হাওজা নিউজ এজেন্সি: দেশটির মাযান্দারান প্রদেশের হাওযায়ে ইলমিয়ার নতুন শিক্ষাবর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইসলামী বিপ্লবের সূচনালগ্নে যেমন উলামায়ে কেরাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তেমনি বিপ্লবের আদর্শ, অর্জন ও ইসলামি নেযামের সুরক্ষার দায়িত্বও তাঁদের ওপর বর্তায়। এ কারণে হাওযার পরিকল্পনায় একদিকে তালাবাদের ইলম অর্জন ও তাহকিকের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে, অন্যদিকে ইসলামি নেযাম ও বিপ্লবের হেফাজতের দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
কায়েমশাহরের কুতনা এলাকার মাদরাসায়ে ইমাম সাদিক (আ.)-এ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে মাযান্দারানে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম মুহাম্মদী লায়িনী, মাযান্দারান হাওযা ইলমিয়ার পরিচালক হুজ্জাতুল ইসলাম সদরুল্লাহ ইসমাইলজাদেহসহ প্রদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের উলামা, শিক্ষক ও হাওযা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
তাকওয়া ও তাওয়াসসুল—সাফল্যের মৌলিক উপায়
আয়াতুল্লাহ শাব-জিন্দেদার বলেন, মানুষের ফিতরাত তাকে চূড়ান্ত নাজাত ও কামিয়াবির পথ অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক প্রভাব ও নফসের প্রবৃত্তির কারণে মানুষের এই ফিতরি প্রবণতা অনেক সময় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ফলে মানুষ প্রকৃত হিদায়াতের পরিবর্তে বিভিন্ন বাতিল ও বিচ্যুত আধ্যাত্মিক মতবাদের দিকে আকৃষ্ট হয়।
তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা বান্দার জন্য নাজাত ও কামিয়াবির পথ সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। এর অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো তাকওয়া। তাকওয়া হলো—বান্দা আল্লাহ তায়ালার আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক থাকবে; যেসব আমলে আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হন, সেসব আমলে নিজেকে নিয়োজিত রাখবে এবং যেসব কাজ থেকে তিনি নিষেধ করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকবে।
আয়াতুল্লাহ শাব-জিন্দেদার বলেন, আল্লাহর নৈকট্য ও উচ্চতর আধ্যাত্মিক মর্যাদা অর্জনের জন্য তাকওয়ার পাশাপাশি ওসিলা অন্বেষণও জরুরি। আহলে বাইত (আ.)-এর পবিত্র সত্তার প্রতি মহব্বত, তাঁদের সঙ্গে রুহানি সম্পর্ক এবং তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে তাওয়াসসুল মুমিনের আত্মিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তিনি বিশেষভাবে হযরত ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর প্রতি তাওয়াসসুলের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, একজন মুমিনের উচিত অন্তরের গভীরতা থেকে আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি মহব্বত পোষণ করা এবং আল্লাহর দরবারে তাঁদের ওসিলায় সাহায্য প্রার্থনা করা।
ইসলামী বিপ্লবের হেফাজতে হাওযার ভূমিকা
ইরানে ইসলামী বিপ্লব প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, সংকট ও চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে আয়াতুল্লাহ শাব-জিন্দেদার বলেন, এসব সংকট মোকাবিলায় জনগণের ঈমান, আহলে বাইতের প্রতি মহব্বত এবং ইসলামি মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তিনি বলেন, ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর কিয়াদত ও দূরদর্শী নেতৃত্ব, বিপ্লবের শহীদদের আত্মত্যাগ এবং উলামায়ে কেরামের মেহনতের মাধ্যমে ইরানে ইসলামি নেযাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন এই নেযামের হেফাজত ও ইসলামী বিপ্লবের আদর্শ সংরক্ষণ করা পরবর্তী প্রজন্মের আলেম ও তালাবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তাঁর মতে, হাওযায়ে ইলমিয়া শুধু দরস-তাদরিসের কেন্দ্র নয়; বরং দ্বীনি ইলম, আকিদা, আখলাক, ফিকহ, উসুল, তাহকিক ও সমাজের হিদায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মারকাজ। ভবিষ্যতের হাওযাকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ ও যোগ্য উলামা তৈরি হয়।
দারস-তাদরিসে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান
তালাবায়ে কেরামের ইলমি উন্নতির জন্য নিয়মিত অধ্যয়ন ও তাহকিকের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, তালাবাদের উচিত দক্ষ আসাতিযায়ে কেরামের সান্নিধ্যে থেকে ইলম অর্জন করা এবং হাওযায়ে ইলমিয়ার পরীক্ষিত দরস-তাদরিস পদ্ধতি অনুসরণ করা।
তিনি হাওযার প্রচলিত মুতালাআ, তাকরার, বাহাসে ইলমি ও দারসের পূর্বপ্রস্তুতি অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, এসব ইলমি পদ্ধতির মাধ্যমেই অতীতে বহু মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকিহ ও মুজতাহিদ তৈরি হয়েছেন।
তিনি বলেন, হাওযা থেকে এমন উলামা তৈরি হওয়া প্রয়োজন, যাঁরা শুধু ইলমে পারদর্শী নন; বরং তাকওয়া, ইখলাস, আমল ও আখলাকের ক্ষেত্রেও অনুসরণীয়।
তাকওয়াবান আলেমই সমাজের প্রকৃত সম্পদ
আয়াতুল্লাহ শাব-জিন্দেদার বলেন, সমাজের প্রয়োজন এমন আলেম, যাঁরা মুত্তাকি, মুখলিস, দায়িত্বশীল ও জনগণের প্রতি দরদী। মানুষ যেন একজন আলেমের মধ্যে দুনিয়াবি স্বার্থের পরিবর্তে দ্বীন, উম্মাহ ও মানুষের কল্যাণের প্রতি আন্তরিকতা দেখতে পায়।
তিনি বলেন, একজন মুত্তাকি ও দায়িত্বশীল আলেম একটি বৃহৎ সমাজ বা প্রদেশের নৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
জিহাদের ময়দান ও ইলমের ময়দান—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় হাওযায়ে ইলমিয়ার ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সে সময় জিহাদের ময়দানে উপস্থিত হয়ে ইসলামি বিপ্লব ও দেশের প্রতিরক্ষায় অংশগ্রহণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। অনেক তালাবা ও আলেম এ দায়িত্ব পালনে এগিয়ে গিয়েছিলেন।
তবে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য এমন পরিকল্পনা প্রয়োজন, যাতে ময়দানে উপস্থিতি, ইসলামি নেযামের হেফাজত ও ইলমি তাহসিল—তিনটি বিষয় সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়।
তিনি বলেন, ইসলামী বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা ও সময়ের দাবি উপলব্ধি করার পাশাপাশি তালাবাদের ইলমি ভিত্তি দুর্বল করা যাবে না। কারণ শক্তিশালী ইলমি ভিত্তি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে দ্বীনের খেদমত ও উম্মাহর নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব নয়।
হাওযার ইতিহাস ও সমসাময়িক পরিস্থিতি জানতে হবে
অনুষ্ঠানে মাযান্দারানে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি ও সারি শহরের ইমাম জুমা হুজ্জাতুল ইসলাম মুহাম্মদী লায়িনী বলেন, হাওযায়ে ইলমিয়া হলো কিতাবুল্লাহ ও শরিয়তের আহকাম বোঝা এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মারকাজ।
তিনি তালাবাদের আত্মশুদ্ধি ও তাহযিবে নফস-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, আল্লাহ তায়ালা যাঁদের দ্বীনি ইলম অর্জন ও তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নির্বাচন করেছেন, তাঁদের জন্য এটি একই সঙ্গে বড় নিয়ামত ও বড় দায়িত্ব।
তিনি শহীদ উলামা ও তালাবাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে তাঁদের আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান।
সমসাময়িক ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান
মাযান্দারান হাওযা ইলমিয়ার পরিচালক হুজ্জাতুল ইসলাম সদরুল্লাহ ইসমাইলজাদেহ বলেন, তালাবায়ে কেরামের জন্য হাওযায়ে ইলমিয়ার ইতিহাসের পাশাপাশি সমসাময়িক ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করাও জরুরি।
তিনি বলেন, ইরানে ইসলামের আগমনের পর বিভিন্ন যুগে হাওযায়ে ইলমিয়া দ্বীনি ইলম সংরক্ষণ ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট, তামাক আন্দোলন, সাংবিধানিক আন্দোলন এবং ইসলামী বিপ্লবের সময় উলামায়ে কেরাম তাঁদের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়েও তালাবায়ে কেরামের দায়িত্ব হলো দ্বীন ও বিপ্লবের আদর্শ সম্পর্কে সচেতন থেকে সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকর ভূমিকা পালন করা।
তিনি আরও জানান, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজন বিবেচনায় বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আলেম তৈরির জন্য হাওযায়ে ইলমিয়া কাজ করছে। এর পাশাপাশি তাহযিব ও আখলাক, আত্মশুদ্ধি, আকিদা ও ফেরাকে বাতিলা বিষয়ে বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাওয়াত ও তাবলিগের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের শেষে ইলমি ও শিক্ষাক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জনকারী তালাবায়ে কেরাম এবং আসাতিযায়ে কেরামকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
আপনার কমেন্ট