হাওজা নিউজ এজেন্সি: ১৩ রজব মওলুদে ক্বাবা আমিরুল মুমিনিন ইমাম আলী ইবনে আবু তালিব আলাইহিস সালামের পবিত্র জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে খুলনার কাসরে হুসাইনী ইমামবাড়ায় অনুষ্ঠিত আনন্দ মাহফিলে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহফিলে আলেম-ওলামা, ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও আহলে বাইতের (আ.) অনুসারীরা অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ শিয়া উলমা কাউন্সিলের সভাপতি ও খুলনা ইসলামি শিক্ষা কেন্দ্রের অধ্যক্ষ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা ইব্রাহিম খলিল রাজাভি। বক্তব্যের শুরুতে তিনি উপস্থিত মুসল্লিদের সালাম জানান এবং ইমাম আলী (আ.)-এর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মোবারকবাদ জ্ঞাপন করেন।
বক্তব্যে তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা নবুয়্যাত সম্পর্কে যা বলেছেন, তা গভীরভাবে চিন্তা করা জরুরি। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, “যদি এক লক্ষ তেইশ হাজার নয়শো নিরানব্বই জন নবী আমাদের শেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)-এর বেলায়াতকে মেনে না নিতেন, তাহলে কি আল্লাহ তায়ালা তাদের নবুয়্যাত গ্রহণ করতেন?”
তিনি বলেন, আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে, হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সকল নবীর শ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল এবং তাঁর বেলায়াত সকল আম্বিয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত। নবীগণ যদি রাসূল (সা.)-এর বেলায়াত স্বীকার না করতেন, তবে আল্লাহ তায়ালা তাদের নবুয়্যাত গ্রহণ করতেন না।
এ সময় তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, “হে নবী, আপনি পৌঁছে দিন যা আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। যদি আপনি তা না করেন, তবে আপনি রিসালাতের দায়িত্বই পালন করলেন না।”
তিনি বলেন, এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, যদি রাসূল (সা.) ইমাম আলী (আ.)-এর বেলায়াত স্পষ্টভাবে ঘোষণা না করতেন, তাহলে তাঁর রিসালাত প্রশ্নবিদ্ধ হতো। ফলে যারা ইমাম আলী (আ.)-এর বেলায়াত গ্রহণ করেনি, তাদের ঈমান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
হুজ্জাতুল ইসলাম রাজাভি বলেন, ইমাম আলী (আ.)-এর বেলায়াতকে পর্দার আড়ালে রাখার চেষ্টা নতুন নয়; যুগের পর যুগ ধরে এই চেষ্টা চলে আসছে। তিনি প্রশ্ন করেন, কেন ইমামদের বেলায়াত নিয়ে আলোচনা আড়ালে রাখা হয়েছে এবং কেন তাঁদের জন্মবার্ষিকীতে যেসব দায়িত্ব আমাদের পালন করার কথা ছিল, সেগুলো থেকে আমরা দূরে সরে গেছি।
এ প্রসঙ্গে তিনি ইরান ও ইরাকের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, সেখানে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে ইমাম আলী (আ.)-এর জন্মদিন উদযাপন করা হয়। বিশেষ করে ইরানে ১৩ রজবকে ‘পিতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জন্মদিনের কয়েক দিন আগেই বাজারে উপহার কেনার ব্যাপক প্রস্তুতি দেখা যায়।
তিনি বলেন, এই সংস্কৃতি খুলনা ইমামবাড়ায়ও অনুসরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে সন্তানরা অন্তত বাবাদের বলতে পার—“পিতা দিবসে আপনাকে মোবারক।”
তিনি আরও বলেন, ইসলামে ১৩ রজব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রজব, শাবান ও রমজান মাসের ফজিলত তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব মাসে বেশি বেশি ইবাদত, রোজা, নামাজ ও ইতেকাফ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রজব মাসের ১৩ থেকে ১৫ তারিখ ইতেকাফের জন্য আল্লাহ তায়ালার বিশেষ দিন।
বক্তব্যে তিনি বলেন, মাহে রজব হচ্ছে ইস্তেগফারের মাস। গুনাহ মানুষকে আহলে বাইতের নিকটবর্তী হতে দেয় না। কারণ গুনাহ অপবিত্র আর আহলে বাইত পবিত্র ব্যক্তিত্ব। তিনি দোয়ায়ে কুমাইলের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “হে আল্লাহ, আমার সেই সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিন, যা আমার দোয়া আপনার কাছে পৌঁছাতে বাধা দেয়।”
তিনি রাসূল (সা.)-এর হাদিস উল্লেখ করে বলেন, ইস্তেগফারের দরজা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খোলা থাকে। তিনি বলেন, যখন রজব মাস আসে, ফেরেশতারা আহ্বান করেন— “কোথায় তারা, যারা রজব মাসকে মূল্যায়ন করে?”
আহলে বাইত থেকে বর্ণিত হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা রজব মাসে বেশি বেশি ইবাদত ও রোজা পালন করে, তাদের জন্য জান্নাতে একটি দরজা ও একটি নহর রয়েছে, যার নাম ‘রজব’। কিয়ামতের দিন তারা সেই দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং সেই নহর থেকে উপকৃত হবে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে হুজ্জাতুল ইসলাম রাজাভি ইমাম নাসায়ি’র ঐতিহাসিক ঘটনার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ইমাম নাসায়ি যখন দামেস্কে যান, তখন সেখানকার মানুষেরা ইমাম আলী (আ.) সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা পোষণ করত। তারা মসজিদে ইমাম আলী (আ.)-এর শাহাদাতের খবর শুনে বলত, আলী তো নামাজই পড়ে না তাহলে সে মসজিদে গিয়েছিল কেন? মসজিদে তার কাজ কী ছিল?
এ কথা শুনে ইমাম নাসায়ি বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং উপলব্ধি করেন যে, যুগের পর যুগ ধরে ইমাম আলী (আ.) সম্পর্কে মিথ্যা ও বানোয়াট কথা ছড়ানো হয়েছে। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ইমাম আলী (আ.)-এর শানে বর্ণিত হাদিসগুলো একত্রিত করবেন। এর ফলেই পরবর্তীতে বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ সুনানে নাসায়ি রচিত হয়।
তিনি বলেন, দামেস্কে ইমাম আলী (আ.)-এর ফজিলত তুলে ধরার কারণে ইমাম নাসায়িকে নির্মমভাবে প্রহার করা হয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় তিনি পরবর্তীতে শাহাদাত বরণ করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, ইতিহাসজুড়ে ইমাম আলী (আ.)-এর বেলায়াত আড়াল করার চেষ্টা চলেছে।
এ সময় তিনি ইমাম শাফেয়ি’র প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আহলে বাইতের ফজিলত বর্ণনা করায় ইমাম শাফেয়িকে ‘রাফেজি’ বলা হতো। তখন তিনি কবিতায় বলেছিলেন—
“যদি মুহাম্মদ (সা.) ও আলে মুহাম্মাদের ভালোবাসা রাফেজি হওয়া হয়, তবে দুনিয়া ও আখিরাত সাক্ষী থাক, আমি রাফেজি।”
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় ইমাম আলী (আ.) ও তিন খলিফার মধ্যে কে বেশি মর্যাদাবান—এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়া হয়। অথচ খলিফারাই নিজেরা ইমাম আলী (আ.)-এর মর্যাদা স্বীকার করেছেন। তিনি তৃতীয় খলিফার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “হে আল্লাহ, আমাকে সে দিন পর্যন্ত জীবিত রাখবেন না, যেদিন আলী থাকবেন না এবং আমাকে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে আর আমি উত্তর দিতে পারব না।”
বক্তব্যের শেষভাগে তিনি ইমাম আলী (আ.)-এর জন্মের সময়কার একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, একসময় ‘আজদার’ নামক সাপের মাধ্যমে হক ও বাতিল নির্ধারণ করা হতো। ইমাম আলী (আ.) জন্মগ্রহণের পর সেই সাপ দোলনায় উঠে আসে এবং ইমাম আলী (আ.) দুই আঙুল দিয়ে তাকে দুই টুকরো করেন। এরপর জনগণ হক ও বাতিল নির্ধারণ বিষয়ে প্রশ্ব করলে রাসূল (সা.) ঘোষণা করেন— এখন থেকে আলীর জিকিরই হক ও বাতিল এবং মুমিন ও মুনাফিকের পার্থক্য নির্ধারণ করবে।
বক্তব্যের শেষে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা ইব্রাহিম খলিল রাজাভি বলেন, আলীর প্রতি ভালোবাসাই ঈমানের মানদণ্ড। পরে তিনি বাংলাদেশসহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি, ঐক্য ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া করেন।
আপনার কমেন্ট