শুক্রবার ১৬ অক্টোবর ২০২৬ - ১৯:৪৭
এক মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব: ইয়েমেনে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের অনিচ্ছাকৃত স্বীকারোক্তি সৌদি আরবের

ইয়েমেনের ময়দানে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, আনসারুল্লাহ সামরিক চাপকে সৌদি আরবের কাছ থেকে নিজেদের দাবি আদায়ের হাতিয়ারে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, সৌদি আরব এমন এক পরিস্থিতিতে সানাকে (ইয়েমেনের রাজধানী) এক মাসের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে, যখন সৌদি আরবের কৌশলগত ভূখণ্ডের গভীরে আনসারুল্লাহর সামরিক অভিযানের চাপ বেড়েছে এবং ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ফ্রন্টে রিয়াদপন্থী বাহিনীগুলো নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

একই সময়ে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেওয়া এবং সানা তা প্রত্যাখ্যান করলে হামলা আরও জোরদার করার হুমকি দেওয়ার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, রিয়াদ আনসারুল্লাহকে এক ধরনের বাধ্যতামূলক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে চায়। অর্থাৎ, তাদের হয় স্বল্প সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে হবে, নয়তো নতুন করে হামলার মুখোমুখি হতে হবে।

তবে মূল প্রশ্ন হলো, সৌদি আরব এখনো অতীতের সেই কৌশলগত হাতিয়ারগুলো ব্যবহার করে এমন ফলাফল অর্জন করতে চাইছে, যা দীর্ঘ বছর ধরে যুদ্ধ চালিয়েও অর্জন করতে পারেনি। যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা বদলে গেছে। এখন রিয়াদকেই সানার পরিবর্তিত সামরিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে নিজেদের হিসাব-নিকাশ সমন্বয় করতে হবে।

ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে আনসারুল্লাহর অগ্রগতি, তায়েজে সৌদিপন্থী বাহিনীর ওপর চাপ বৃদ্ধি এবং সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরগুলোতে হামলা-সাম্প্রতিক এসব ঘটনা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এগুলো বিবেচনায় না নিলে রিয়াদের বর্তমান পদক্ষেপের তাৎপর্য বোঝা সম্ভব নয়।

আনসারুল্লাহ ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে চাপের সঙ্গে সৌদি ভূখণ্ডের গভীরে পরিচালিত সামরিক অভিযানকে যুক্ত করতে পেরেছে। এর ফলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় আর শুধু ইয়েমেনের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং সৌদি আরবের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপরও সরাসরি প্রভাব পড়ছে।

সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে হামলার তাৎপর্য

সৌদি আরবের আরামকোর তেল স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলোতে হামলার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। জ্বালানি অবকাঠামো ও বিমান পরিবহনব্যবস্থা সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আঞ্চলিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এসব ব্যবস্থায় যেকোনো ধরনের বিঘ্ন যুদ্ধের প্রভাবকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধাহরান, রিয়াদ ও দাম্মামের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার মধ্য দিয়ে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, যুদ্ধের কেন্দ্র ইয়েমেনের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ রাখলেই সৌদি আরব সরাসরি এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না।

এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবকে রিয়াদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ নিয়ন্ত্রণের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আনসারুল্লাহর অভিযান অব্যাহত থাকলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এক মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব: ইয়েমেনে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের অনিচ্ছাকৃত স্বীকারোক্তি সৌদি আরবের

উত্তেজনা প্রশমনে আঞ্চলিক কূটনীতির ওপর নির্ভরতা

সৌদি আরবের কূটনৈতিক তৎপরতাও একই প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ওমানের মধ্যস্থতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি চীন, পাকিস্তান ও ইরানের মতো দেশগুলোর ভূমিকা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সামরিক অভিযান বন্ধের পথ খুঁজে বের করা।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৩ মেহের ১৪০৫ তারিখে প্রকাশিত দৈনিক আল-আখবার-এর সংবাদেও সৌদি আরবের পক্ষ থেকে উত্তেজনা কমানোর প্রস্তাব পুনরায় উত্থাপন এবং সানার অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে আপত্তির কথা উঠে এসেছে।

এই কূটনৈতিক তৎপরতার গুরুত্ব হলো, সৌদি আরব একদিকে সামরিক হুমকি অব্যাহত রাখছে, অন্যদিকে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক কূটনৈতিক শক্তিগুলোর সহযোগিতা চাইছে। ইয়েমেন সংকটকে সামরিক চাপের মাধ্যমে সমাধানের বিষয়ে অতীতে রিয়াদ যে অবস্থান তুলে ধরেছিল, বর্তমান আচরণ তার থেকে ভিন্ন চিত্র প্রকাশ করছে।

সৌদি আরবের বিমানশক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো সৌদি আরবের প্রধান সামরিক হাতিয়ার-বিমানশক্তির কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়া।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সংঘাতের নতুন পর্যায়ে ইয়েমেনে সৌদি আরবের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সংখ্যা ২,৫০০ ছাড়িয়েছে। কিন্তু এত বিপুল হামলা সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি রিয়াদের অনুকূলে পরিবর্তিত হয়নি। একই সঙ্গে সৌদি ভূখণ্ডের গভীরে আনসারুল্লাহর হামলাও বন্ধ করা যায়নি।

এ থেকে প্রতিবেদনের লেখক যুক্তি দিয়েছেন, সামরিক অভিযান বাড়ালেই রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত হয় না। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করেছিল, অবকাঠামো ধ্বংস, ইয়েমেনের জনগণের ওপর চাপ বৃদ্ধি এবং সানার সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার মাধ্যমে প্রতিরোধের ইচ্ছাশক্তি ভেঙে দেওয়া সম্ভব হবে।

কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং আনসারুল্লাহর অভিযানের বিস্তৃতি দেখিয়েছে, সেই কৌশল প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।

দীর্ঘ যুদ্ধ ও অবরোধেও ইয়েমেনকে পিছু হটানো যায়নি

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রায় ১২ বছরের যুদ্ধ ও অবরোধে ইয়েমেনের অর্থনৈতিক ও জনসেবামূলক অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের অবকাঠামোয় আরও হামলা চালানোকে সানাকে পিছু হটতে বাধ্য করার সীমাহীন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব নয়।

যখন একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জনসেবা ব্যবস্থা আগে থেকেই গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তখন আরও ধ্বংসযজ্ঞ চালালেই নতুন কোনো রাজনৈতিক অর্জন নিশ্চিত হয় না।

অন্যদিকে, আনসারুল্লাহর সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনার ফলে যুদ্ধের ব্যয় সেই পক্ষের ওপরও পড়ছে, যে পক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করেছিল এবং এখন সংঘাতের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে যুদ্ধবিরতির পথ খুঁজছে-এমনটাই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে এক মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে হামলা বাড়ানোর সৌদি হুমকিকে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের কার্যকর কৌশলের চেয়ে বরং পুরোনো একটি কৌশলের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা হয়েছে, যার সীমাবদ্ধতা ইতিমধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে।

অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সানার আপত্তির কারণ কী?

প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, সানার অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে আপত্তিকে সব ধরনের রাজনৈতিক সমাধানের বিরোধিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। মূল বিষয় হলো, যুদ্ধবিরতির প্রকৃতি কী হবে এবং কোন শর্তে তা কার্যকর করা হবে।

আনসারুল্লাহর অবস্থান অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা যুদ্ধ ও অবরোধের অবসান এবং নির্দিষ্ট অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যাবে। শুধু সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে সৌদি আরবকে নতুন করে সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়াকে তারা যথেষ্ট মনে করে না।

প্রতিবেদনে সানার দাবিগুলো কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে:

  • বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার: ইয়েমেনে পণ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রবেশের পথ সহজ করা।
  • সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ: আটকে রাখা তেলের রাজস্ব থেকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
  • বন্দি ও আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে সমাধান: বন্দি বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর নিষ্পত্তি করা।
  • যোগাযোগ ও যাতায়াতের পথ খুলে দেওয়া: বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ পুনরায় চালু করা।
  • আর্থিক ও মুদ্রাসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি: ইয়েমেনের অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত বিরোধগুলোর সমাধান করা।

এসব দাবি সরাসরি ইয়েমেনের জনগণের দৈনন্দিন জীবন, প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ এবং অর্থনীতি পুনর্গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা ছাড়া কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতির আহ্বান দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও অবরোধের সংকটের সমাধান করতে পারবে না বলে প্রতিবেদনে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।

রিয়াদ ও সানার অবস্থানের মৌলিক পার্থক্য

প্রতিবেদনটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুই পক্ষের অবস্থানের প্রধান পার্থক্য হলো যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পদ্ধতি ও অগ্রাধিকারে।

সৌদি আরব প্রথমে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে চায়, এরপর মূল সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনার পক্ষপাতী। বিপরীতে, আনসারুল্লাহর অবস্থান হলো-যুদ্ধবিরতি এমন একটি কাঠামোর অংশ হতে হবে, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ ও অবরোধের অবসান ঘটাবে।

প্রতিবেদনের লেখকের মতে, যে পক্ষ দীর্ঘদিন সামরিক শক্তির মাধ্যমে নিজেদের দাবি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তারা এখন দায়িত্ব গ্রহণ ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ছাড়াই শুধু স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে অপর পক্ষকে তার সামরিক চাপের হাতিয়ার পরিত্যাগ করতে বলতে পারে না।

এক মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব: ইয়েমেনে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের অনিচ্ছাকৃত স্বীকারোক্তি সৌদি আরবের

সামনে সৌদি আরবের জন্য কী বিকল্প রয়েছে?

প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের সামনে মূলত দুটি পথ রয়েছে-টেকসই সমঝোতার শর্তগুলো মেনে নেওয়া অথবা এমন একটি সংঘাত অব্যাহত রাখা, যার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে।

যুদ্ধক্ষেত্রের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী, আনসারুল্লাহ সামরিক চাপকে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবি আদায়ের হাতিয়ারে পরিণত করতে পেরেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ফলে শুধু হুমকি বা স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়ে নতুন বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা রিয়াদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রতিবেদনের লেখক আহমদ হাজি সাদেকিয়ানের মতে, সৌদি আরব সত্যিই উত্তেজনা কমাতে চাইলে একতরফাভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা থেকে সরে এসে যুদ্ধ ও অবরোধের অবসান এবং সংশ্লিষ্ট অঙ্গীকার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

অন্যথায়, এক মাসের যুদ্ধবিরতি সংঘাতের মধ্যে কেবল একটি সাময়িক বিরতিতে পরিণত হতে পারে-যা সংকটের মূল কারণগুলো দূর করবে না এবং নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকানোর নিশ্চয়তাও দেবে না।

লেখক: আহমদ হাজি সাদেকিয়ান

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha