হাওজা নিউজ এজেন্সি: পরিবারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন রেজা ইউসুফজাদে ‘দাম্পত্য জীবনের আবেগীয় উষ্ণতা ফিরিয়ে আনা’ বিষয়ে একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।
এক দম্পতি প্রশ্ন করেন, “আমাদের বিয়ের ১০ বছর হয়েছে। আমাদের দুই সন্তান রয়েছে। আমাদের জীবন বেশ গোছানো—দায়িত্ব ভাগ করা, সন্তানদের বিভিন্ন ক্লাসে পাঠানো, কিস্তি পরিশোধ এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম—সবই ঠিকঠাক চলছে। কিন্তু আমাদের সম্পর্কে এখন আর কোনো আবেগ বা উচ্ছ্বাস নেই। দীর্ঘদিন ধরে আমরা দুজন একান্তে বসে দীর্ঘ সময় কথাও বলিনি। মনে হয়, আমরা যেন শুধু একই বাড়িতে বসবাসকারী দুজন মানুষ। কীভাবে আমরা আমাদের দাম্পত্য জীবনের ভালোবাসা, আবেগ ও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে পারি?”
এ ধরনের পরিস্থিতি অনেক পরিবারেরই অভিজ্ঞতার অংশ হতে পারে। কখনো কখনো স্বামী-স্ত্রীর মনে হয়, তারা একে অপরের কাছে অতিরিক্ত পরিচিত ও অভ্যস্ত হয়ে গেছেন এবং দাম্পত্য জীবন একঘেয়ে হয়ে পড়েছে। তারা কেবল দৈনন্দিন দায়িত্ব ও রুটিন কাজগুলো সম্পন্ন করে চলেছেন। ফলে দাম্পত্য জীবন অনেকটা একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মতো হয়ে যেতে পারে।
তবে এ ধরনের সম্পর্কে ভালোবাসা, আগ্রহ ও আবেগের উষ্ণতা আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে মূল পরিবর্তনটি হলো ভালোবাসা ও আবেগ প্রকাশের মাত্রা কমে যাওয়া। তাই ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও ঘনিষ্ঠতা প্রকাশের অভ্যাসগুলো নতুন করে গড়ে তুললে সম্পর্কের উষ্ণতাও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এ পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভালোবাসা ও আবেগ প্রকাশের আচরণে ফিরে আসা।
দাম্পত্য জীবনের আচরণকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
১. দায়িত্বমূলক বা রুটিন আচরণ: এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক দায়িত্ব পালন, সন্তানদের লালন-পালন, ঘরের কাজ এবং অন্যান্য দৈনন্দিন দায়িত্ব। এসব আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য। এগুলোর ঘাটতি হলে দাম্পত্য সম্পর্কে গুরুতর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে।
২. ভালোবাসা ও আবেগ প্রকাশের আচরণ: এর মধ্যে রয়েছে ভালোবাসা, অনুভূতি, আবেগ ও আন্তরিকতার প্রকাশ। অনেক দম্পতি এই দিকটিকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেন। অথচ এসব আচরণ বাড়ানো গেলে দাম্পত্য জীবনে হারিয়ে যাওয়া ঘনিষ্ঠতা ও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
ভালোবাসা ও আবেগ ফিরিয়ে আনতে ৩টি করণীয়:
বিভিন্নভাবে ধীরে ধীরে ভালোবাসা প্রকাশ করুন
পরিবর্তনের সূচনা নিজের কাছ থেকেই করুন। একে অপরের প্রশংসা করুন, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন এবং ভালোবাসার কথা বলুন।
একসঙ্গে সময় কাটান, পরস্পরকে সহযোগিতা করুন এবং যৌথভাবে কিছু করার সুযোগ তৈরি করুন। যেমন—একসঙ্গে কেক বানানো, পার্কে বা পিকনিকে যাওয়া কিংবা স্বল্প সময়ের জন্য কোথাও ঘুরতে যাওয়া।
ছোট ছোট কিন্তু ধারাবাহিক উদ্যোগ দাম্পত্যের আবেগীয় বন্ধনকে শক্তিশালী করে এবং ভালোবাসা প্রকাশের সুযোগ বাড়ায়।
প্রতিদিন ছোট ছোট কিন্তু ধারাবাহিকভাবে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটান
প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট মোবাইল, প্রযুক্তি ও অন্যান্য ব্যস্ততা থেকে দূরে থেকে একান্তে কথা বলুন। দিনের বিভিন্ন সময়ে ছোট ও ভালোবাসাপূর্ণ বার্তা পাঠাতে পারেন। বার্তাটি খুব সাধারণ হলেও সমস্যা নেই।
এ ছাড়া ছোট ছোট প্রতীকী উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, আপনার সঙ্গী যদি কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা আইসক্রিম পছন্দ করেন, তা মাঝে মাঝে তার জন্য নিয়ে আসতে পারেন।
এসব ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে দুজনের মধ্যেই ‘আমি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং সে আমাকে গুরুত্ব দেয়’—এমন অনুভূতি তৈরি হয়।
নিয়মিত আবেগীয় মুহূর্ত ও যৌথ রীতি তৈরি করুন:
দুজনের মধ্যে আবেগীয় সংযোগ বাড়াতে ছোট ও নিয়মিত কিছু কর্মসূচি নির্ধারণ করুন। যেমন—প্রতি বৃহস্পতিবার ৫ থেকে ১০ মিনিট একান্তে কথা বলা কিংবা সন্তানদের ছাড়া পার্কে কিছুক্ষণ হাঁটতে যাওয়া।
এ ছাড়া একসঙ্গে পুরোনো স্মৃতি স্মরণ করতে পারেন। পুরোনো ছবি দেখা, দাম্পত্য জীবনের শুরুর দিকের স্মৃতিচারণ করা কিংবা আনন্দের মুহূর্তগুলো নিয়ে আলোচনা করা ইতিবাচক অনুভূতি ও পারস্পরিক বন্ধনকে শক্তিশালী করতে পারে।
ছোট কিন্তু অর্থবহ মুহূর্ত তৈরিতে সৃজনশীল হোন। নিজেদের পরিস্থিতি ও পছন্দ অনুযায়ী নতুন নতুন উদ্যোগ নিলে দাম্পত্য জীবনে আবারও আনন্দ ও আবেগের উচ্ছ্বাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
দাম্পত্য জীবনের দৈনন্দিন দায়িত্ব ও রুটিন অবশ্যই পালন করতে হবে। তবে এর পাশাপাশি ভালোবাসা ও আবেগ প্রকাশের ছোট ছোট কিন্তু ধারাবাহিক উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি।
মূল বিষয় হলো—স্বামী-স্ত্রী যেন শুধু দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া ‘সহকর্মী’ হয়ে না থাকেন; বরং আবারও জীবনসঙ্গী ও আবেগীয় অংশীদার হিসেবে একে অপরের কাছে ফিরে আসেন।
ছোট ছোট ধারাবাহিক উদ্যোগই দাম্পত্য জীবনের হারিয়ে যাওয়া ঘনিষ্ঠতা, ভালোবাসা ও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে পারে।
আপনার কমেন্ট