হাওজা নিউজ এজেন্সি: কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সময় কিংবা ব্যক্তিগত কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া ও শরীর কাঁপা কেবল সাময়িক কোনো ঘটনা নয়; এর পেছনে ‘পরিস্থিতিগত উদ্বেগ’ কাজ করতে পারে। তবে কিছু সহজ মনস্তাত্ত্বিক কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে এই নিয়ন্ত্রণহীন মানসিক চাপকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
প্রশ্ন:কিছুদিন ধরে কর্মক্ষেত্রে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বা ব্যক্তিগত কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকলে অনিচ্ছাকৃতভাবে আমার শরীর কাঁপতে শুরু করে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় এই কাঁপুনি আরও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং কথা বলাও আমার জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করার সময়ও কখনো কখনো আমার মধ্যে এ ধরনের অবস্থা দেখা দেয়। মনে হয়, আমি যেন বাস্তবে সেই স্থানেই উপস্থিত রয়েছি, যে স্থান সম্পর্কে তখন পড়ছি।
আমি নিজেও জানি, এই অবস্থার পেছনে ভয় কাজ করছে না; কিন্তু এর কারণ কী, তা বুঝতে পারছি না।
উত্তর: আপনার বর্ণিত সমস্যাগুলো পর্যালোচনা, ব্যাখ্যা ও এর কারণ অনুসন্ধান করলে প্রথম এবং প্রধান যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো প্রকাশ্য ও সুপ্ত মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ধীরে ধীরে আপনি এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
উদ্বেগ ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে করণীয়
১. প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—সাধারণত মানুষ নতুন কোনো পরিবেশে প্রবেশ করলে অথবা জীবনের এমন কোনো নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে, যার সম্পর্কে তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম, তখন কিছুটা মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতা অনুভব করে। সময়ের সঙ্গে নতুন পরিবেশ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাড়ার পাশাপাশি সেগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণও প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ ধীরে ধীরে কমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। তাই এ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার পরিচিতি ও অভিজ্ঞতা বাড়লে উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতাও কমে আসবে।
২. উদ্বেগ ও মানসিক চাপ দ্রুত কমানোর জন্য সমস্যাটির কারণ যথাযথভাবে চিহ্নিত করুন। কারণগুলো শনাক্ত করার পর চিন্তা করুন—এই উদ্বেগ ও মানসিক চাপ দূর করতে কী করা প্রয়োজন ছিল অথবা এখন কী করা সম্ভব। সমস্যার সমাধানের উপায় এবং জীবনে নিজের সক্ষমতা ও সামর্থ্যের প্রতি মনোযোগ দিলে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ কমবে এবং সমস্যাগুলো আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
৩. কিছু অনুশীলন ও কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে উদ্বেগ কমিয়ে তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে—
• গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস: কয়েক সেকেন্ড ফুসফুসে বাতাস ধরে রাখুন। এরপর ধীরে ধীরে ১০ পর্যন্ত গুনে বাতাস ছেড়ে দিন।
• শরীর শিথিলকরণ বা রিল্যাক্সেশন: এ বিষয়ে লেখা বইয়ের সাহায্যে অথবা কোনো মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শকেন্দ্রে গিয়ে এ কৌশল শেখা যেতে পারে।
• আনন্দদায়ক ও পছন্দের ব্যায়াম: হাঁটা, সাঁতার, পাহাড়ে হাঁটা, প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো ইত্যাদি কার্যক্রম উদ্বেগ অনেকাংশে কমাতে সহায়তা করতে পারে।
৪. ইতিবাচক চিন্তা ও চিন্তা নিয়ন্ত্রণ উদ্বেগ থেকে বেরিয়ে আসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়। চিন্তা নিয়ন্ত্রণের একটি পদ্ধতি হলো—তীব্র উদ্বেগ ও মানসিক চাপ অনুভূত হলে সচেতনভাবে নিজের চিন্তার গতিপথ পরিবর্তন করা। অর্থাৎ নেতিবাচক ও উদ্বেগ সৃষ্টিকারী চিন্তার ধারায় মনকে প্রবাহিত হতে না দিয়ে অন্য কোনো বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া।
যেমন—কাজ ও প্রচেষ্টা, পড়াশোনা, কোনো উপন্যাস পড়া, গণিতের কোনো সমস্যা সমাধান করা কিংবা খোলা বাতাসে হাঁটাহাঁটি করার দিকে মনোযোগ দেওয়া। এর মাধ্যমে নেতিবাচক চিন্তাকে মনে প্রবেশের সুযোগ কমানো যায়। এটি চিন্তার গতিপথ পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি।
৫. ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও হতাশা মোকাবিলার অন্যতম উপায় হলো দোয়া করা এবং মহান আল্লাহর সঙ্গে মোনাজাত ও প্রার্থনায় মনোনিবেশ করা। কারণ মহান আল্লাহ এমন সব মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাবান, যারা নিজেদের কথা বা ক্ষমতার মাধ্যমে আমাদের পার্থিব ও মানসিক সমস্যাগুলো দূর করার সামর্থ্য রাখে। তাই সমস্যা মোকাবিলায় মহান আল্লাহর ওপর নির্ভর করা এবং তাঁর কাছে মোনাজাত ও প্রার্থনা করা উদ্বেগ, নেতিবাচক চিন্তা ও হতাশা কমাতে সহায়তা করে।
৬. উপরোক্ত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করেও যদি উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণে না আসে এবং এসব উপসর্গ অব্যাহত থাকে, তাহলে অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীর সরাসরি পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের উদ্বেগজনিত সমস্যার অস্তিত্ব রয়েছে এবং প্রতিটি সমস্যার জন্য রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি। এসব চিকিৎসার কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে ব্যক্তির মানসিক অবস্থা যথাযথভাবে মূল্যায়ন এবং একজন দক্ষ মনোবিজ্ঞানীর মাধ্যমে সমস্যার মূল কারণ সঠিকভাবে চিহ্নিত করার ওপর।
সূত্র: জাতীয় ধর্মীয় প্রশ্নোত্তর কেন্দ্র
আপনার কমেন্ট