হাওজা নিউজ এজেন্সি: হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.) রাসূলুল্লাহ (সা.)–এর প্রিয় কন্যা, ইমামদের জননী, সাইয়্যিদাতুন নিসায়িল আলামীন— এক আলৌকিক ও ব্যতিক্রমী সত্তা। বয়সে স্বল্প হলেও তিনি মানবিক ও ইলাহী পূর্ণতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন। তাই তিনি শুধু নারীদের নয়— সমগ্র মানবজাতির জন্য যুগে যুগে আদর্শ ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।
শেখ তুসীর আল-গায়েবা’র বর্ণনা অনুযায়ী, ইমাম মূসা আল-কাজিম (আ.) ও ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর মতো নিষ্পাপ ইমামরাও তাঁকে নিজেদের জীবনের আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করেছেন— যা তাঁর মহিমার চূড়ান্ত প্রমাণ।
১. সুরা কাওসার: নবুয়তের বংশধারা অব্যাহত রাখার উপহার
নবী করিম (সা.)–এর দুই পুত্র কাসিম ও আব্দুল্লাহ শৈশবেই ইন্তেকাল করলে কুরাইশের কিছু মানুষ তাঁকে ‘আবতার’—অর্থাৎ বংশহীন—বলে কষ্ট দিত। তাদের এ অপবাদ খণ্ডন করতে আল্লাহ সুরা কাওসার নাজিল করেন:
“নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে দান করেছি কাওসার।”
ইমামিয়া তাফসির মতে, কাওসারের প্রকৃষ্ট অর্থ হলো—হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.), যাঁর মাধ্যমে নবী (সা.)–এর বংশধারা ইমামদের মাধ্যমে চিরকাল অটুট থাকে। সুরা নাজিলের উদ্দেশ্য যেহেতু আবতার অপবাদকে বাতিল করা—সেহেতু কাওসার এমন এক বরকত, যা বংশধারা ও কল্যাণের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।
২. সুরা আল-ইনসান (দাহর): ত্যাগ ও ইলাহী আন্তরিকতার সনদ
আয়াত ৫–২২: আহলুল বাইতের মহত্ত্বের প্রশংসা
মুফাসসির ও ঐতিহাসিকদের মতে, সুরা আল-ইনসানের ৫–২২ নম্বর আয়াত হযরত আলী (আ.), হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.) এবং ইমাম হাসান–হুসাইনের (আ.) মহান ত্যাগ ও ঈমানি আচরণের প্রশংসায় নাজিল হয়েছে।
ঘটনার সারসংক্ষেপ: ইমাম হাসান ও হুসাইন (আ.) অসুস্থ হলে হযরত আলী (আ.) ও যাহরা (সা.আ.) তিনদিন নযর করেন। আরোগ্যের পর অল্প পরিমাণ খাদ্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু প্রতিদিন দরিদ্র, এতিম ও বন্দী এসে দরজায় উপস্থিত হয়। তাঁরা নিজেদের খাবার তাদের দিয়ে দেন এবং শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেরা ক্ষুধার্ত থাকেন।
কুরআন তাঁদের পক্ষ থেকে বলে: “আমরা তোমাদের খাদ্য দেই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য; তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না।”
যদিও প্রচলিত ধারণা তিন দিনের ঘটনা, অধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী এই ঘটনা একদিন অর্থাৎ ২৫ জিলহজ্জে— ঘটেছিল।
৩. আয়াতুত তাতহহর: ইলাহী পবিত্রতার ঘোষণা
সুরা আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াত—
“إِنَّمَا يُرِيدُ اللّٰهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا”—
আহলুল বাইতের ইলাহী পবিত্রতা ও নিষ্পাপতার অন্যতম শক্তিশালী দলিল।
শিয়া–সুন্নি উভয় তাফসির মতে, এই আয়াত নবী (সা.), আলী (আ.), হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.), ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হুসাইন (আ.)—এঁদের নিয়ে নাজিল হয়েছে।
হাদিসে আছে: নবী (সা.) তাঁদের সবাইকে চাদরের নিচে আবৃত করেন এবং বলেন:
“হে আল্লাহ! এরা আমার আহলুল বাইত—এদেরকে সম্পূর্ণ পবিত্র রাখুন।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই আয়াত নাজিল হয়। নবী (সা.) আরও ছয় মাস প্রতিদিন আলী–ফাতিমা (আ.)–এর দরজায় এসে তাঁদের ওপর সালামের পাশাপাশি এ আয়াত তিলাওয়াত করতেন, যাতে তাঁদের মর্যাদা উম্মাহর কাছে চিরস্মরণীয় থাকে।
উপরের তিনটি বিষয়— কাওসার, ইনসান ও তাতহির— হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)–এর অগণিত গুণের ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। তাঁর আধ্যাত্মিক উচ্চতা ভাষা ও কলমের সীমায় ধরা যায় না।
বিখ্যাত ফকিহ ও আরিফ আয়াতুল্লাহ গুরভী ইসফাহানী তাঁর কবিতায় বলেছেন—
“ফেরেশতার সাহায্য ব্যতীত আমার জিহ্বা কীভাবে সাইয়্যিদাতুন নিসা (সা.আ.)–এর প্রকৃত প্রশংসা করতে পারে?
হে দরিদ্র মানব, তাঁর দরজা থেকে মুখ ফিরিও না—তাঁর দানই পারে রূপার হৃদয়কে সোনায় পরিণত করতে।”
সূত্র: সিদ্দিকায়ে শাহীদা: হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)–এর জীবনী ও শাহাদাত— মুহাম্মদ জাওয়াদ ইয়াওয়ারি সেরতাখতি, প্রকাশনা: জামেয়াতুজ যাহরা (সা.আ.)
আপনার কমেন্ট