বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১০:৫৭
জাদু ও মন্ত্রের প্রভাব: আল্লাহ কি এর অনুমতি দিয়েছেন?

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—যদি সব ক্ষমতার মালিক আল্লাহ এবং তিনি তাঁর বান্দাদের ক্ষতি হওয়ায় সন্তুষ্ট না হন, তাহলে কিছু জাদুকর বা মন্ত্রপাঠকারী কীভাবে জিনের সাহায্যে অন্যের ক্ষতি করতে পারে? এর উত্তর পেতে মানুষের ক্ষমতা, জিনের ক্ষমতা এবং আল্লাহর ইচ্ছার মধ্যকার সম্পর্কটি সঠিকভাবে বোঝা প্রয়োজন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মানুষের জীবনে জাদু ও মন্ত্রের প্রভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে জিনের সঙ্গে জাদুর সম্পর্ক এবং এর মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করার বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা যায়।

আল্লাহর অনুমতি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি এক বিষয় নয়
এ বিষয়ে প্রথমেই ‘আল্লাহর অনুমতি’ এবং ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি’—এই দুটি বিষয়কে আলাদা করে বুঝতে হবে। কারণ, কোনো ঘটনা আল্লাহর নির্ধারিত বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে সংঘটিত হওয়া মানেই এই নয় যে, আল্লাহ সেই কাজকে পছন্দ করেন।

পৃথিবীতে এমন অনেক অন্যায় কাজ ঘটে, যেগুলো আল্লাহ পছন্দ করেন না। কিন্তু মানুষকে তিনি ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীনতা দিয়েছেন। ফলে মানুষ ভালো কিংবা মন্দ—উভয় ধরনের কাজ করার সুযোগ পায় এবং নিজের কাজের জন্য জবাবদিহিও করে।

যেমন, আল্লাহ মানুষকে কথা বলার ক্ষমতা দিয়েছেন। কিন্তু মানুষ সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিতে কিংবা অন্যকে কষ্ট দিতে পারে। আল্লাহ অবশ্যই অপবাদ ও অন্যায়কে পছন্দ করেন না। তবে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা থাকার কারণেই তাকে কাজ করার সক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

কোরআনের আলোকে জাদুর প্রভাব
কোরআনে জাদুর প্রসঙ্গে এর প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো শক্তিই আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না।

আল্লাহ বলেন,

وَمَا هُم بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ

“তারা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া এর মাধ্যমে কারও ক্ষতি করতে পারে না।” —সূরা আল-বাকারা, ১০২

এখানে ‘আল্লাহর অনুমতি’ বলতে জাদুকরের কাজের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি বোঝানো হয়নি। বরং এর অর্থ হলো—সৃষ্টিজগতের কোনো শক্তিরই আল্লাহর বাইরে স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্ষমতা নেই।

জাদুকর, জিন, মানুষ কিংবা কোনো প্রাকৃতিক উপাদান—কোনোটিই আল্লাহর ক্ষমতার সমকক্ষ নয়। কোনো কিছুর মাধ্যমে কোনো প্রভাব সৃষ্টি হলেও তা আল্লাহ নির্ধারিত বিশ্বব্যবস্থার সীমার মধ্যেই ঘটে।

একটি সহজ উদাহরণ
বিষয়টি আগুনের উদাহরণ দিয়ে সহজেই বোঝা যায়। আগুনের মধ্যে পোড়ানোর ক্ষমতা আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়, তাহলে এই কাজের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট—এমনটি বলা যাবে না।

অর্থাৎ, কোনো ঘটনা ঘটার সুযোগ থাকা আর সেই কাজের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকা এক বিষয় নয়।

একইভাবে কেউ যদি জাদু করে বা জিনের সাহায্যে অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাহলে তার কাজ আল্লাহর পছন্দনীয় নয়। বরং সে তার ইচ্ছা ও কর্মের অপব্যবহারের জন্য দায়ী।

মুমিনের করণীয় কী?
এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, আল্লাহ মানুষকে এসব আশঙ্কা ও ক্ষতির সামনে অসহায় করে রাখেননি। কোরআন ও ইসলামী বর্ণনায় আল্লাহর প্রতি মনোযোগ, তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা এবং বিভিন্ন মাসনুন দোয়া ও জিকিরের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন মাসনুন দোয়া ও আমলও রয়েছে, যার মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর ওপর ভরসা করতে এবং সব ধরনের অশুভতা থেকে তাঁর আশ্রয় চাইতে পারে।

সুতরাং, জাদু বা জিনের বিষয়কে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত ভয় ও আতঙ্কে না ভুগে একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা, তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং কুসংস্কার ও প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকা। কারণ কোনো সৃষ্টিই আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে স্বাধীনভাবে মানুষের ক্ষতি করতে পারে না।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha