হাওজা নিউজ এজেন্সি: কুরআনের শিক্ষায় তাওয়াক্কুল একটি প্রাণসঞ্চারী ও উদ্দীপনামূলক ধারণা, যা মানুষকে কর্ম, সচেতনতা ও সাহসের পথে পরিচালিত করে। অর্থাৎ, বান্দার দায়িত্ব হলো নিজের কর্তব্য পালন করা; আর ভবিষ্যৎ ও পরিণতির বিষয় আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করা। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে একদিকে অলসতা ও দায়িত্বহীনতা থেকে এবং অন্যদিকে অহংকার ও হতাশা থেকে রক্ষা করে।
তাওয়াক্কুলের সঠিক অর্থ
তাওয়াক্কুল হলো আল্লাহর প্রতি অন্তরের আস্থা ও নির্ভরতা। তাওয়াক্কুলকারী ব্যক্তি বিশ্বাস করেন, আল্লাহই প্রকৃত কার্যকরী শক্তি। তাই তিনি প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ ব্যবহার করেন, কিন্তু সেগুলোকে আল্লাহর থেকে স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করেন না।
মানুষকে আল্লাহর দেওয়া সামর্থ্য ও সুযোগ কাজে লাগিয়ে সঠিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য চেষ্টা করতে হবে। তাই তাওয়াক্কুল চেষ্টার বিকল্প নয়, আবার চেষ্টার বিপরীতও নয়; বরং এটি চেষ্টার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে সঠিক করে।
চেষ্টা ও উপায়-উপকরণের গুরুত্ব
সৃষ্টিজগতে বিভিন্ন উপায় ও কারণের মাধ্যমে ফলাফল অর্জিত হয়। এসব উপায় ব্যবহার করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; কারণ এই কার্যকারণ ব্যবস্থা আল্লাহই প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন, “আল্লাহ কোনো বিষয়কে তার উপায় ছাড়া সংঘটিত করতে অস্বীকার করেছেন। তাই তিনি প্রতিটি বিষয়ের জন্য একটি উপায় নির্ধারণ” করেছেন...
এমনকি মানুষের নিজের চেষ্টাও আল্লাহর নির্ধারিত ব্যবস্থার একটি উপায়। তাই মানুষকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করতে হবে এবং নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে। তবে উপায়-উপকরণকে স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী মনে করা যাবে না।
চেষ্টা ছাড়া তাওয়াক্কুল
তাওয়াক্কুল যদি চেষ্টা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে তা অলসতা, নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্ব পরিত্যাগের কারণ হতে পারে। কেউ কেউ নিজেদের দায়িত্ব পালন না করার অজুহাত হিসেবে তাওয়াক্কুলকে ব্যবহার করেন। অথচ ইসলামের শিক্ষা এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
ইসলাম মানুষকে দায়িত্বশীল ও কর্মমুখী হতে শিক্ষা দেয়। কুরআনিক তাওয়াক্কুল মানুষকে বসে থাকার শিক্ষা দেয় না; বরং ভয় ও সংকটের মধ্যেও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে দায়িত্ব পালনের সাহস জোগায়।
এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “কেউ কেউ নিজেদের দায়িত্ব পালন না করার এবং নেতিবাচক নিষ্ক্রিয়তাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য তাওয়াক্কুলকে আঁকড়ে ধরে। অথচ কুরআনের আলোকে তাওয়াক্কুলের সঠিক অর্থ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলাম জীবনমুখী ধর্ম এবং এর শিক্ষা মানুষকে কর্ম, সচেতনতা ও সক্ষমতার দিকে আহ্বান জানায়। কুরআনে তাওয়াক্কুল একটি প্রাণসঞ্চারী ও উদ্দীপনামূলক ধারণা। যখন মানুষকে কর্মে উদ্বুদ্ধ করতে এবং ভয় দূর করতে চায়, তখন তাকে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এগিয়ে যেতে বলা হয়।”
অতএব, তাওয়াক্কুলের নামে নিষ্ক্রিয় থাকা ইসলামী শিক্ষার সঠিক ব্যাখ্যা নয়।
তাওয়াক্কুল ছাড়া চেষ্টা
অন্যদিকে, শুধু নিজের চেষ্টা ও সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করাও সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়। মানুষ যদি মনে করে তার সাফল্য সম্পূর্ণভাবে তার নিজের প্রচেষ্টার ফল, তাহলে সাফল্যের সময় অহংকার এবং ব্যর্থতার সময় হতাশা ও অসহায়ত্ব তাকে গ্রাস করতে পারে।
তাওয়াক্কুল এই ভারসাম্য তৈরি করে। মানুষ তার দায়িত্ব পালন করবে, নিজের সামর্থ্য কাজে লাগাবে এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে; কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফল যে তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নয়, সেটিও মনে রাখবে।
চেষ্টা ও তাওয়াক্কুলের সমন্বয়
তাওয়াক্কুল ও চেষ্টার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে—
১. মানুষকে প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ ব্যবহার করতে হবে, তবে সেগুলোকে আল্লাহর থেকে স্বাধীন মনে করা যাবে না।
২. মানুষের শক্তি, সামর্থ্য, ইচ্ছাশক্তি ও চেষ্টা—সবই আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত এবং ফলাফল অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।
৩. মানুষকে পার্থিব ও পারলৌকিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে; আর যেসব বিষয় তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সেগুলোর ক্ষেত্রে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে হবে।
এ কারণে বলা হয়েছে, “তাওয়াক্কুল দায়িত্ব পালনের পর্যায়ের সঙ্গে নয়, বরং পরিণতি ও ভাগ্যের পর্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।” অর্থাৎ, বান্দা নিজের দায়িত্ব পালন করবে এবং ভবিষ্যৎ ও পরিণতির ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে।
সঠিক ভারসাম্য
তাওয়াক্কুল ও চেষ্টার সম্পর্ককে কয়েকটি বিষয়ের মাধ্যমে বোঝা যায়—
★ মানুষ চেষ্টা করবে, কিন্তু নিজের চেষ্টার ওপর অহংকার করবে না;
★ উপায়-উপকরণ ব্যবহার করবে, কিন্তু সেগুলোর ওপর অন্তরের নির্ভরতা স্থাপন করবে না;
★ সাফল্যের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, কিন্তু ফলাফলকে পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন মনে করবে না
★ব্যর্থ হলে নিজের ভুল ও দায়িত্ব পর্যালোচনা করবে, কিন্তু হতাশ হবে না;
★ সাফল্য এলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে এবং নিজেকে তাঁর মুখাপেক্ষীহীন মনে করবে না।
তাওয়াক্কুল ও চেষ্টা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি সঠিক ইসলামী জীবনদৃষ্টির পরিপূরক দুটি দিক। চেষ্টা হলো মানুষের দায়িত্ব, আর তাওয়াক্কুল হলো সেই চেষ্টার পথে আল্লাহর ওপর অন্তরের নির্ভরতা।
তাওয়াক্কুলের অর্থ উপায়-উপকরণ পরিত্যাগ করা নয়, আবার চেষ্টা করার অর্থ আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ভুলে যাওয়া নয়। মানুষকে নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে, সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় উপায় অবলম্বন করতে হবে। এরপর ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে।
সুতরাং ইসলামের শিক্ষা হলো—কর্মে চেষ্টা, সিদ্ধান্তে প্রজ্ঞা এবং অন্তরে তাওয়াক্কুল।
আপনার কমেন্ট