হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, শহীদ আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনায়ীর নিজের জবানিতে এক অবিস্মরণীয় স্বপ্নের কাহিনি।
স্বপ্নের সূচনা
১৩৪৬ বা ১৩৪৭ হিজরি সৌরসাল (১৯৬৭ বা ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দ)। মাশহাদ শহরে অবস্থানকালে এক রাতে ভবিষ্যতের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনায়ী স্বপ্নে দেখলেন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য-হজরত ইমাম খোমেনি ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর জানাজা শায়িত আছে মাশহাদের একটি বাড়িতে, যা ছিল তাঁর পিতার বাড়ির সন্নিকটে।
এই শোকাবহ দৃশ্য দেখে তরুণ খামেনায়ীর হৃদয় তীব্র যন্ত্রণায় ভরে উঠল। স্বপ্নেই তিনি অনুভব করলেন গভীর শোক ও দুঃখের ভার।
জানাজার মিছিল: এক অদ্ভুত দৃশ্য
স্বপ্নে দেখলেন, বহু মানুষ জানাজায় শরিক হতে জমায়েত হয়েছে। তিনি নিজেও তাদের মাঝে ছিলেন। কফিনটি বাড়ি থেকে বের করে কাঁধে তোলা হলো। বিশাল জনসমাগম-যাদের মধ্যে অসংখ্য উলামা ও আলিম ছিলেন-মরদেহের পিছনে চলতে শুরু করল।
খামেনায়ী নিজেও সেই মিছিলে শামিল হলেন। তিনি উচ্চস্বরে কাঁদছিলেন, তীব্র বেদনায় নিজের হাঁটুতে হাত মারছিলেন। কিন্তু যা তাঁকে সবচেয়ে বেশি ব্যথিত করল-তিনি দেখলেন, কিছু উলামা যাঁদের চেহারা এখনও তাঁর স্মরণে আছে, তাঁরা কোনো মনোযোগ ছাড়াই, কোনো শিক্ষা না নিয়েই পরস্পরে কথা বলছেন এবং হাসছেন! এই দৃশ্য তাঁর শোক ও যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে দিল।
টিলার চূড়ায়: রহস্যময় পরিণতি
জানাজা শহরের শেষ প্রান্তে পৌঁছালে অধিকাংশ (যারা জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন) ফিরে গেলেন। কিন্তু জানাজা শহরের বাইরে তার পথ অব্যাহত রাখল। প্রায় বিশ-ত্রিশজন জানাজা অংশগ্রহণকারী-যাদের মধ্যে খামেনায়ীও ছিলেন-জানাজার পিছনে চলতে থাকলেন।
এরপর জানাজা একটি টিলায় পৌঁছাল। অধিকাংশ মানুষ টিলার নিচে থেকে গেলেন। মাত্র চার-পাঁচজন জানাজায় অংশগ্রহণকারী জানাজার সঙ্গে টিলার চূড়ায় উঠলেন-তাদের মধ্যে খামেনায়ীও ছিলেন।
টিলার উপরিভাগ নিচ থেকে ছোট দেখালেও, উপরে উঠলে তা বিস্তৃত মনে হয়। সেখানে কফিনটি রাখা হলো।
ইমামের অলৌকিক ইশারা
খামেনায়ী ইমাম খোমেনির চেহারা দেখতে দেখতে বিদায় জানানোর জন্য পায়ের কাছে গেলেন। কফিনে শায়িত ইমামের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ দেখলেন-ইমামের ডান হাত, যার তর্জনী ইশারার অবস্থায় ছিল, উপরে উঠছে!
তীব্র বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন তিনি। তারপর দেখলেন, ইমাম চোখ বন্ধ করে বসার জন্য নড়াচড়া শুরু করলেন। তাঁর তর্জনী ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো খামেনায়ীর কপালের দিকে-এবং তা স্পর্শ করল বা স্পর্শ করার উপক্রম হলো।
এরপর ইমাম তাঁর ঠোঁট খুললেন এবং ফারসি ভাষায় দুইবার বললেন:
"তুমি ইউসুফ হয়ে যাবে... তুমি ইউসুফ হয়ে যাবে!"
স্বপ্ন থেকে জাগরণ
খামেনায়ী এই স্বপ্নের সমস্ত বিবরণ মনে রেখে ঘুম থেকে জাগলেন। সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত এই স্বপ্ন তাঁর স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে আছে।
তিনি এই স্বপ্নের কথা অনেক আত্মীয় ও বন্ধুকে বললেন। তাদের মধ্যে ছিলেন তাঁর মা (রহ.)। মা সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিলেন: হ্যাঁ, তুমি ইউসুফ হবে-অর্থাৎ তুমি সর্বদা কারাগারে থাকবে!
কারাগার থেকে প্রেসিডেন্সি: ব্যাখ্যার পূর্ণতা
এই স্বপ্নের আরেকজন শ্রোতা ছিলেন শেখ জাওয়াদ হাফেজিয়ান, যাঁর সঙ্গে ১৩৪৯ সনে (১৯৭০ খ্রি.) মাশহাদ কারাগারে একই সেলে ছিলেন খামেনায়ী।
এরপর সময় বদলাল। ইসলামি বিপ্লব বিজয়ী হলো। আয়াতুল্লাহ খামেনায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন।
নির্বাচনের পর শেখ জাওয়াদ হাফেজিয়ান তাঁর কাছে এসে বললেন: প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন আমি মক্কায় ছিলাম-কারণ নির্বাচন হজের মৌসুমের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। যখন ইরানের হজ দলের ভোটকেন্দ্রের দিকে গেলাম, তখন আপনার সেই স্বপ্ন এবং আপনার মায়ের সেই ব্যাখ্যা আমার মনে পড়ে গেল। আমি কেঁদে ফেললাম-কারণ আমি বুঝলাম, বিষয়টি কেবল কারাগারে সীমাবদ্ধ ছিল না!
শিক্ষণীয় বিষয়
এই স্বপ্ন শুধু একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়-এটি ইতিহাসের এক গভীর প্রতীকী ঘটনা। ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনির সঙ্গে মিল রয়েছে: কারাগার, নির্বাসন, কষ্ট-তারপর আল্লাহর দেওয়া মর্যাদা ও নেতৃত্ব। শহীদ খামেনায়ীর জীবনও সেই পথেই অগ্রসর হয়েছে-কারাগারের অন্ধকার থেকে জাতির নেতৃত্বের শিখরে।
আপনার কমেন্ট