হাওজা নিউজ এজেন্সি: ‘মুয়াবিয়া’ চলচ্চিত্রটি এমন একটি গল্প বলে যেন তা স্বয়ং মুয়াবিয়ার ইতিহাস পুনর্লিখন (ইতিহাস বিকৃতি) করার জন্য নির্মিত। এই চলচ্চিত্রে আবু সুফিয়ানের বংশকে এমনভাবে পরিশুদ্ধ করে দেখানো হয়েছে যেন তারা কখনোই রাসূল (সা.)-এর প্রকাশ্য শত্রু ছিল না। মুয়াবিয়াকে একজন প্রজ্ঞাবান, কূটনীতিবিদ ও বিচক্ষণ ব্যক্তি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যেন তার জীবনে কোনো ভুলই ছিল না। অথচ তার ঐতিহাসিক নেতিবাচক দিকগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে।
এই চলচ্চিত্রে ইমাম আলী (আ.)-এর খিলাফতকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে মুয়াবিয়ার ভূমিকা, ইমাম হাসান (আ.)-এর সাথে তার চাতুরিপূর্ণ সন্ধি ও তা ভঙ্গ করা এবং ক্ষমতা ও কূটকৌশলে নিজের ফাসেক সন্তান ইয়াজিদকে সিংহাসনে বসিয়ে বংশানুক্রমিক স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি সাহাবাদের বিরুদ্ধে তার অপরাধ ও বিরোধীদের ওপর নিপীড়নের কথাও বলা হয়নি। এই একপেশে বর্ণনা মুয়াবিয়ার একটি সম্পূর্ণ বিকৃত চিত্র উপস্থাপন করেছে, যা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক।
চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বড় ত্রুটিগুলোর মধ্যে একটি হলো, মুয়াবিয়ার প্রকৃত চিত্র ফুটিয়ে তোলার মতো ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া। তার জীবনীর এমন অনেক ঘটনা, যা তার আসল পরিচয় তুলে ধরতে পারত, সেগুলো হয় মুছে ফেলা হয়েছে নয়তো বিকৃত করা হয়েছে, যাতে মুয়াবিয়াকে একজন শান্তিকামী ও নির্দোষ ব্যক্তি হিসেবে দেখানো যায়। অথচ ঐতিহাসিক দলিলগুলো তার চরিত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প বলে।
উদাহরণস্বরূপ, চলচ্চিত্রটি ইমাম আলী (আ.)-এর শাসনের বিরুদ্ধে মুয়াবিয়ার চক্রান্তের কোনো উল্লেখই করেনি। ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সিফফিনের যুদ্ধে মুয়াবিয়ার কূটকৌশলই যে তাকে বিজয়ী করে এবং উম্মাহর মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে। ক্ষমতায় আসার পর তিনি ইমাম হাসান (আ.)-এর সাথে স্বাক্ষরিত সন্ধিচুক্তির শর্তগুলো ভঙ্গ করেন, শিয়া মুসলমানদের দমন-পীড়ন চালান এবং উমাইয়া শাসনকে বংশানুক্রমিক স্বৈরতন্ত্রে রূপান্তরিত করেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা চলচ্চিত্রে উপেক্ষিত হয়েছে, তা হলো রাসূল (সা.)-এর সাহাবাদের প্রতি মুয়াবিয়ার নিষ্ঠুর আচরণ। আম্মার ইবনে ইয়াসির, হুজর ইবনে আদিসহ অনেক বিশিষ্ট সাহাবাকে তার নির্দেশে হত্যা বা নির্যাতন করা হয়। কিন্তু চলচ্চিত্রে মুয়াবিয়াকে সহনশীল ও সংলাপপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ক্ষমতা ধরে রাখতে তিনি কোনো ধরনের অপরাধ থেকেই বিরত থাকেননি।
এছাড়া, তার অর্থনৈতিক নীতি—যা সামাজিক বৈষম্য, দুর্নীতি ও বৈষম্যকে তীব্র করেছিল—সেটিও সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। মুয়াবিয়া অসংখ্য ব্যক্তিকে অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিজের পক্ষে ভেড়াতে সক্ষম হন এবং ইসলামি শাসনে অভিজাততান্ত্রিক সংস্কৃতি চালু করেন। কিন্তু চলচ্চিত্রে তাকে একজন দূরদর্শী নেতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যিনি কেবল মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও শান্তি চেয়েছিলেন।
অন্যদিকে, চলচ্চিত্রটি একমুখীভাবে কেবল মুয়াবিয়ার জীবনী নিয়ে আবর্তিত হয়েছে এবং তার বিরোধীদের সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেছে। ইতিহাসকে পুরোপুরি একপক্ষীয়ভাবে উপস্থাপন করেছে। এই চলচ্চিত্রটি কোনো নিরপেক্ষ historical representation নয়, বরং উমাইয়া শাসকদের একটি আদর্শিক চিত্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা। এমনকি উমাইয়াদের নিজেদের ইচ্ছাও ছিল না যে ইতিহাসে তাদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হোক। এই ইচ্ছাকৃত বিকৃতিগুলো চলচ্চিত্রটিকে historical drama-র বদলে ইতিহাস বিকৃতির হাতিয়ারে পরিণত করেছে।
এছাড়া, বাজেটের তুলনায় চলচ্চিত্রটির গুণগত মান অত্যন্ত নিচু। বড় অঙ্কের বিনিয়োগ সত্ত্বেও দর্শকরা আশা করেছিলেন শক্তিশালী চিত্রনাট্য, পেশাদার পরিচালনা এবং অভিনয়ের উৎকর্ষ—কিন্তু ফলাফল হলো একটি ভাসাভাসা ও দুর্বল চলচ্চিত্র, যা সমালোচকদের মন জয় করতে ব্যর্থ হয়েছে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘মুয়াবিয়া’ চলচ্চিত্রটি কেবল historical drama-ই নয়, বরং আধুনিক রাজনৈতিক লক্ষ্যেও নির্মিত। সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এই প্রকল্পকে সমর্থন করে নিজের পদক্ষেপগুলোর বৈধতা দিতে চেয়েছেন। তিনি মুয়াবিয়ার নীতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের বিতর্কিত সংস্কারগুলোকে ন্যায্যতা দিতে এবং সৌদি শাসনের একটি নতুন চিত্র উপস্থাপন করতে চান।
যেভাবে মুয়াবিয়া খিলাফতকে নানা কূটকৌশল ও অপযুক্তিতে বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রে পরিণত করেছিলেন, বিন সালমানও সৌদি আরবের শাসন কাঠামোতে একই রকম পরিবর্তন আনতে চান। এই চলচ্চিত্রে মুয়াবিয়ার চরিত্রকে সাদা করা হয়েছে, যা বিন সালমানের ক্ষমতা সংহতকরণ ও নীতির সমর্থনে ব্যবহৃত হতে পারে। এই চলচ্চিত্রটি শুধু ইতিহাসকেই বিকৃত করেনি, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার হাতিয়ারেও পরিণত হয়েছে।
সিদ্ধান্ত: ‘মুয়াবিয়া’ চলচ্চিত্রকে কেবল একটি historical narrative হিসাবে দেখা যাবে না। এটি একটি বহুমাত্রিক প্রকল্প, যা একদিকে অতীতকে বিকৃত করছে, অন্যদিকে বর্তমান রাজনৈতিক লক্ষ্যেও কাজে লাগছে।
হাওজা নিউজ এজেন্সি/মুহাম্মদ জাওয়াদ খামসাহ
আপনার কমেন্ট