হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,
মজিদুল ইসলাম শাহ
উত্তর:
ইমাম হাসান আসকারি (আ.) এমন এক পরিস্থিতিতে ইমামতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যখন আব্বাসীয় খেলাফতের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর কঠোর চাপ ও নজরদারি অব্যাহত ছিল। তিনি ভালোভাবেই জানতেন যে তাঁর পর তাঁর পুত্র হযরত মাহদি (আ.)-কে ইমামতের পতাকা বহন করতে হবে। কিন্তু দমন-পীড়নের পরিবেশ এবং তাঁর সন্তানের জীবন নিয়ে বিদ্যমান হুমকির কারণে, হযরত মাহদি (আ.)-এর ইমামত সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং শিয়াদের গায়বত মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে তাঁকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছিল। এসব পদক্ষেপকে কয়েকটি প্রধান ক্ষেত্রে আলোচনা করা যায়:
১. ওকালাত ও প্রতিনিধিদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ
ইমাম আসকারি (আ.)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ওকালাতের যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণ। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের বিশিষ্ট শিয়া ব্যক্তিত্বদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করে শিয়াদের সঙ্গে ইমামতের কেন্দ্রের যোগাযোগ বজায় রাখেন। এই নেটওয়ার্কের শীর্ষে ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে উসমান উমরি, যিনি পরবর্তীতে ইমাম মাহদি (আ.)-এর গায়বতে সুগরা বা ছোট গায়বতের সময় দ্বিতীয় বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবেও পরিচিত হন।
ওকালাতের প্রতিনিধিরা শরয়ি অর্থ ও সম্পদ সংগ্রহের পাশাপাশি শিয়াদের ধর্মীয় ও শরয়ি প্রশ্নের উত্তর দিতেন এবং ইমামের বার্তা বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দিতেন। ইমাম চিঠিপত্রের মাধ্যমেও শিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। এ ধরনের কিছু চিঠির উদাহরণ-যেমন কোম ও আভেহর শিয়াদের উদ্দেশে লেখা চিঠি-ঐতিহাসিক গ্রন্থে সংরক্ষিত হয়েছে।[১]
২. গোপন রাজনৈতিক কার্যক্রম
আব্বাসীয় খেলাফতের কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও ইমাম আসকারি (আ.) গোপনে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর ঘনিষ্ঠ সাহাবি উসমান ইবন সাঈদ উমরি তেল বিক্রেতার ছদ্মবেশে কাজ করতেন। শিয়ারা শরয়ি অর্থ ও সম্পদ তেলের পাত্রের মধ্যে রেখে তাঁর কাছে জমা দিতেন, যাতে তিনি তা ইমামের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন।[২]
এই গোপনীয়তার কারণে ইমাম আব্বাসীয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ না করেই শিয়াদের সংগঠিত ও পরিচালনা করতে সক্ষম হন।
৩. শিয়াদের আর্থিক সহায়তা
ইমামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল শিয়াদের, বিশেষত তাঁর বিশেষ ও ঘনিষ্ঠ সাহাবিদের আর্থিক সহায়তা প্রদান। তিনি তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করে তাঁদের আব্বাসীয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল হওয়া এবং তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আকৃষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করতেন। এর ফলে শিয়াদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিও শক্তিশালী হয়েছিল।[৩]
৪. পথনির্দেশে অদৃশ্য জ্ঞানের ব্যবহার
ইমাম আসকারি (আ.) বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিয়াদের পথনির্দেশ এবং তাঁদের সংশয় দূর করার জন্য তাঁর অদৃশ্য জ্ঞান ব্যবহার করেছেন। ভবিষ্যৎ বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে তাঁর পূর্বাভাস-যেমন আব্বাসীয় খলিফা মু‘তাযের নিহত হওয়ার সংবাদ তার সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রদান করা-তাঁর উচ্চ মর্যাদার পরিচায়ক এবং শিয়াদের বিশ্বাস সুদৃঢ় করার একটি মাধ্যম ছিল।[৪]
এ ছাড়া তিনি কিছু কারামত প্রকাশ এবং অদৃশ্য বিষয়সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর নিজের এবং তাঁর সন্তানের ইমামত সম্পর্কে শিয়াদের আস্থা আরও বৃদ্ধি করেন।
৫. হযরত মাহদি (আ.)-কে উত্তরসূরি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া
ইমাম আসকারি (আ.) বিভিন্ন সময়ে তাঁর পুত্রকে বিশেষ শিয়াদের কাছে পরবর্তী ইমাম ও উত্তরসূরি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। যেমন, বর্ণনায় এসেছে:
«هذا صاحبکم بعدی» “এ ব্যক্তি আমার পরে তোমাদের নেতা/অভিভাবক।”
এবং: «ابنی محمد هو الإمام الحجة بعدی» “আমার পুত্র মুহাম্মদ আমার পর ইমাম ও হুজ্জত।”
এসব বক্তব্য বিভিন্ন সূত্রে সংরক্ষিত হয়েছে।[৫]
তবে সন্তানের জীবন যাতে বিপদের মুখে না পড়ে, সে জন্য তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সামনে তাঁর পরিচয় প্রকাশ করতেন।
৬. শিয়াদের গায়বতের যুগের জন্য প্রস্তুত করা
ইমাম আসকারি (আ.) ধীরে ধীরে শিয়াদের গায়বতের ধারণার সঙ্গে পরিচিত করছিলেন এবং তাঁদের ইমাম মাহদি (আ.)-এর গায়বতের যুগের জন্য প্রস্তুত করছিলেন।
তিনি শিয়াদের সঙ্গে নিজের সরাসরি যোগাযোগ সীমিত করে বিভিন্ন দায়িত্ব প্রতিনিধিদের ওপর অর্পণ করেন। এর মাধ্যমে শিয়ারা এমন এক পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে গায়বতের যুগে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে। এই পদ্ধতি প্রথমে গায়বতে সুগরা এবং পরবর্তীতে গায়বতে কুবরা মেনে নেওয়ার জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে।[৬]
৭. শাহাদাতের পরবর্তী সংকটের পূর্বানুমান ও ব্যবস্থাপনা
ইমাম আসকারি (আ.) শিয়াদের সতর্ক করেছিলেন যে তাঁর শাহাদাতের পর তাদের মধ্যে বিভেদ ও মতবিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। তিনি তাঁর পুত্রের পরিচয় তুলে ধরে এবং তাঁর প্রতি অবিচল থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করে শিয়াদের ঐক্য সংরক্ষণের ভিত্তি তৈরি করেন।
একই সঙ্গে ওয়াকিফিয়া এবং জাফর আল-কাযযাব-এর মতো বিচ্যুত ধারাগুলোর ব্যাপারেও তিনি শিয়াদের সতর্ক করে দেন।[৭]
উপসংহার
ইমাম হাসান আসকারি (আ.) ব্যাপক সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, আর্থিক সহায়তা প্রদান, বিচক্ষণতার সঙ্গে তাকিয়্যা অবলম্বন, তাঁর পুত্র হযরত মাহদি (আ.)-কে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং শিয়াদের মানসিক ও চিন্তাগতভাবে প্রস্তুত করার মাধ্যমে তাঁর ইমামত সুপ্রতিষ্ঠিত করার এবং গায়বতের যুগের জন্য শিয়াদের প্রস্তুত করার প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করেন।
এই বিচক্ষণ পদক্ষেপগুলোর ফলে তাঁর শাহাদাতের পর সৃষ্ট বিভিন্ন সংকট সত্ত্বেও শিয়া সমাজ তার পথ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয় এবং গায়বতের যুগেও তার স্বতন্ত্র পরিচয় ও বিশ্বাস সংরক্ষণ করতে পারে।
তথ্যসূত্র
[১] তারিখে কোম, পৃ. ২২১; তুহাফুল উকুল, পৃ. ৪৮৬।
[২] আল-গায়বাহ, পৃ. ২১৪।
[৩] আল-ইরশাদ, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৩; মানাকিব, খণ্ড ৪, পৃ. ৪৩৯।
[৪] কাশফুল গুম্মাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৯১৬।
[৫] আল-ইরশাদ, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৮; কামালুদ্দীন, খণ্ড ২, পৃ. ৪০৯।
[৬] সিরায়ে পিশভায়ান, পৃ. ৬১৫–৬৬২।
[৭] কামালুদ্দীন, খণ্ড ২, পৃ. ৪০৮।
আপনার কমেন্ট