শুক্রবার ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ২১:৪৩
কুরআনের আয়াতের আলোকে হজরত আলী (আ.)-এর বেলায়েত ও জীবনপদ্ধতি

বেসপাটলি দাদনপাড়ায় মাওলানা আসগার আলী গাইন জুমার খুতবায় কুরআনের আয়াত, হজরত আলী (আ.)-এর জীবনদর্শন ও নবীর সুন্নত নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ, ৪ সেপ্টেম্বর: "অণু পরিমাণ সৎকর্মও আল্লাহর কাছে হিসাবের অন্তর্ভুক্ত"—সূরা যিলযালের এই আয়াতের আলোকে হজরত আলী (আ.)-এর জীবন, তাঁর বেলায়েত, সামাজিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা এবং নবী করিম (সা.)-এর সুন্নত হিসেবে আতর ব্যবহারের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলেন বিশিষ্ট আলেম মাওলানা আসগার আলী গাইন। 

কুরআনের আয়াত দিয়ে আলোচনার সূচনা

আলোচনার শুরুতে মাওলানা আসগার আলী গাইন সূরা যিলযালের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করেন—

"فَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٍ خَيۡرࣰا يَرَهُۥ وَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةࣲ شَرࣰّا يَرَهُۥ"

(অর্থ: সুতরাং কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা সে দেখবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কর্ম করলে তাও সে দেখবে।)

মাওলানা আসগার আলী এই আয়াতের মাধ্যমে হজরত আলী (আ.)-এর জীবন ও কর্মের বিশ্লেষণ তুলে ধরেন—যেখানে প্রতিটি ক্ষুদ্র কাজও আল্লাহর কাছে হিসাবের অন্তর্ভুক্ত এবং এই হিসাবের দৃষ্টিকোণ থেকে হজরত আলী (আ.)-এর জীবন ছিল পুরোপুরি আল্লাহমুখী ও মানবতার সেবায় নিবেদিত।

হজরত আলী (আ.)-এর জীবনদর্শন ও সামাজিক সম্পর্ক

মাওলানা আসগার আলী গাইন হজরত আলী (আ.) থেকে বর্ণিত একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, হজরত আলী (আ.) মানুষকে জীবনের পথনির্দেশনা দিতে গিয়ে বলেছেন—হাজারো মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে, কিন্তু যখন সবাই শত্রু হয়, তখনও একজন মানুষ যেন তোমার সঙ্গী থাকে। এই হাদিসের মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, সমাজে বসবাস করতে গেলে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু কঠিন সময়ে যখন সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখনও একজন সত্যিকারের বন্ধু বা সঙ্গী থাকা মানসিক শান্তি ও আধ্যাত্মিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। হজরত আলী (আ.) এই শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষকে সামাজিক সম্পর্কের গভীরতা ও মানবিক মূল্যবোধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

প্রসঙ্গক্রমে তিনি রাসূল (সা.)-এর সেই বিখ্যাত বাণীও উল্লেখ করেন, যেখানে তিনি বলেছেন: আলী আমার থেকে এবং আমি তাঁর থেকে এবং আলীই আমার পর সমস্ত মুমিনদের ওলি তথা অভিভাবক ও নেতা।

আরও বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, আলী (আ.)-কে মহব্বত করা ঈমান, আর আলী (আ.)-এর সঙ্গে শত্রুতা করা মুনাফেকী। 

মাওলানা বলেন, সাহাবায়ে কিরামগণ কারো ঈমান ও মুনাফিকী যাচাই করতে হজরত আলী (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শত্রুতার মাধ্যমেই নির্ধারণ করতেন। এটি প্রমাণ করে হজরত আলী (আ.)-এর মর্যাদা ইসলামি উম্মাহর মধ্যে কতটা উচ্চ পর্যায়ের।

"আল্লাহর রজ্জু" আয়াত ও বেলায়েতের প্রসঙ্গ

আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে তিনি সূরা আলে ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেন—

"وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا"

(অর্থ: আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না।)

তিনি বলেন, এই আয়াতের মাধ্যমেই হজরত আলী (আ.)-এর বেলায়েত বা অভিভাবকত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তিনি উল্লেখ করেন, রাসূল (সা.) গাদিরে খুমের ঘটনায় ঘোষণা করেছিলেন: আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা। হে খোদা! যে আলীর সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখে তুমিও তার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখ, যে আলীর সাথে শত্রুতা রাখে তুমিও তার সাথে শত্রুতা রাখ।

মাওলানা আসগার আলী গাইন আরও বলেন, রাসূল (সা.) হজরত আলী (আ.)-কে সম্বোধন করে বলেছেন: এই আলী আমার ভাই, আমার ওয়াসি এবং আমার পর আমার প্রতিনিধি হবে। তাই তাঁর আদেশ শোন, তাঁর আদেশ মত কাজ কর।

তিনি শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেন, হজরত আলী (আ.)-এর বেলায়েত মানে শুধু নেতৃত্ব নয়, বরং এটি আল্লাহর পথে চলার দৃঢ় সংকল্প এবং উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ রাখার শক্তি। এই আয়াতের মাধ্যমেই আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং সঠিক পথনির্দেশকের অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

আতর ব্যবহার : নবীর সুন্নত

সভায় সুগন্ধি (আতর) ব্যবহার নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। মাওলানা আসগার আলী বলেন, আতর ব্যবহার করা নবী করিম (সা.)-এর সুন্নত এবং এটি ইসলামের অন্যতম পছন্দনীয় আমল।

তিনি হাদিসের বর্ণনা উল্লেখ করেন—নবী করিম (সা.) নিজেও সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং পছন্দ করতেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন: তোমাদের দুনিয়া থেকে আমার কাছে তিনটি জিনিস অধিক প্রিয়—নারী, সুগন্ধি আর আমার চক্ষু শীতল হয় নামাজের মাধ্যমে।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কেউ সুগন্ধি উপহার দিলে তিনি তা গ্রহণ করতেন, ফিরিয়ে দিতেন না। হজরত আনাস (রা.) আরও বলেন: আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুরভির চেয়ে হৃদয়কাড়া কোনো ঘ্রাণ কোথাও গ্রহণ করিনি।

মাওলানা আসগার আলী স্মরণ করিয়ে দেন, আতর ব্যবহারে রোজাও ভাঙে না, কারণ এটি সরাসরি শরীরে প্রবেশ করে না, বরং বাহ্যিক সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) যখন কোনো সুগন্ধি পেতেন, তখন তা নিজের শরীরে ও কাপড়ে ব্যবহার করতেন এবং অন্যদেরও ব্যবহার করতে উৎসাহিত করতেন।

সভার পরিবেশ ও শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া

বেসপাটলি দাদনপাড়া এলাকার স্থানীয় মুসল্লিদের নিয়ে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সভাস্থলটি ছিল ধর্মীয় পরিবেশে ভরপুর। উপস্থিত শ্রোতারা মাওলানা আসগার আলী গাইনের প্রতিটি বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেন এবং শেষে তাঁর জন্য দোয়া করেন।

আলোচনা সভার সমাপ্তি ঘটে এই বার্তার মাধ্যমে যে, হজরত আলী (আ.)-এর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করেই সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন সম্ভব—শুধু ব্যক্তিজীবনে নয়, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনেও। কুরআনের আয়াত, হজরত আলী (আ.)-এর হাদিস এবং নবীর সুন্নত—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করেই ইসলামি জীবনদর্শন পূর্ণতা পায় বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

কুরআনের আয়াতের আলোকে হজরত আলী (আ.)-এর বেলায়েত ও জীবনপদ্ধতি

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha