হাওজা নিউজ এজেন্সি: আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোহাম্মদ সাঈদী ৩ বাহমান ১৪০৪ (২৩ জানুয়ারি, ২০২৬) কোমের মুসাল্লায়ে কুদসে অনুষ্ঠিত জুমার নামাজের খুতবায় শাবান মাসের পবিত্র উৎসবের শুভেচ্ছা জানিয়ে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর একটি বাণী উদ্ধৃত করেন,
أُوصِیکُمْ بِتَقْوَی اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ قَدْ ضَمِنَ لِمَنِ اتَّقَاهُ أَنْ یُحَوِّلَهُ عَمَّا یَکْرَهُ إِلَی مَا یُحِبُّ وَ یَرْزُقَهُ مِنْ حَیْثُ لایحتسب
“আমি তোমাদেরকে আল্লাহর তাকওয়ার নির্দেশ দিচ্ছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করবে, তিনি তার অবস্থাকে অপছন্দনীয় থেকে পছন্দনীয় অবস্থায় পরিবর্তন করবেন এবং অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করবেন।”
ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও শত্রুদের পরাজয়
তিনি সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে ইরানি জাতির বিজয় ও শত্রুদের পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ও ইরানের মহান জনগণ বৈশ্বিক নিপীড়কদের চরম চাপের মুখেও সর্বোচ্চ 'সহনশীলতার হার' প্রদর্শন করেছে। এই পূর্ণমাত্রার চাপ বিশ্বে নজিরবিহীন। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ব্যবস্থাপনা ও জনগণ একসঙ্গে কাজ করেছে, ফলে এই কঠিন পর্যায় মূলত সমাপ্ত হয়েছে। যদিও সংকটের কিছু প্রভাব অবশিষ্ট আছে, তবুও এর মধ্যকার কয়েকটি প্রধান দিক উপেক্ষা করা উচিত নয়।”
অশান্তিকারীদের লক্ষ্যবস্তু
১. দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি: তিনি বলেন, “শত্রুর প্রথম লক্ষ্য ছিল দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা। এই অশান্তিতে দাঙ্গাকারীদের একটি বড় লক্ষ্য ছিল বৃহৎ খুচরা বিপণির গুদামসমূহ। বিপণিকেন্দ্রে পুড়িয়ে দেওয়া ও পণ্য সরবরাহ ব্যাহত করে তারা পরিস্থিতিকে সতর্কতার স্তরে নিয়ে গিয়েছিল।”
২. রাহবারের কর্তৃত্ব খর্ব করা: তিনি ব্যাখ্যা করেন, “এই অশান্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্য ছিল বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে দুর্বল করা। শত্রুরা বুঝতে পেরেছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায় লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের পথে প্রধান বাধা হলেন স্বয়ং রাহবার। তাঁর হাতে থাকা নেতৃত্বের ভূমিকা শত্রুদের আতঙ্কিত করেছে।”
মার্কিন নকশা ও ইরানের সতর্কবার্তা
কোমের জুমার ইমাম বলেন, “সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল নকশা ভেনিজুয়েলার অনুরূপ ছিল। ইসলামী প্রজাতন্ত্র বারবার শত্রুদের কাছে এই সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে যে, ইরান যেকোনো আক্রমণের জবাবে পুরো অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “জায়োনিস্টরা বছরের পর বছর এই ধরনের সংঘাতের জন্য পরিকল্পনা করেছিল এবং উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সরকারের গৃহীত জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ এবং নেতৃপ্রেমী, প্রতিরোধী জনগণের অশান্তিকারীদের প্রতি অনীহার মুখে তারা গুরুতরভাবে হতবাক হয়েছে ও পিছু হটেছে।”
দৈবিক সুরক্ষা ও সতর্কতা
তিনি বলেন, “যে আল্লাহ রাসূল (সা.)-কে মাকড়সার জালের মতো নগণ্য মাধ্যম দিয়ে মুশরিকদের থেকে রক্ষা করেছিলেন, তিনিই আমাদের রাহবারকেও শত্রুদের ষড়যন্ত্র থেকে হেফাজত করতে পারেন এবং সেই অপরাধী মার্কিন চক্রান্তকে ধ্বংস করতে পারেন।”
তিনি ইরানের জনগণ ও সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “শত্রু তার কূটচাল ও ফিতনা সৃষ্টি থেকে বিরত হবে না। তাই সর্বদা পূর্ণ প্রস্তুতি ও প্রধান ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধের মাধ্যমে এই সজাগতা বজায় রাখতে হবে।”
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জাতি: অপরাজেয়
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্মবার্ষিকী ও পাসদার দিবস উপলক্ষে তিনি বলেন, “ইমাম হুসাইন (আ.) ইরানি জাতি ও সকল মুসলমানের (শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে) ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু। এই ভালোবাসার জীবন্ত নিদর্শন আরবাইনের পদযাত্রা। শহীদ সোলাইমানি বলেছিলেন, ‘আমরা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জাতি।’ আর এই জাতি অপরাজেয়। পাসদার বাহিনী ইরানি জাতির শক্তি ও পরাক্রমের প্রতীক।”
তিনি আরও বলেন, “ইসলামী বিপ্লবের সাথে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন আমাদের জাতিকে ‘ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জাতি’-তে রূপান্তরিত করেছে। এই জাতিই আশুরার আদর্শ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে স্বাধীনতা ও ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের জন্য সংগ্রাম করছে। ইমাম হুসাইন (আ.)-এর দর্শন অনুযায়ী, যুলুমের ছায়ায় নীচু জীবন যাপন মৃত্যুর সমান, আর সম্মানের সাথে মৃত্যুও এক ধরনের জীবন।”
প্রথম খুতবা: তাকওয়ার বিস্তৃত প্রয়োগ
প্রথম খুতবায় আয়াতুল্লাহ সায়েদী বলেন, “যেভাবে আমরা ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর তাকওয়া রক্ষা করি, হারাম থেকে বেঁচে থাকি ও ফরজ কাজগুলো সম্পাদন করি, তেমনি রাজনৈতিক, সামাজিকসহ সকল ক্ষেত্রেই তাকওয়া পালন করা আমাদের কর্তব্য।”
তিনি সূরা আল-ফাতহের ১১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা প্রদান করেন, যেখানে কিছু মুনাফিক ও বেদুইন যুদ্ধে অংশ না নেওয়ার জন্য সম্পদ ও পরিবারকে অজুহাত হিসেবে দেখায়, কিন্তু তাদের অন্তরে যা নেই তাই মুখে বলে। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, রাসূল (সা.) হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে এক নরম বিজয় অর্জন করেছিলেন। মদিনায় ফিরে আসার পর, কিছু লোক নিজেদের তওবাকারী হিসেবে উপস্থাপন করে, কিন্তু কুরআন তাদের প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করে। তাদের ভয়, দুর্বল ঈমান, আরামপ্রিয়তা এবং আল্লাহ সম্পর্কে সন্দেহই তাদের যুদ্ধে অংশ নিতে বাধা দিয়েছিল।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আল্লাহ যদি কাউকে রক্ষা করতে চান তবে কেউ তাকে ক্ষতি করতে পারবে না, আর যদি তিনি কাউকে সাহায্য না করেন তবে কেউ তাকে সাহায্য করতে পারবে না।”
আপনার কমেন্ট