্যও তিনি কখনো বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ ছিলেন না। তাহলে কীভাবে সম্ভব যে, যিনি চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত কবিতা রচনা বা সাহিত্যিক গদ্য রচনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা রাখেননি, তিনি হঠাৎ এমন এক মহাগ্রন্থ নিয়ে এলেন, যার অনুরূপ রচনা করতে আরবের শ্রেষ্ঠ ফাসিহরাও অক্ষম হয়ে পড়েছিল?
কুরআন তার রচনাশৈলী, বাক্যপ্রবাহ, বক্তব্য উপস্থাপন এবং সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে অনন্য এবং মানবীয় বাণী থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। কুরআনের মোকাবিলায় আরবের ফাসিহদের অক্ষমতা শুধু ইতিহাসেই লিপিবদ্ধ হয়নি; স্বয়ং কুরআনও সুস্পষ্টভাবে তার বিরোধীদের অনুরূপ কিছু নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে:
﴿فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ﴾ [২]
অতএব, তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে আসো।
এবং:
﴿فَلْيَأْتُوا بِحَدِيثٍ مِثْلِهِ﴾ [৩]
তাহলে তারা এর অনুরূপ কোনো বাণী নিয়ে আসুক।
এই চ্যালেঞ্জ আজ পর্যন্ত অমীমাংসিত রয়েছে এবং কেউ কুরআনের অনুরূপ, এমনকি সূরা কাওসারের মতো একটি সংক্ষিপ্ত সূরাও রচনা করতে সক্ষম হয়নি।
যদি কুরআন মানুষের তৈরি হতো, তাহলে বক্তৃতা ও বালাগাতের ক্ষেত্রে দক্ষ আরবের ফাসিহরা সহজেই তার অনুরূপ একটি নমুনা উপস্থাপন করতে পারত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারত। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে যে, তারা তা করতে সক্ষম হয়নি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক কুরআন রচনার দাবি খণ্ডনের বর্ণনামূলক ও ঐতিহাসিক প্রমাণ:
১. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মি হওয়া:
পবিত্র কুরআন রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে একজন উম্মি (পড়াশোনা না-করা/নিরক্ষর) ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, যিনি কুরআন নাজিল হওয়ার আগে কোনো কিতাব পড়তেন না এবং নিজের হাতে কিছু লিখতেনও না:
﴿وَمَا كُنْتَ تَتْلُو مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لَارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ﴾ [৪]
এর আগে আপনি কোনো কিতাব পাঠ করতেন না এবং নিজ হাতে তা লিখতেনও না; তাহলে বাতিলপন্থীরা অবশ্যই সন্দেহ পোষণ করত।
এই আয়াত স্পষ্টভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজের রচনা বা অন্য কোনো উৎস থেকে গ্রহণ করার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয়।
আধুনিক যুগের ঐতিহাসিক ও প্রাচ্যবিদরাও এই বিষয়ে একমত যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) পড়তে বা লিখতে জানতেন না। কন্ত হেনরি দ্য ক্যাস্ত্রি এ সম্পর্কে বলেন: মুহাম্মদ পড়তেন না এবং লিখতেনও না; বরং তিনি যেমন বারবার নিজেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি ছিলেন একজন উম্মি নবী। তাঁর সমসাময়িকদের কেউই তাঁর এই পরিচয়ের বিরোধিতা করেনি। [৫]
যদি কুরআন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজের রচনা হতো, তাহলে কীভাবে একজন নিরক্ষর ব্যক্তি এমন এক পরিবেশে-যেখানে মানুষ লুটতরাজ ও যুদ্ধের সঙ্গে অভ্যস্ত ছিল এবং কন্যাশিশুদের জীবন্ত কবর দেওয়া হতো-এমন একটি গ্রন্থ নিয়ে আসতে পারতেন, যাতে মানবজীবনের সকল দিকের জন্য ব্যাপক ও পরস্পরবিরোধিতাহীন বিধান রয়েছে?
এটিই কুরআনের ঐশী উৎসের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পার্থিব স্বার্থের প্রতি লোভ না থাকার বিষয়ে মুশরিকদের স্বীকৃতি:
মক্কার মুশরিকরা, যারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে চরম শত্রুতা পোষণ করত, তারা কখনো তাঁকে মিথ্যাবাদী বা লোভী বলে অভিযুক্ত করেনি। তারা তাঁকে জাদুকর ও উন্মাদ বলে অভিযুক্ত করত, কিন্তু কখনো বলেনি যে তিনি পার্থিব মর্যাদা, ক্ষমতা বা নেতৃত্ব লাভের আকাঙ্ক্ষায় এসব করছেন।
স্বয়ং কুরআনও এই সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করেছে যে, মুশরিকরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্ব ও বক্তব্য মেনে নিত, কিন্তু তাঁর উপাস্যকে অস্বীকার করত।
এ থেকে বোঝা যায় যে, তাঁর শত্রুদের দৃষ্টিতেও রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন একজন সত্যবাদী, সৎচরিত্রের ও পার্থিব লোভ-লালসামুক্ত ব্যক্তি।
৩. কুরআনের সঙ্গে নবীজির হাদিসের পার্থক্য এবং পূর্ববর্তী নবীদের ওহির সঙ্গে সামঞ্জস্য:
পবিত্র কুরআন পূর্ববর্তী সব আসমানি কিতাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর সত্যতাকে সমর্থন করে:
﴿إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِنْ بَعْدِهِ﴾ [৬]
নিশ্চয়ই আমরা আপনার প্রতি ওহি পাঠিয়েছি, যেমন আমরা নূহের প্রতি এবং তাঁর পরবর্তী নবীদের প্রতি ওহি পাঠিয়েছিলাম।
এই সামঞ্জস্য প্রমাণ করে যে, কুরআন সেই একই ওহিভিত্তিক ধারার ধারাবাহিকতা, যা শুরু থেকেই পূর্ববর্তী নবীদের ওপর নাজিল হয়ে এসেছে।
মরিস বুকাই এ বিষয়ে লিখেছেন: ইহুদি, খ্রিস্টান এবং পশ্চিমা অমুসলিমরা কোনো প্রমাণ ছাড়াই এই ধারণাকে সামনে এনেছে যে, মুহাম্মদ (সা.) তাওরাত ব্যবহার করে কুরআন রচনা করেছেন। তাহলে এ কথাও বলা যেতে পারে যে, ঈসা (আ.) তাঁর সমসাময়িকদের প্রতারিত করেছিলেন এবং নিজের সুসংবাদের প্রচারের জন্য পুরাতন নিয়মের কিতাবগুলো ব্যবহার করেছিলেন। [৭]
৪. কুরআনের অনুরূপ কিছু আনতে অক্ষমতা; সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণ:
যদি কুরআন মানুষের তৈরি হতো, তাহলে আরবের বাগ্মী ও ফাসিহ ব্যক্তিদের পক্ষে সহজেই তার অনুরূপ কোনো রচনা নিয়ে আসা সম্ভব হওয়ার কথা। কিন্তু তারা তা করতে তো পারেনিই; বরং কুরআন নাজিল হওয়ার পর নিজেদের অক্ষমতাও স্বীকার করেছে।
কুরআন তার চ্যালেঞ্জ ও মোকাবিলার আহ্বানের মাধ্যমে এই অক্ষমতাকে চিরকালের জন্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে।
দেহলভির মতো কোনো ব্যক্তি যদি এই সুস্পষ্ট সত্যটি উপেক্ষা করে থাকেন-যে ব্যক্তি আরবের কবি বা প্রসিদ্ধ ফাসিহদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না, তিনি কীভাবে এত গভীর অর্থকে এমন অসাধারণ ফাসিহ ও বালিগ শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন-তাহলে বলতে হয়, এই উপেক্ষার কারণ হলো কুরআন ও মানবীয় বাণীর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য যথাযথভাবে উপলব্ধি না করা।
৫. ব্যাপক ও পরস্পরবিরোধিতাহীন আইন প্রণয়ন:
পবিত্র কুরআন মানবজীবনের সকল দিকের জন্য ব্যাপক ও পরিপূর্ণ বিধান প্রদান করেছে, অথচ এসব বিধানের কোনোটির মধ্যেই কোনো বৈপরীত্য দেখা যায় না। বিশেষত এমন একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে-যিনি জাহেলি পরিবেশে এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই বেড়ে উঠেছেন-এ ধরনের কাজ করা তাঁর সামর্থ্যের অতীত। [৮]
কীভাবে এমন একজন মানুষ, যিনি নিজেই জড়জগতের অংশ এবং পরিবর্তনশীলতার অধীন, এমন একটি আইন প্রণয়ন করতে পারেন যা সব যুগ ও প্রজন্মের জন্য প্রযোজ্য হবে, মানবসমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যাবে না এবং একই সঙ্গে তাঁর প্রণীত অন্য কোনো আইনের সঙ্গেও বিরোধ সৃষ্টি করবে না? এটিও কুরআনের ওহিভিত্তিক হওয়ার একটি প্রমাণ।
উপসংহার
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রচিত গ্রন্থ হিসেবে কুরআনকে অভিহিত করার দাবি সুস্পষ্ট বর্ণনামূলক, ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মি হওয়া, কুরআন ও নবীজির হাদিসের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য, কুরআনের অনুরূপ কিছু রচনা করতে আরবের ফাসিহদের অক্ষমতা, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পার্থিব স্বার্থের প্রতি লোভ না থাকার বিষয়ে মুশরিকদের স্বীকৃতি এবং পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোর সঙ্গে কুরআনের সামঞ্জস্য-সবকিছুই এই সত্যের সাক্ষ্য দেয় যে, কুরআন আল্লাহর বাণী ও ওহিভিত্তিক কিতাব; একে কখনোই মানুষের রচনা হিসেবে অভিহিত করা যায় না।
যেমন কুরআনে বলা হয়েছে:
﴿وَ لَوْ تَقَوَّلَ عَلَیْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِیلِ لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْیَمِینِ ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِینَ﴾ [৯]
আর সে যদি আমার নামে কোনো কথা রচনা করত, তবে অবশ্যই আমি তাকে ডান হাত দিয়ে পাকড়াও করতাম; অতঃপর অবশ্যই তার হৃদপিণ্ডের ধমনী কেটে দিতাম।
অতএব, কুরআন শুধু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রচনা নয়-বরং এটি আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ মুজিযা, যা চিরকাল নিজের সত্যতার সাক্ষ্য বহন করবে।
তথ্যসূত্র:
[১] শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি, তাফহীমাতুল ইলাহিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৫৮১; সাইয়্যেদ আহমদ খান হিন্দির হুয়াল হুদা ওয়াল ফুরকান গ্রন্থের ভূমিকা থেকে উদ্ধৃত।
[২] সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৩।
[৩] সূরা আত-তূর, আয়াত ৩৪।
[৪] সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত ৪৮।
[৫] কন্ত হেনরি দ্য ক্যাস্ত্রি, ইসলাম, আফকার ও আন্দিশেহা, পৃষ্ঠা ২৮।
[৬] সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৬৩।
[৭] মরিস বুকাই, দিরাসাতুল কুতুবিল মুকাদ্দাসাহ, পৃষ্ঠা ১৪৯।
মজিদুল ইসলাম শাহ
আপনার কমেন্ট