শুক্রবার ৩০ অক্টোবর ২০২৬ - ১৯:১২
নেক কাজে সহযোগিতা, পাপে অসহযোগিতা-জুমার খুতবায় মুসল্লিদের প্রতি ইমামের আহ্বান

বাগনান, হাওড়া: নেক কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো, পাপ ও অন্যায়ে কখনোই নয়-কুরআনের এই নির্দেশনা তুলে ধরে বাগনান জামে মসজিদে জুমার খুতবায় ইমাম মাওলানা আবুল হাসান বলেন, মানুষ নেক কাজে পিছিয়ে থাকলেও অন্যায়ে একে অপরকে সাহায্য করে, যা কুরআনের পরিপন্থী। তিনি জুয়া, মদপান, জুলুম ও এতিমের সম্পদ আত্মসাতের মতো নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার এবং মজলুম-অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। পাশাপাশি সকলকে আন্তরিক তাওবা করার তাগিদ দেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,  মসজিদ আহলেবাইত (আ.) মহাদেব পুরের জুমার ইমাম মাওলানা আবুল হাসান তার খুতবায় কুরআন শরীফের এই আয়াত পাঠ করেন এবং বলেন,
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ

اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى اَشْرَفِ الْاَنْبِيَاءِ وَالْمُرْسَلِيْنَ، وَعَلٰى اٰلِهٖ وَاَصْحَابِهٖ اَجْمَعِيْنَ، اَمَّا بَعْدُ

فَاَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ

تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَ التَّقۡوٰی ۪ وَ لَا تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡاِثْمِ وَالۡعُدۡوَانِ
(সূরা মায়িদা: আয়াত ২)

সম্মানিত মুসল্লিগণ!

আজকের জুমার খুতবায় আমি কুরআনুল কারীমের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বজনীন আয়াত নিয়ে আলোচনা করব, যা আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পথনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়াতে একে অপরকে সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সাহায্য করো না।

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা দুটি স্পষ্ট আদেশ দিয়েছেন:

১. আল-বির ও তাকওয়া-অর্থাৎ সৎকাজ, নেকি, আল্লাহর ভয় ও পরহেজগারিতে একে অপরকে সহযোগিতা করা।

২. আল-ইসম ও আল-উদওয়ান-অর্থাৎ পাপ, অন্যায়, জুলুম ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা না করা।

এ আয়াতের শিক্ষা হলো-আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি লেনদেন এই দুটি নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।

তিনি এই আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে বলেন, ইমাম তাবারী তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন-"আল-বির" অর্থ হলো সমস্ত নেক কাজ, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের الوسيلة। আর "তাকওয়া" হলো আল্লাহর আদেশ মানার এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর ভয় ও সচেতনতা অর্জন। তাই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়-নেকির প্রতিটি কাজে এবং আল্লাহভীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে তোমরা একে অপরের সহযোগী হও, আর পাপ ও জুলুমের প্রতিটি ক্ষেত্রে একে অপর থেকে আলাদা থাকো ও অসহযোগিতা করো।

আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন-"তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহর আজাব অত্যন্ত কঠিন।" (সূরা বাকারা: ২)

মাওলানা আবুল হাসান বলেন, প্রিয় মুসল্লিগণ! আজ আমরা যদি আমাদের সমাজ ও নিজেদের জীবনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব-মানুষ যখন কোনো নেক কাজের জন্য সাহায্য চায়, তখন আমাদের মধ্যে সহযোগিতার হাত খুবই কম। কেউ যদি দ্বীনের খেদমতে সহযোগিতা চায়, মসজিদ বা মাদরাসা নির্মাণের জন্য, এতিম-বিধবা ও অসহায়ের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য, জ্ঞানচর্চা ও দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে-তখন কতজন আমরা এগিয়ে আসি? অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে বলতে হয়-খুবই অল্প সংখ্যক মানুষ এগিয়ে আসে। অথচ আল্লাহ আমাদের এই নেক কাজেই সহযোগিতা করতে আদেশ দিয়েছেন।

মাওলানা আরও বলেন, কিন্তু বাস্তবতা এটাই-যেখানে কোনো অন্যায়, পাপাচার, জুলুম বা সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সাহায্য করতে দেখা যায়, সেখানে মানুষ অনেক বেশি প্রস্তুত। কেউ যদি অন্যায়ের জন্য সহযোগিতা চায়, তখন কেউ পিছিয়ে থাকে না। যেখানে আল্লাহ আমাদের সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছেন, সেখানেই আমরা একে অপরকে সাহায্য করে চলেছি।

তিনি আরও বলেন, হে মুসল্লিগণ! আমরা আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল (সা.) ও কুরআনুল কারীমের উপর ঈমান রাখি। আমরা বিশ্বাস করি-আল্লাহ এক, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; আমরা বিশ্বাস করি-হজরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বশেষ নবী; আমরা বিশ্বাস করি-কুরআনুল কারীম আল্লাহর কালাম, যা তিনি রাসূল (সা.)-এর উপর নাজিল করেছেন; আমরা বিশ্বাস করি-ভালো-মন্দ সব আল্লাহর পক্ষ থেকেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো-যদি আমরা এই ঈমান ও বিশ্বাস রাখি, তাহলে আমরা কেন কুরআনুল কারীমের বিরুদ্ধে আমল করছি?

কুরআনুল কারীমতো আমাদের স্পষ্টভাবে নিষেধ করছেন-অন্যায় কাজে একে অপরকে সাহায্য করো না। কিন্তু আমরা কেন অন্যায় কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করছি?

কুরআনের নিষেধাজ্ঞা স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন , কুরআনুল কারীম কি আমাদের আদেশ দেয়নি: ১- জুয়া থেকে দূরে থাকো-আল্লাহ বলেন, শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে তোমাদের বিরত রাখতে। (সূরা মায়িদা: ৯১)

২- মদপান করো না-আল্লাহ বলেন, হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ের তীর-এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং এগুলো থেকে দূরে থাকো। (সূরা মায়িদা: ৯০)
৩- মানুষের উপর জুলুম করো না-আল্লাহ বলেন, তোমরা অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ গ্রাস করো না। (সূরা বাকারা: ১৮৮)
৪- এতিমদের সম্পদ আত্মসাৎ করো না-আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই যারা এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা নিজেদের পেটে আগুন ভরছে। (সূরা নিসা: ১০)
৫- গান-বাজনা ও অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকো-আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয়, আমি তাদের জন্য শয়তানকে সঙ্গী করে দিই। (সূরা যুখরুফ: ৩৬)

মাওলানা আবুল হাসান বলেন, হে মুসল্লিগণ! কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াত একদিকে চলছে আর আমরা অন্যদিকে জুয়া খেলছি, গান-বাজনা শুনছি, মদপান করছি, জুলুম করছি-এ কীসের ঈমান? কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াত যদি একদিকে চলে আর আমাদের ভিতরে কেউ মদপান করে, গান-বাজনা শোনে, জুয়া খেলে-তাহলে কি আমরা কুরআনুল কারীমের অসম্মান করছি না? কুরআন শুনে চোখে পানি আসে, কিন্তু বাস্তব জীবনে কুরআনের বিধান মানি না-এটা কি ঈমানের দাবি?

তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রয়োজন-মজলুমদের পাশে দাঁড়ানো, জালিমের বিরুদ্ধে যাওয়া। আমাদের প্রয়োজন-এতিম, বিধবা, অসহায় ও মজলুমদের পাশে দাঁড়ানো। আমাদের প্রয়োজন-যেখানে অন্যায় হচ্ছে, সেখানে প্রতিবাদ করা এবং মজলুমের পাশে থেকে সহযোগিতা করা।

কিন্তু আজ আমরা দেখি-মানুষ জালিমের পাশে দাঁড়াচ্ছে, অন্যায়কে সমর্থন করছে, জুলুমের প্রশংসা করছে। এটা আমাদের ঈমানের পরিপন্থী।

তিনি বলেন, হে আল্লাহর বান্দাগণ! আমরা যদি একবার নিজের অন্তর দিয়ে গভীরভাবে ভাবি-আমরা কি আল্লাহর আদেশ পালন করছি? আমরা কি নেক কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করছি? আমরা কি পাপ ও অন্যায়ে অসহযোগিতা করছি? যদি উত্তর 'না' হয়, তাহলে এখনই আল্লাহর কাছে তাওবা করি। আল্লাহ বলেন-হে ঈমানদারগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। (সূরা নূর: ৩১)

আল্লাহ তাআলা তাওবা কবুলকারীদের ভালোবাসেন। তিনি বলেন-নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন। (সূরা বাকারা: ২২২)

শেষে তিনি বলেন, হে আল্লাহ! আমাদের তাওফিক দান করুন-আপনার আদেশের উপর আমল করার এবং যেগুলো আপনি নিষেধ করেছেন সেগুলো থেকে দূরে থাকার।

হে আল্লাহ! আমাদের নেক কাজে একে অপরের সহযোগী হওয়ার তাওফিক দান করুন এবং পাপ ও অন্যায়ে একে অপরকে সহযোগিতা করা থেকে হেফাজত করুন।

হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে কুরআনের প্রতি মোহাব্বত দান করুন এবং কুরআনের বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন।

হে আল্লাহ! মজলুমদের পাশে দাঁড়ানোর সাহস ও জালিমের বিরুদ্ধে কথা বলার তাওফিক দান করুন।

হে আল্লাহ! আমাদের এই জুমার খুতবাকে কবুল করুন এবং এর শিক্ষা আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا اِنَّكَ اَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ

وَاَقِمِ الصَّلٰوةَ اِنَّ الصَّلٰوةَ تَنْهٰى عَنِ الْفَحْشَآءِ وَالْمُنْكَرِ ۗ وَلَذِكْرُ اللهِ اَكْبَرُ ۗ وَاللهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُوْنَ

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha