বৃহস্পতিবার ৮ অক্টোবর ২০২৬ - ১৫:৩৮
ইসলামি মাজহাবগুলোর দৃষ্টিতে তাকাত্তুফ (নামাজে হাত বাঁধা)

কব্‌জ (القبض) অর্থ হলো নামাজে এক হাতের ওপর অন্য হাত রেখে দাঁড়ানো। এটি একটি পরবর্তীকালে উদ্ভূত প্রথা (بدعة محدثة), যা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর প্রচলিত হয়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, তৃতীয় পর্ব:

দ্বিতীয়ত-কব্‌জ-কি একটি পরবর্তীকালে উদ্ভূত বিদআত?

কব্‌জ (القبض) অর্থ হলো নামাজে এক হাতের ওপর অন্য হাত রেখে দাঁড়ানো। এটি একটি পরবর্তীকালে উদ্ভূত প্রথা (بدعة محدثة), যা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর প্রচলিত হয়।

এই বিষয়ে আমাদের প্রধান ভিত্তি দুটি সহিহ হাদিস। এর একটি আহলুস সুন্নাহর সূত্রে এবং অপরটি ইমামিয়া শিয়া সূত্রে বর্ণিত।

এই দুটি হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং তাঁর আহলুল বাইত (আঃ)-এর নামাজের পদ্ধতিতে সাদল (السدل و الارسال)-অর্থাৎ দুই হাত স্বাভাবিকভাবে শরীরের দুই পাশে রেখে নামাজ আদায় করার রীতি-প্রচলিত ছিল।

প্রথম:-আবু হুমাইদ আস-সায়িদীর হাদিস:

              حديث أبي حميد الساعدي روى حديث أبي حميد الساعدي غير واحد من المحدّثين، ونحن نذكره بنص البيهقي، قال: أخبرنا أبو عبد اللّه الحافظ: فقال أبو حميد الساعدي:

             أنا أعلمكم بصلاة رسول اللّه صلَّى الله عليه وآله وسلَّم، قالوا: لِمَ، ما كنت أكثرنا له تبعاً، ولا أقدمنا له صحبة؟!

 قال: بلى، قالوا: فأعرض علينا، فقال:

كان رسول اللّه صلَّى الله عليه وآله وسلَّم إذا قام إلى الصلاة رفع يديه حتى يحاذي بهما مَنْكَبيه، ثم يكبّر حتّى يقرّ كل عضو منه في موضعه معتدلاً، ثم يقرأ، ثم يكبّر ويرفع يديه حتى يحاذي بهما منكبيه، ثم يركع ويضع راحتيه على ركبتيه، ثم يعتدل ولا ينصب رأسه ولا يقنع، ثم يرفع رأسه، فيقول: سمع اللّه لمن حمده، ثم يرفع يديه حتى يحاذي بهما منكبيه حتى يعود كل عظم منه إلى موضعه معتدلاً، ثم يقول:

 اللّه أكبر، ثم يهوي إلى الأرض فيجافي يديه عن جنبيه، ثم يرفع رأسه فيثني رجله اليسرى فيقعد عليها ويفتح أصابع رجليه إذا سجد، ثم يعود، ثم يرفع فيقول:

 اللّه أكبر، ثم يثني برجله فيقعد عليها معتدلاً حتى يرجع أو يقرّ كل عظم موضعه معتدلاً، ثم يصنع في الركعة الأُخرى مثل ذلك، ثم إذا قام من الركعتين كبّر ورفع يديه حتى يحاذي بهما منكبيه كما فعل أو كبّر عند افتتاح صلاته، ثم يصنع مثل ذلك في بقية صلاته، حتى إذا كان في السجدة التي فيها التسليم أخّر رجله اليسرى وقعد متورّكاً على شقّه الأيسر،

فقالوا جميعاً: صدَق هكذا كان يصلّي رسول اللّه صلَّى الله عليه وآله وسلَّم.

আবু হুমাইদ আস-সায়িদী-এর এই হাদিস একাধিক মুহাদ্দিস বর্ণনা করেছেন। এখানে আমরা ইমাম বায়হাকির বর্ণিত পাঠ অনুযায়ী হাদিসটি উল্লেখ করছি।

বায়হাকি বলেন, আবু আব্দুল্লাহ আল-হাফিজ আমাদের খবর দিয়েছেন যে, আবু হুমাইদ আস-সায়িদী বললেন:

«أنا أعلمكم بصلاة رسول الله صلَّى الله عليه وآله وسلَّم»

আমি তোমাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নামাজের পদ্ধতি সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত।

তখন উপস্থিত লোকেরা বললেন:

«لِمَ، ما كنت أكثرنا له تبعاً، ولا أقدمنا له صحبة؟!»

কেন? আপনি তো আমাদের মধ্যে তাঁর সবচেয়ে বেশি অনুসরণকারী ছিলেন না এবং আমাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন সাহচর্যও আপনার ছিল না!

তিনি বললেন:

«بلى»

“তা ঠিক।”

তারা বললেন:

«فأعرض علينا»

তাহলে আমাদের সামনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নামাজের পদ্ধতিটি বর্ণনা করুন।

তখন আবু হুমাইদ আস-সায়িদী (রা.) বললেন:

«كان رسول الله صلَّى الله عليه وآله وسلَّم إذا قام إلى الصلاة رفع يديه حتى يحاذي بهما منكبيه، ثم يكبّر حتى يقرّ كل عضو منه في موضعه معتدلاً، ثم يقرأ، ثم يكبّر ويرفع يديه حتى يحاذي بهما منكبيه، ثم يركع ويضع راحتيه على ركبتيه، ثم يعتدل ولا ينصب رأسه ولا يقنع، ثم يرفع رأسه، فيقول: سمع الله لمن حمده، ثم يرفع يديه حتى يحاذي بهما منكبيه حتى يعود كل عظم منه إلى موضعه معتدلاً...»

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন নামাজের জন্য দাঁড়াতেন, তখন তিনি তাঁর দুই হাত এতটুকু উঠাতেন যে তা তাঁর দুই কাঁধের সমান্তরাল হতো। এরপর তাকবির বলতেন এবং তাঁর শরীরের প্রতিটি অঙ্গ স্বাভাবিক ও স্থিরভাবে নিজ নিজ অবস্থানে স্থির হয়ে যেত।

এরপর তিনি কিরাআত পাঠ করতেন। তারপর তাকবির বলে আবার তাঁর দুই হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠাতেন। এরপর তিনি রুকু করতেন এবং দুই হাতের তালু হাঁটুর ওপর রাখতেন। তারপর তিনি পিঠ সোজা করে স্থিরভাবে দাঁড়াতেন; মাথা অতিরিক্ত উঁচু করতেন না এবং অতিরিক্ত নিচুও করতেন না।

এরপর তিনি মাথা উঠিয়ে বলতেন:

«سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ»

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রশংসা করে, আল্লাহ তার কথা শ্রবণ করেন।’

এরপর তিনি আবার তাঁর দুই হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠাতেন এবং এমনভাবে স্থির হয়ে দাঁড়াতেন যে তাঁর শরীরের প্রতিটি অস্থি নিজ নিজ অবস্থানে ফিরে আসত।

তারপর বলতেন:

«الله أكبر»

এরপর তিনি সিজদায় যেতেন এবং দুই হাত শরীরের দুই পাশ থেকে কিছুটা দূরে রাখতেন। তারপর মাথা উঠিয়ে বাম পা ভাঁজ করে তার ওপর বসতেন এবং সিজদার সময় পায়ের আঙুলগুলো প্রসারিত রাখতেন।

তাঁদের মতভেদের একটি কারণ হলো-রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নামাজের পদ্ধতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা এসেছে; কিন্তু এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায়নি যে, তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের ওপর রাখতেন।

এরপর একটি প্রশ্ন থেকে যায়। প্রসিদ্ধভাবে জানা যায় যে, মালিকি মাজহাব কব্‌জের পক্ষে নয় এবং তাঁদের ইমাম মালিকও এটিকে অপছন্দ করতেন। আল-মুদাওয়ানাহ-তে রয়েছে:

«كره مالك وضع اليد اليمنى على اليسرى في الفريضة وقال: لا أعرفه في الفريضة».

ইমাম মালিক ফরজ নামাজে ডান হাত বাম হাতের ওপর রাখাকে অপছন্দ করতেন। তিনি বলেন, ফরজ নামাজে আমি এটিকে (প্রচলিত) বলে জানি না।

অথচ ইমাম মালিক তাঁর আল-মুআত্তা গ্রন্থে কব্‌জ সম্পর্কিত একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি সাহল ইবন সা‘দ থেকে বর্ণনা করেন। পাশাপাশি আবদুল কারিম ইবন আবিল-মুখাররিক আল-বাসরির একটি মুরসাল বর্ণনাও উল্লেখ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে:

নবুওতের বাণীগুলোর অন্তর্ভুক্ত হলো: যখন তোমার লজ্জা নেই, তখন যা ইচ্ছা করো। আর নামাজে এক হাত অন্য হাতের ওপর রাখা—অর্থাৎ ডান হাত বাম হাতের ওপর রাখা; দ্রুত ইফতার করা এবং সাহরির খাবার গ্রহণে বিলম্ব করা।

[ আল-মুআত্তা, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫৮, باب وضع اليدين إحداهما على الأخرى في الصلاة, হাদিস ৪৬–৪৭।]

 যদি কোনো ব্যক্তি বলে ইমাম মালিক তার গ্রন্থে যে সব হাদিস বর্ণনা করেছেন তিনি তার ভিত্তিতে ফাতোয়াও দিয়েছে, তাই তিনি যদি হাত বাঁধা সম্পর্কে হাদিস বর্ণনা করে অর্থাৎ তার ভিত্তিতে তিনি মত গ্রহনও করেছেন।  এ প্রসঙ্গে বলা হবে যে, আল-মুআত্তা মূলত একটি বর্ণনাভিত্তিক হাদিসগ্রন্থ। তাই ইমাম মালিক কোনো হাদিস বর্ণনা করলেও তার ভিত্তিতে অবশ্যই ফতোয়া দিয়েছেন: এমনটি অপরিহার্য নয়। এ কারণেই আল-মুদাওয়ানাহ-তে ইমাম মালিকের এমন কিছু ফতোয়া পাওয়া যায়, যা আল-মুআত্তা-তে তাঁর বর্ণিত কিছু হাদিসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

যে ব্যক্তি ইমাম মালিকের ফিকহ সম্পর্কে অবগত, সে দেখতে পাবে যে, তাঁর লিখিত ফতোয়া ও আল-মুআত্তা-তে বর্ণিত হাদিসের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে।

এবং আবদুল হামিদ তাঁর রিসালাতুন মুখতাসারাহ ফিস-সাদল গ্রন্থে এর কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করেছেন।

সূত্র: রিসালাতুন মুখতাসারাহ ফিস-সাদল, পৃষ্ঠা ৬৭।

ইমাম মালিকের বক্তব্য:

«لا أعرفه في الفريضة»

“ফরজ নামাজে আমি এটিকে (প্রচলিত) বলে জানি না”-এটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, তাঁর সময়ের মদিনাবাসীদের আমল এর বিপরীত ছিল।  “আমি এটি জানি না”-বাক্যটির অর্থ হলো, তিনি সাহাবিদের কাছ থেকে জ্ঞান গ্রহণকারী তাবেয়িদের মধ্যে নামাজের ইমামদের প্রচলিত আমল হিসেবে এটিকে জানতেন না।

এটি ছিল রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নামাজের পদ্ধতি বর্ণনাকারী একটি হাদিস, যা আহলুস সুন্নাহর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।

দ্বিতীয় _ এবং ইমামিয়া শিয়া সূত্রে বর্ণিত হাম্মাদ ইবন ঈসার হাদিসেও হাত বাঁধার বিধান উল্লেখ নাই। হাম্মাদ ইবন ঈসা ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন:

«ما أقبح بالرجل أن يأتي عليه ستون سنة أو سبعون سنة فما يقيم صلاة واحدة بحدودها تامة»

কোনো মানুষের জন্য কতই না দুঃখজনক যে, তার বয়স ষাট কিংবা সত্তর বছর হয়ে যায়, অথচ সে একটি নামাজও তার নির্ধারিত বিধি-বিধানসহ পরিপূর্ণভাবে আদায় করতে পারে না।

হাম্মাদ বলেন, এতে আমি নিজের ভেতরে এক ধরনের লজ্জা ও অপমান অনুভব করলাম। তাই বললাম, আমি আপনার জন্য উৎসর্গিত হই, আমাকে নামাজ শিক্ষা দিন।

তখন আবু আব্দুল্লাহ (ইমাম জাফর সাদিক আঃ) কিবলামুখী হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তিনি তাঁর দুই হাত উরুর ওপর স্বাভাবিকভাবে ছেড়ে দিলেন, আঙুলগুলো একত্র করলেন এবং দুই পায়ের মাঝখানে প্রায় তিনটি ফাঁক রাখা আঙুলের সমপরিমাণ দূরত্ব রাখলেন। দুই পায়ের আঙুল কিবলামুখী রাখলেন এবং কিবলা থেকে সেগুলো বাঁকাননি। তিনি বিনয় ও একাগ্রতার সঙ্গে দাঁড়িয়ে বললেন:

«الله أكبر»

এরপর ধীর ও পরিমিতভাবে সূরা হামদ এবং «قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ» পাঠ করলেন। তারপর দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন-যতটুকু সময়ে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়া যায়।

এরপর দাঁড়ানো অবস্থায় বললেন:

«الله أكبر»

তারপর রুকুতে গেলেন এবং দুই হাতের তালু আঙুলগুলো কিছুটা ফাঁক করে হাঁটুর ওপর রাখলেন। হাঁটুগুলো কিছুটা পেছনের দিকে রাখলেন, যাতে তাঁর পিঠ সম্পূর্ণ সোজা থাকে। এমনকি তাঁর পিঠের ওপর এক ফোঁটা পানি বা তেল ঢালা হলেও তা স্থির পিঠের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ত না-এভাবে তিনি পিঠ সোজা রাখলেন। ঘাড় সোজা রাখলেন এবং চোখ বন্ধ করলেন।

এরপর ধীরস্থিরভাবে তিনবার বললেন:

«سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ وَبِحَمْدِهِ»

আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতা ও প্রশংসা ঘোষণা করছি।

চলবে....

অনুবাদ: হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা গোলাম মুস্তাফা নাজাফী

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha