হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন হামিদ শাহরিয়ারি বলেছেন, আফ্রিকায় সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়, স্থানীয় জনশক্তি গড়ে তোলা, আলেম ও বুদ্ধিজীবীদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ইসলামী উম্মাহর ঐক্য ও অভিন্ন পরিচয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ
ইরানের রাজধানী তেহরানে আফ্রিকার সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতাবিষয়ক কর্মদলের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিশ্ব ইসলামী মাজহাবসমূহের নৈকট্য প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক সংস্থার মহাসচিব হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন হামিদ শাহরিয়ারি, আফ্রিকায় সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাহদাভিপুর এবং আফ্রিকায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
সভায় আফ্রিকার সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়, আফ্রিকার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা অর্জন, স্থানীয় জনশক্তিকে প্রশিক্ষিত করা এবং বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ইসলামী উম্মাহর ঐক্য সংস্থার প্রথম প্রধান লক্ষ্য
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন হামিদ শাহরিয়ারি সভায় বিশ্ব ইসলামী মাজহাবসমূহের নৈকট্য প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক সংস্থার সাতটি প্রধান লক্ষ্য তুলে ধরে বলেন, ইসলামী উম্মাহর ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং অভিন্ন সভ্যতাগত পরিচয় সুদৃঢ় করাই এ সংস্থার প্রথম প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ইসলামী উম্মাহ একটি বিস্তৃত ও সর্বব্যাপী জনগোষ্ঠী। এর অন্তর্ভুক্ত হলেন মুসলমান, ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও নেটওয়ার্ক, ইসলামী দেশসমূহ এবং অমুসলিম সমাজে বসবাসকারী মুসলিম সংখ্যালঘুরা। অভিন্ন বিশ্বাস, ওহিভিত্তিক যুক্তিবোধ, ধর্মীয় ঐতিহ্য, ইসলামী নৈতিকতা ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এ উম্মাহ গড়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, মানবিক অধিকার ও দায়িত্বের প্রতি অঙ্গীকার, নৈতিক গুণাবলির প্রসার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে ইসলামী উম্মাহ অভিন্ন মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সমাজগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
শাহরিয়ারি বলেন, ইসলামী উম্মাহর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ সংস্থার ভূমিকা হলো বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব প্রদান, আলেম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে যোগাযোগের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, সহযোগিতা সহজ করা এবং জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঐক্য ও মাজহাবসমূহের নৈকট্যের চিন্তাধারাকে এগিয়ে নেওয়া।
ঐক্যের উদ্যোগে সক্রিয় ব্যক্তিদের ক্ষমতায়ন ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ
শাহরিয়ারি ঐক্য ও মাজহাবসমূহের নৈকট্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সক্রিয় ব্যক্তিদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করাকে সংস্থার দ্বিতীয় প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, তরুণ, নারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী, জনভিত্তিক সংগঠন ও নেটওয়ার্ককে পরিকল্পিতভাবে সহায়তা করার মাধ্যমে এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রশিক্ষণ, কার্যক্রমের মধ্যে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কাজে লাগানো এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্থানীয় পর্যায়ের পরিবর্তন সৃষ্টিকারী সক্ষমতাকে কাজে লাগানো এ লক্ষ্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
বিশ্ব ইসলামী মাজহাবসমূহের নৈকট্য প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক সংস্থার মহাসচিব আলেম, চিন্তাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, যৌথ জ্ঞান ও সংস্কৃতি উৎপাদনের মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইসলামী ও মানবিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কোরআনবিষয়ক জ্ঞান, ফিকহ, কালাম, দর্শন ও হাদিসশাস্ত্রে যৌথ গবেষণা ও শিক্ষামূলক সহযোগিতা সম্প্রসারণ করলে মাজহাবসমূহের নৈকট্যের চিন্তাধারা আরও গভীর হবে এবং ইসলামী ঐক্যের জ্ঞানগত ভিত্তি সুদৃঢ় হবে।
শাহরিয়ারি বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বের বিকাশ, সংলাপ এবং উম্মাহকেন্দ্রিক পারস্পরিক চিন্তাবিনিময়কে সংস্থার অন্যান্য লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন। এ জন্য তিনি যুক্তিবোধ, মধ্যপন্থা, মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে নৈতিকতা এবং গঠনমূলক সংলাপের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বৈজ্ঞানিক সভা ও সম্মেলন আয়োজনের আহ্বান জানান।
মতপার্থক্য হ্রাস ও তাকফিরি ধারার মোকাবিলা
ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক মতপার্থক্য হ্রাসের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে শাহরিয়ারি বলেন, বিরোধী, বিভেদ সৃষ্টিকারী ও তাকফিরি ধারা এবং নেটওয়ার্কগুলোকে চিহ্নিত করা, তাদের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা এবং সেগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল প্রণয়ন করা এ সংস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে নৈতিকতা চর্চা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ধর্মীয় শাখাগত বিষয়ে ইজতিহাদের স্বীকৃতি এবং ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিরোধ কমানোর প্রচেষ্টা ইসলামী বিশ্বের সাংস্কৃতিক সংহতি জোরদার করতে পারে।
গণমাধ্যম, শিল্পকলা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ
শাহরিয়ারি গণমাধ্যম, শিল্পকলা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণকে সংস্থার আরেকটি প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, মাজহাবসমূহের নৈকট্যের চিন্তাধারা প্রসারের লক্ষ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কার্যকর গণমাধ্যম ও শিল্পসামগ্রী তৈরি, শনাক্ত, বিতরণ এবং সেগুলোকে সহায়তা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী উম্মাহর অভিন্ন পরিচয় সুদৃঢ় করা, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাংস্কৃতিক প্রভাব বৃদ্ধি এবং ইসলামী মাজহাবগুলোর অভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও দিবসগুলোর মর্যাদা রক্ষা ও পুনরুজ্জীবিত করা এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সংস্থার শেষ প্রধান লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, উম্মাহকেন্দ্রিক ইউনিয়ন, সম্মেলন, সংগঠন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, সক্রিয়করণ এবং সেগুলোকে সহায়তা করার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক, আঞ্চলিক ও সভ্যতাগত সংহতি জোরদার করা হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা হবে।
তিনি আরও জানান, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত তথ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে আঞ্চলিক সংহতি শক্তিশালী করা এবং নতুন ইসলামী সভ্যতা পুনর্গঠনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আফ্রিকা: বিপুল সম্ভাবনা ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মহাদেশ
বিশ্ব ইসলামী মাজহাবসমূহের নৈকট্য প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক সংস্থার আন্তর্জাতিক যোগাযোগবিষয়ক উপপ্রধান ঘোরবান আলি পুরমারজান আফ্রিকার সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, আফ্রিকা মহাদেশের জনসংখ্যা প্রায় দেড়শ কোটি। ৫৪টি দেশে ৬০ কোটিরও বেশি মুসলমান বসবাস করেন। মহাদেশটিতে ইসলামের ক্রমবর্ধমান বিস্তারও একটি উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা।
তিনি বলেন, বিপুল অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানবসম্পদ থাকা সত্ত্বেও আফ্রিকা দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতাসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই এ মহাদেশে কার্যকরভাবে কাজ করতে হলে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
আফ্রিকায় ইরানের অতীত কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পুরমারজান বলেন, বিভিন্ন সময়ে এ মহাদেশে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ধারাবাহিকতা ও সমন্বয় বজায় রাখা সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, আফ্রিকায় সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হিসেবে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাহদাভিপুরকে নিয়োগ দেওয়ার পর সেখানে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইসলামি সংস্কৃতি ও যোগাযোগ সংস্থা, রেড ক্রিসেন্ট এবং কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য কাজ শুরু করেছে।
তিনি আরও বলেন, আফ্রিকায় সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধির কার্যালয়ের সহযোগিতায় কয়েকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে বিশ্ব ইসলামী মাজহাবসমূহের নৈকট্য প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক সংস্থার সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগবিষয়ক কমিটিও রয়েছে।
আফ্রিকার সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগে ধারাবাহিক পরিকল্পনা জরুরি
আফ্রিকায় সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাহদাভিপুর আফ্রিকার সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগবিষয়ক কমিটির প্রথম সভা আয়োজনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ সভার মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কৌশল, নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব হবে।
ইসলামী ঐক্য সম্মেলনে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অতিথিদের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সম্মেলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে অতিথিরা ইরানের পরিবেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পেয়েছেন এবং এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
আঞ্চলিক সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আফ্রিকার দেশগুলোতে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, সে প্রসঙ্গে মাহদাভিপুর বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি এ মহাদেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আফ্রিকার অনেক সুন্নি আলেমকেও প্রভাবিত করেছে।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের সংঘাত এবং ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সমর্থন ইরানের অবস্থান ও প্রভাবকে প্রভাবিত করেছে। তাই আফ্রিকার মুসলিম জনসংখ্যার একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্বকারী সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের জন্য বিদ্যমান সুযোগ কাজে লাগানো উচিত।
মাহদাভিপুর জোর দিয়ে বলেন, সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগ কেবল সাময়িক সফর ও আলেমদের সঙ্গে সীমিত সাক্ষাতের মধ্যে আবদ্ধ রাখা যাবে না। এর পরিবর্তে একটি স্থায়ী কাঠামোর ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বুদ্ধিজীবী এবং সুন্নি আলেমদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে।
পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞান, স্থানীয় জনশক্তি গড়ে তোলা ও নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা
আফ্রিকার সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের জন্য স্থানীয় পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন, স্থানীয় জনশক্তিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং যোগাযোগের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাকে প্রধান তিনটি প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেন মাহদাভিপুর।
তিনি বলেন, যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য আফ্রিকার বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা ও সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে। কারণ, মুসলিম ব্রাদারহুড ও সুফিবাদের মতো ধারাগুলো সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মাজহাবসমূহের নৈকট্য প্রতিষ্ঠায় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা জরুরি। লক্ষ্য শুধু সভা ও সাক্ষাৎ আয়োজন করা নয়; বরং স্থানীয় মানুষকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করতে হবে, যাতে তাঁরা নিজ নিজ দেশে ঐক্য ও মাজহাবসমূহের নৈকট্যের চিন্তাধারা প্রসারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
কোমে মাজহাবসমূহের নৈকট্য প্রতিষ্ঠার জন্য জনশক্তি প্রশিক্ষণের প্রথম কোর্সের কথা উল্লেখ করে মাহদাভিপুর জানান, এ কর্মসূচিতে আফ্রিকার ২৬ জন পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থী দুই মাস ধরে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বিশ্ব ইসলামী মাজহাবসমূহের নৈকট্য প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক সংস্থার মহাসচিব হামিদ শাহরিয়ারিসহ বিশিষ্ট শিক্ষকেরা এ প্রশিক্ষণে পাঠদান করেছেন।
তিনি সুন্নি মুসলিম নারীদের সক্রিয় নেটওয়ার্ক, গণমাধ্যম এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আফ্রিকা মহাদেশে প্রায় ৭০টি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সহযোগিতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বিশেষায়িত সভা ও দারুস সালামে গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা
মাহদাভিপুর বলেন, সামগ্রিক কৌশলগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচিতে রূপ দিতে হবে। সাধারণ নীতিমালা নির্ধারণের পর সেনেগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, তিউনিসিয়া ও মরক্কোর মতো দেশ ও অঞ্চলে বিশেষায়িত সভা আয়োজন করা উচিত। এসব সভায় মাজহাবসমূহের নৈকট্য প্রতিষ্ঠা এবং সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
তিনি দারুস সালামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা জানিয়ে বলেন, সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইসলামী মাজহাবসমূহের নৈকট্য প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।
মাহদাভিপুর বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সুন্নি আলেমদের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় আলোচনা, বিভিন্ন ভাষায় ঐক্যবিষয়ক বই প্রকাশ, বার্ষিক সম্মেলন আয়োজন এবং স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
আফ্রিকার গণমাধ্যম মানচিত্র প্রণয়ন ও ইসলামী মাজহাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা কাজে লাগানো
সাংস্কৃতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণে গণমাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরে মাহদাভিপুর বলেন, গণমাধ্যমবিষয়ক কমিটিতে এ বিষয়টি বিশেষায়িতভাবে পর্যালোচনা করতে হবে এবং আফ্রিকার একটি গণমাধ্যম মানচিত্র তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, এ মানচিত্রে অন্তত ২০টি গুরুত্বপূর্ণ আফ্রিকান দেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি, সহযোগিতামূলক ও বিরোধী গণমাধ্যম এবং সেগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতার পদ্ধতি চিহ্নিত করতে হবে। এর ফলে স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণার ভিত্তিতে গণমাধ্যমবিষয়ক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব হবে।
তিনি ইসলামী মাজহাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আফ্রিকান শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি আফ্রিকা অধ্যয়ন ও বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার বিশ্লেষণ নিয়ে বিশেষায়িত সভা আয়োজনের মাধ্যমে মহাদেশটির সম্ভাবনা সম্পর্কে জ্ঞান বাড়াতে হবে।
সুফিবাদ ও সুন্নি সাইয়্যিদদের সক্ষমতা: আফ্রিকার সঙ্গে যোগাযোগের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র
আফ্রিকায় সুফিবাদের অবস্থান সম্পর্কে মাহদাভিপুর বলেন, সুফিবাদ এ মহাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ধারা। তাই সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং মাজহাবসমূহের নৈকট্য প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় এ ধারাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
ভারতে সুন্নি ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের জন্য আহলে বাইত (আ.)-বিষয়ক প্রশিক্ষণ কোর্স আয়োজনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব কোর্স ব্যাপক সাড়া পেয়েছিল। কারণ, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অনেকেই আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করলেও তাঁদের জীবনাদর্শ ও শিক্ষার সঙ্গে যথেষ্ট পরিচিত ছিলেন না।
সবশেষে মাহদাভিপুর সুন্নি সাইয়্যিদদের সক্ষমতাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আফ্রিকায় ইরানের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ এবং বিদ্যমান সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণ ও ইসলামী উম্মাহর ঐক্য সুদৃঢ় করার জন্য আরও কার্যকর, সুপরিকল্পিত ও ধারাবাহিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
আপনার কমেন্ট