সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১৩:২৬
বাহরাইনের আলেমদের সতর্কবার্তা: সরকার ধর্মবিরোধী পথে এগিয়ে যাচ্ছে

বাহরাইনের আলেমরা এক বিবৃতিতে আল-খলিফা সরকারকে ধর্মবিরোধী পথে অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র অনুবাদ বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাহরাইনের আলেমরা এক বিবৃতিতে আল-খলিফা সরকারকে ধর্মবিরোধী পথে অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, “এই গুরুতর অস্তিত্বগত হুমকি স্পষ্টতই ধর্মীয় মতবাদ, আকিদা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে।”

বিবৃতিটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

إِنِ الْحُکْمُ إِلاَّ لِلَّـهِ أَمَرَ أَلاَّ تَعْبُدُوا إِلاَّ إِیَّاهُ ذلِکَ الدِّینُ الْقَیِّمُ وَلکِنَّ أَکْثَرَ النَّاسِ لا یَعْلَمُونَ

“বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারও ইবাদত করবে না। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” (সূরা ইউসুফ: ৪০)

আল্লাহর সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীনের পথ থেকে বিচ্যুত বা এর বিরোধী হলে কোনো মানুষের জীবন সুশৃঙ্খল হতে পারে না এবং কোনো সমাজের পরিস্থিতিও সংশোধিত হতে পারে না। বিশেষ করে এর কোনো বিশ্বাস, মূলনীতি, বিধান, আইন বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করা হলে তো নয়ই।

এটি এমন একটি ইসলামী বিশ্বাস, যার বিষয়ে দুই মুসলমানের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। পবিত্র কোরআন ও সর্বসম্মত সুন্নাহ এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।

আমরা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাহরাইনের প্রতি গভীর ভালোবাসা, আন্তরিক উদ্বেগ ও দায়িত্ববোধ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করছি যে, সরকার অত্যন্ত বেপরোয়া গতিতে ধর্মবিরোধী একটি পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে আমরা ধর্ম, আকিদা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং ধর্মীয়ভাবে আমাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছুর বিরুদ্ধে একটি গুরুতর ও অস্তিত্বগত হুমকি স্পষ্টভাবে অনুভব করছি।

ধারাবাহিক বিভিন্ন প্রকল্প ও পরিকল্পিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এ পদক্ষেপগুলো নেওয়া হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান গতিতে এগিয়ে চলা এসব পদক্ষেপ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ধর্ম ও আকিদা একটি সংকটজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। এর পরিণতি দেশের সার্বিক পরিস্থিতির জন্যও ভয়াবহ হতে পারে।

এই ধারাবাহিকতার অন্যতম দিক হলো—সরকার জাফরি ওয়াক্‌ফ, হুসাইনিয়া, মাতমকেন্দ্র, মসজিদ ও কবরস্থানগুলোর ওপরও হস্তক্ষেপ করেছে। এসবের তত্ত্বাবধান একটি একক সরকারি কাউন্সিলের অধীনে নেওয়া হয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন সরকারের একজন মন্ত্রী। এটি কয়েক দশক ধরে চলে আসা সেই রীতির লঙ্ঘন, যেখানে ওয়াক্‌ফ-সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে ধর্মবহির্ভূত রাজনৈতিক নীতির নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন রাখার বিষয়ে ঐকমত্য ও বাস্তব চর্চা ছিল।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এই কাউন্সিলের সিদ্ধান্তগুলো ওয়াক্‌ফের তত্ত্বাবধায়ক ও পরিচালকদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং তাদের নিয়োগ ও অপসারণের অধিকার সরকারি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ওয়াক্‌ফদাতাদের শর্ত ও তাঁদের ওয়াক্‌ফনামায় উল্লেখিত বিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে। আমাদের কাছে এসব শর্ত বাধ্যতামূলক শরিয়াহসম্মত বিধানের মর্যাদা রাখে। সুস্পষ্ট শরিয়াহসম্মত অধিকার ছাড়া কেউ তা বাতিল বা পাশ কাটাতে পারে না।

এটি ‘শরিয়াহসম্মত কর্তৃত্ব’-এর ওপর একটি আগ্রাসী ও সুস্পষ্ট হস্তক্ষেপ। এ কর্তৃত্বের বৈধতা কেবল ওয়াক্‌ফদাতা ও তাঁর নির্ধারিত শর্ত অথবা শরিয়াহসম্মত ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই আসে; কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা সরকারি ক্ষমতা থেকে নয়।

এ পদক্ষেপের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে ধর্ম, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও ওয়াক্‌ফ সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব প্রদান করা হচ্ছে। এটি এমন একটি বিপজ্জনক পথের সূচনা, যার ফলে আল্লাহর ঘর ও শোকসভাগুলোকে এমন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হতে পারে, যা সরকারের হিসাব-নিকাশ ও স্বার্থের অধীন থাকবে এবং ওয়াক্‌ফদাতাদের উদ্দেশ্য ও ইসলামী শরিয়াহর বিধান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

এ ধারাবাহিকতার সঙ্গে সাম্প্রতিক আরেকটি জুলুমপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো—জীবনের সব ক্ষেত্রে ধর্মীয় বক্তব্য ও ধর্মের স্বাধীন কণ্ঠস্বরকে শৃঙ্খলিত করা। শিক্ষা, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, প্রচার, উপদেশ, দাওয়াত এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমকে সরকারি অনুমতি ও লাইসেন্সের অধীন করা হয়েছে।

এটি ধর্মের প্রতি বিরোধিতা এবং ধর্মকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার শামিল; অথচ আল্লাহ তায়ালা যে নির্দেশ দিয়েছেন, তার আলোকে রাষ্ট্রের উচিত ধর্মের অনুসরণ করা, ধর্মকে নিজের অধীন করা নয়। কারণ মানুষের কল্যাণ, সংশোধন ও হেদায়াত আল্লাহর আনুগত্য এবং তাঁর বিধান ও আইন অনুযায়ী জীবন পরিচালনার মধ্যেই নিহিত।

এ সিদ্ধান্ত ধর্মীয় স্বাধীনতা-সংক্রান্ত সংবিধানের বিধান এবং দেশের প্রচলিত রীতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। এসব ঐতিহ্যের শিকড় ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মসজিদ, হুসাইনিয়া ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকে সরকারি সিদ্ধান্ত, হস্তক্ষেপ ও ধর্মবহির্ভূত রাজনৈতিক নীতির প্রভাব থেকে স্বাধীন রাখার রীতি চলে আসছে।

বরং এ সিদ্ধান্ত দেশের বিদ্যমান ও উত্তরাধিকারসূত্রে চলে আসা সেই সমগ্র বাস্তবতাকে ধ্বংস ও হরণ করছে, যা ইসলাম এবং তার অস্তিত্ব ও পবিত্রতা রক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

আমরা সরকারকে বিবেচনাপ্রসূত পদক্ষেপ নেওয়া এবং ধর্মের ওপর শৃঙ্খল আরোপকারী ধারাবাহিক সিদ্ধান্তগুলো বাতিল করার আহ্বান জানাই। কারণ এর পরিণতি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক হবে।

ধর্মের প্রতি দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকা, ইসলামী বিধান পুনরুজ্জীবিত করা এবং আল্লাহ তায়ালা যে ন্যায়বিচার ও জনগণের রাজনৈতিক ও জীবিকাগত অধিকার নির্ধারণ করেছেন, তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই দেশের পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। একই সঙ্গে জনগণের মর্যাদা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে; কারণ তা তাদের ধর্মীয় মর্যাদা ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থেকে অবিচ্ছেদ্য।

জনগণের অধিকার আরও হরণ করা, তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা এবং তাদের ধর্মীয় জীবনের অবশিষ্ট সীমিত পরিসরও দখল করে নেওয়ার মাধ্যমে দেশের পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha