হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘ইকোসাইড: নীরব যুদ্ধাপরাধ’ শীর্ষক এক বিশেষজ্ঞ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে আরাকচি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, সশস্ত্র সংঘাতের সময় পরিবেশের ব্যাপক ও অপূরণীয় ক্ষতি মানবজাতির সামনে অন্যতম গুরুতর চ্যালেঞ্জ। এটি শুধু পরিবেশগত উদ্বেগের বিষয় নয়; বরং মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
যুদ্ধের নীরব শিকার পরিবেশ
আরাকচি বলেন, পরিবেশকে আর যুদ্ধের নীরব শিকার হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। যুদ্ধ শুধু মানুষের জীবন, শহর এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো ধ্বংস করে না; পানি, মাটি, বায়ু, বন, কৃষিজমি, জ্বালানি সম্পদ, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও জীববৈচিত্র্যও এর ধ্বংসাত্মক প্রভাবের শিকার হয়।
পানি ও মাটির সম্পদ ধ্বংস, বায়ুদূষণ, উদ্ভিদ ও বাস্তুতন্ত্রের বিনাশ এবং দূষণকারী পদার্থ, বর্জ্য ও বিপজ্জনক উপাদানের বিস্তার-এসবের প্রভাব যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর, এমনকি কয়েক দশক পরও অব্যাহত থাকতে পারে।
তিনি বলেন, পরিবেশ সমগ্র মানবজাতির অভিন্ন সম্পদ। এটি কোনো প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার কিংবা স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের বলি হতে পারে না।
আরাকচির ভাষায়, ব্যাপক পরিবেশ ধ্বংসের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে মৌলিক প্রশ্ন হলো-বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী বিনাশ, জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য সম্পদের দূষণ এবং প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতির মুখে কি শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করা যায়?
এর উত্তর স্পষ্ট: পরিবেশ সুরক্ষাকে ঘোষিত অঙ্গীকারের গণ্ডি পেরিয়ে কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ, জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।
গাজা, লেবানন ও ইরানে যুদ্ধের পরিবেশগত ক্ষতি
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাজা, লেবানন ও ইরানে সামরিক হামলার কারণে প্রাণহানি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি পরিবেশের ওপর গভীর এবং কখনো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে দেখা গেছে।
গাজার পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে পরিবেশগত বিপর্যয় এতটাই ব্যাপক যে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) নজিরবিহীন পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছে। পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার বিপর্যয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ক্ষতি, পানি ও মাটিদূষণ, উপকূল দূষণ এবং বিপুল পরিমাণ ধ্বংসস্তূপ ও সম্ভাব্য বিপজ্জনক উপাদান জমে থাকা-এসবের প্রভাব ফিলিস্তিনিদের জীবনে কয়েক দশক ধরে থেকে যেতে পারে।
লেবাননের প্রসঙ্গে আরাগচি বলেন, অস্ত্রের ব্যবহার ও হামলাজনিত অগ্নিকাণ্ডে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের বনভূমি ও কৃষিজমি ধ্বংস হয়েছে।
জাতিসংঘে উপস্থাপিত প্রতিবেদন ও নথিতে বিপুল পরিমাণ জমি পুড়ে যাওয়া এবং হাজার হাজার জলপাইগাছ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। তেল সংরক্ষণাগারে হামলার পর লেবাননের উপকূলে ব্যাপক দূষণের ঘটনাও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্মৃতিতে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইরানও এ ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে রেহাই পায়নি। ইরানের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলায় তেল, শোধনাগার ও জ্বালানিসংক্রান্ত স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় গুরুতর পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
আরাকচির বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি নিশ্চিত করেছিল যে, তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহর ও তার আশপাশের এলাকায় তেল স্থাপনাগুলো হামলার শিকার হয়। এসব স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ডের ফলে বিপজ্জনক রাসায়নিক যৌগ ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের দূষণ বায়ু থেকে মাটি ও পানিতে ছড়িয়ে খাদ্যশৃঙ্খলকেও প্রভাবিত করতে পারে।
তিনি বলেন, এসব ক্ষতিকে কেবল অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সামরিক হামলার ফলে মাটি ও পানিতে দীর্ঘস্থায়ী দূষণ, বন ধ্বংস, বায়ু ও সমুদ্রদূষণ এবং বিপজ্জনক বর্জ্য ও যুদ্ধাবশেষ সৃষ্টি হলে তার প্রভাব হামলার স্থান ও সময়সীমা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, আজ যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে বসবাসকারী কোনো শিশু হয়তো এমন একটি যুদ্ধের পরিবেশগত মূল্য আগামী কয়েক দশক ধরে বহন করবে, যে যুদ্ধে তার নিজের কোনো ভূমিকা ছিল না। এ কারণে শান্তি, নিরাপত্তা, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকর প্রয়োগের আহ্বান
আরাকচি বলেন, ইরানের দৃষ্টিতে যুদ্ধের সময় পরিবেশ ধ্বংস ও মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক আইন নীরব থাকতে পারে না।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বৈষম্য নির্ধারণের নীতি এবং সামরিক পদক্ষেপের আনুপাতিকতার নীতিসহ প্রাসঙ্গিক বিধানগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশের ওপর সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি এ ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রথমত, পরিবেশ ধ্বংসের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। কোনো রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা পক্ষই আন্তর্জাতিক দায়দায়িত্বের ঊর্ধ্বে নয়। বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস, প্রাকৃতিক আবাসস্থল বিনষ্ট, পানি ও মাটিদূষণ এবং পরিবেশের ওপর গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির ঘটনায় কার্যকর প্রতিরোধ, তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, ক্ষতিপূরণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ইকোসাইডকে স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে আইনগত ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনাকেও ইরান সমর্থন করে বলে তিনি জানান।
দ্বিতীয়ত, সশস্ত্র সংঘাতে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। যুদ্ধ শুধু মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় না; পানি, মাটি, বায়ু, কৃষি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব বহু বছর, এমনকি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে থাকতে পারে। শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস, বিপজ্জনক পদার্থের দূষণ এবং সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও ব্যাপক মূল্য তৈরি করে।
এর সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। তাই যুদ্ধের পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির স্বাধীন নথিভুক্তি, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন এবং ক্ষতিপূরণ ও পুনর্গঠনের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক উদ্যোগের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে হবে।
তৃতীয়ত, দ্বৈতনীতি ও পরিবেশের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করা। পরিবেশ সুরক্ষা কোনো কোনো দেশের জন্য বিশেষ সুবিধা আর অন্যদের জন্য বাধ্যবাধকতায় পরিণত হওয়া উচিত নয়। পরিবেশগত মানদণ্ড ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীনভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
একতরফা জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ এবং এমন বিধিনিষেধ, যা পরিবেশ সুরক্ষা, পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় অর্থ, প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম পাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে, সেগুলোর আন্তর্জাতিক আইনগত ও মানবিক-পরিবেশগত প্রভাবও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। উন্নয়নশীল দেশগুলো যেন অপ্রয়োজনীয় ও বৈষম্যমূলক বাধা ছাড়াই পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের প্রস্তাব
আরাগচি বলেন, বিশেষ করে সশস্ত্র সংঘাতের সময় পরিবেশের ব্যাপক ধ্বংস প্রতিরোধ ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে তিনি তিনটি বিষয়ে সহযোগিতা জোরদারের প্রস্তাব দেন:
১- পরিবেশের ব্যাপক ও গুরুতর ধ্বংস শনাক্তকরণ, মূল্যায়ন এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা ও সুস্পষ্ট মানদণ্ড তৈরি করা।
২- সশস্ত্র সংঘাতের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি নথিভুক্ত করতে বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গড়ে তোলা; পাশাপাশি প্রযোজ্য আইনগত দায়দায়িত্ব নির্ধারণ এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
৩- পরিবেশ ধ্বংস প্রতিরোধ, ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং সীমিত সম্পদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মুখোমুখি দেশ ও জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করার জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা।
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের সদস্য দেশগুলোর ৩১তম সম্মেলন -আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আগ্রাসী হামলার কারণে দেশগুলোর পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর সৃষ্ট ক্ষতিকর প্রভাবের দিকে আরও জোরালোভাবে আকৃষ্ট করার একটি উপযুক্ত সুযোগ।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা, জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করা, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া, পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষা করা।
বক্তব্যের শেষাংশে আরাগচি বলেন, ইরান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তার বৈজ্ঞানিক, আইনগত ও কূটনৈতিক সক্ষমতা কাজে লাগাতে প্রস্তুত। পরিবেশের ব্যাপক ধ্বংস প্রতিরোধ, আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা জোরদারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অংশ নিতেও দেশটি প্রস্তুত।
তিনি বলেন, আগ্রাসনকারীদের তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায় এড়িয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়। সম্মিলিত সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। প্রকৃতির আলোচনার টেবিলে কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে কথা বলার কোনো কণ্ঠস্বর নেই। মানবজাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংসের বিনিময়ে যেন প্রকৃতির এই নীরবতার মূল্য দিতে না হয়, তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।
আপনার কমেন্ট