রবিবার ২৫ জানুয়ারী ২০২৬ - ১৯:৩১
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) কতৃক উমাইয়া শাসনের বৈধতায় ফাটল ও তাদের বানোয়াট বর্ণনার মুখোশ উন্মোচন

আশুরা কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা কিংবা দুটি গোষ্ঠীর মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ নয়। এটি মানব ইতিহাসের এক নিয়তিনির্ধারক মোড়, যেখানে সত্য পূর্ণ শক্তিতে বাতিলের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। এই ঘটনায় ইমাম হোসাইন (আ.) ও তাঁর অনুগত সঙ্গীরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে ঈমান ও স্বাধীনতার সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু এই গুরুগম্ভীর বার্তা যদি শুধু কারবালার ময়দানেই সীমাবদ্ধ থাকত, তবে তা তার গভীরতা ও স্থায়িত্ব হারিয়ে ফেলত। এমতাবস্থায় ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর ভূমিকা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে; যিনি আশুরার দিন মারাত্মক রোগে শয্যাশায়ী হয়েও এক গুরুদায়িত্ব বহন করেছিলেন—পিতার আদর্শ রক্ষা করা এবং নানামুখী বিকৃতি ও চাপা দেওয়ার চেষ্টার মধ্যেও এ আন্দোলনের চেতনা জীবন্ত রাখা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: কারবালা-পরবর্তী বিশ্বে এমন এক কণ্ঠস্বরের দরকার ছিল, যে রক্তের বার্তাকে সচেতনতা ও অন্তর্নিহিত আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে পারে। এই কণ্ঠস্বর ছিলেন ইমাম সাজ্জাদ (আ.)।

তিনি বন্দিদশায় সচেতন উপস্থিতি, কুফা ও শামে দেয়া মর্মস্পর্শী ভাষণ এবং ইবাদত, ধৈর্য ও সম্মানবোধে পরিপূর্ণ জীবন-আদর্শের মাধ্যমে আশুরার আন্দোলনকে বিস্মৃতির হাত থেকে রক্ষা করেন এবং তাকে ঈমান, মানবতা ও অন্তর্দৃষ্টির এক চিরন্তন বিদ্যাপীঠে পরিণত করেন। মূলত, আশুরা যদি হয়ে থাকে ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের প্রতীক, তবে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর নেতৃত্বে পরবর্তী সময়টি হয়ে ওঠে জাগরণ, জ্ঞানদান ও রিসালাতের ধারাবাহিকতার প্রতীক।

এ প্রসঙ্গে আমরা হেদায়াত ফাউন্ডেশনের সদস্য ও বিশিষ্ট গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম রেজা গোলামির সাথে একটি আলোচনা করি, যা নিচে উপস্থাপন করা হলো:

ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর আশুরার ঘটনা ও তার পরবর্তী ভূমিকা আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর আশুরা ও তার পরবর্তী ভূমিকা একটি অনন্য ও অনেকাংশে অবহেলিত ভূমিকা। কারণ, ঘটনার দিন গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনিই ছিলেন আশুরার চূড়ান্ত বার্তাবাহক ও এর সত্যতার প্রধান রক্ষক। কারবালার ময়দান যদি হয় প্রতিরোধ ও রক্তের প্রতীক, তবে বন্দিদশা ও তার পরবর্তী সময় হচ্ছে প্রজ্ঞা, ধৈর্য, জ্ঞানদান ও একটি আন্দোলনের সুচিন্তিত পর্দার আড়ালের নেতৃত্বের প্রতীক—এ দায়িত্ব শুধু ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-ই পূর্ণরূপে পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আশুরায় ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর উপস্থিতি দুই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ: প্রথমত, এটি ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর ইমামতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। কারণ, যদি পরবর্তী ইমাম জীবিত না থাকতেন, তাহলে আহলে বাইতের বার্তা উমাইয়া শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত। দ্বিতীয়ত, তাঁবুতে নারী ও শিশুদের জন্য আধ্যাত্মিক সমর্থন ও রাসূল (সা.)-এর বংশধরদের শোকাহত হৃদয়ে সান্ত্বনা দানের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল মৌলিক। যে পরিস্থিতিতে বহু বনি হাশেম পুরুষ শাহাদাতবরণ করেছিলেন, সেখানে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-ই ছিলেন তাঁবুর মূল স্তম্ভ ও বন্দীদের জন্য নির্ভরতার কেন্দ্র।

কিন্তু তাঁর ভূমিকার আসল গুরুত্ব ফুটে ওঠে আশুরা-পরবর্তী সময়ে। ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর জন্য বন্দিদশা কেবল একটি যাত্রাপথ ছিল না; বরং এটি ছিল আশুরার ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে এক সূক্ষ্ম ও বুদ্ধিদীপ্ত লড়াইয়ের প্রধান ময়দান। উমাইয়া শাসনযন্ত্র আশুরাকে একটি রাজনৈতিক বিদ্রোহ বা খেলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছিল। ইমাম সাজ্জাদ (আ.) তাঁর বক্তব্য ও উপস্থিতির মাধ্যমে এই বানোয়াট বর্ণনাকে নির্মূল করেছিলেন।

তিনি কুফা ও শামের ভাষণ, ক্রন্দন, মহানুভব ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ, এমনকি তাঁর গভীর ও প্রভাবশালী নীরবতার মধ্য দিয়ে এমন কাজ করেছিলেন যে, বছরের পর বছর উমাইয়া প্রোপাগান্ডার নিচে বসবাসকারী একটি জাতি হঠাৎ করেই এক চরম মর্মস্পর্শী সত্যের মুখোমুখি হয়: তা হলো, রাসূল (সা.)-এর আহলে বাইত (আ.), যারা এ উম্মতের পবিত্রতম ও সবচেয়ে মজলুম সদস্য, তারাই ক্ষমতালোভীদের রাজনীতির শিকার হয়েছেন। বাস্তবে, ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-ই জনগণের মনে ‘আশুরা’-এর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন; একটি আশুরা যা কেবল একটি ঘটনা নয়, বরং পরবর্তী যুগের চিন্তাগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।

কুফা ও শামে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর ভাষণগুলো জনমনে কী প্রভাব ফেলেছিল?
কুফা ও শামে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর ভাষণগুলোকে ইসলামী ইতিহাসের জ্ঞানদানমূলক অধ্যায়ের অন্যতম উজ্জ্বল টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে গণ্য করা যায়। যখন উমাইয়ারা বছরের পর বছর আহলে বাইতের (আ.) ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে নিজেদকে শাসনের একমাত্র বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল, তখন হঠাৎ করেই নবী পরিবারের একজন সদস্য একটি বাধ্যতামূলক কিন্তু কৌশলগত অবস্থানে এসে দাঁড়ালেন—সেই সব মানুষের সামনে যারা একদিকে আহলে বাইতের আপাত পরাজয়ের সাক্ষী, অন্যদিকে বছরের পর বছর মুয়াবিয়া ও ইয়াজিদের রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার নিচে বাস করছিল।

ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর ভাষণগুলো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী প্রভাব রেখেছিল:
১. জনগণের কাছে আহলে বাইতের পরিচয় পুনরুদ্ধার: ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) তাঁর ভাষণ শুরু করতেন নবী (সা.)-এর সঙ্গে তাঁর সুস্পষ্ট বংশপরিচয় উল্লেখ করে, যা ঐতিহাসিক অজ্ঞতায় আচ্ছন্ন জনতাকে নাড়া দিত। এ পরিচিতি কুফা ও শামের জনগণকে সরকারি প্রচারণা ও তাদের নিজেদের মধ্যে প্রথম বড় ফাটল অনুভব করতে সাহায্য করে। বহু মানুষ প্রথমবারের মতো সেই সত্যের সম্মুখীন হয়, যা তাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

২. উমাইয়াদের বানানো বর্ণনা ভঙ্গ করা: ইয়াজিদ চেয়েছিল বন্দীদেরকে বিদেশি হিসেবে উপস্থাপন করতে। ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর ভাষণ এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ করে দেয়। তিনি দৃঢ় ও যুক্তিপূর্ণ বাক্যের মাধ্যমে শাসনগোষ্ঠীর অত্যাচারী চরিত্র উন্মোচিত করেন এবং প্রমাণ করেন যে, ইমাম হোসাইন (আ.)-এর হত্যা কোনো গৃহযুদ্ধ নয়, বরং একটি নৈতিক, মানবিক ও ধর্মীয় বিপর্যয় ছিল।

৩. জনগণের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা: ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর ভাষণ কেবল জনতাকে জাগ্রতই করেনি, বরং তাদের সামাজিক বিবেককেও স্পর্শ করেছিল। কুফার মানুষ লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়েছিল এই ভেবে যে, তারা কীভাবে ইমামের প্রতি নিজেদের আমন্ত্রণে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। শামের মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে, তারা ধোঁকায় পড়েছে এবং উমাইয়াদের মিডিয়া রাজনীতির শিকার হয়েছে।

৪. শাসনের বৈধতায় ফাটল সৃষ্টি: ভাষণের পরে ইয়াজিদের আপাত বৈধতা একটি মারাত্মক আঘাত পায়; এমনকি ইয়াজিদ নিজেও বাধ্য হয়ে আহলে বাইতকে মুক্তি দিতে এবং এই বলে ভান করতে বাধ্য হয় যে, সে এই ঘটনার জন্য দায়ী নয়। এই আকস্মিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল ভাষণগুলোরই প্রতিক্রিয়া।

সংক্ষেপে, ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর ভাষণগুলো ছিল ইসলামের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রচারমূলক-আধ্যাত্মিক অভিযানগুলোর অন্যতম, যা সত্যের বাক্য ছাড়া কোনো প্রচার-উপকরণ ছাড়াই উমাইয়া প্রোপাগান্ডার কাঠামোকে ভিতর থেকে গুড়িয়ে দিয়েছিল।

ইমাম সাজ্জাদ (আ.) যদি না থাকতেন, তাহলে আশুরার বার্তার কোন দিক সম্ভবত হারিয়ে যেত বা বিকৃত হতো?
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) যদি উপস্থিত না থাকতেন, তাহলে আশুরার বার্তার একটি বিরাট অংশ শুধু যে বিস্মৃতির গর্ভে হারিয়ে যেত তাই নয়, বরং সম্ভবত ইতিহাসের পাতায় বিকৃত রূপেই থেকে যেত। ইমাম হোসাইন (আ.) আশুরায় রক্ত দিয়েছিলেন, কিন্তু ইমাম সাজ্জাদ (আ.) সেই রক্তকে সচেতনতার স্রোতে পরিণত করেছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে আশুরা একটি স্বল্পস্থায়ী বীরত্বগাথায় সীমাবদ্ধ থেকে যেত।

• যদি শুধু আশুরার সামরিক বা আবেগী বর্ণনাই থেকে যেত, তবে এর আধ্যাত্মিক ও তাওহিদি গভীরতা লোপ পেত। ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ‘সাহিফায়ে সাজ্জাদিয়া’-র দোয়া, ইবাদতময় জীবনযাপন ও বন্দিদশার মধ্যেও অটুট আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে পিতার অভ্যুত্থানের ঐশী চেতনাকে সুদৃঢ় করেছিলেন।

• ইমাম হোসাইন (আ.) যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন, ইমাম সাজ্জাদ (আ.) তেমনি শৃঙ্খলিত অবস্থায়ও সম্মান রক্ষা করতে শিখিয়েছিলেন। তিনি বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছিলেন যে, সম্মান জয়-পরাজয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। তিনি না থাকলে বন্দিদশায়ও মর্যাদা রক্ষার এই শিক্ষাটি হারিয়ে যেত।

• কারবালা-পরবর্তী সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ছিল ইমাম হোসাইন (আ.)-এর সঙ্গীদের শাহাদাত নয়, বরং তাদের বার্তার বিকৃতি। ইমাম সাজ্জাদ (আ.) তাঁর ভাষণ, অশ্রু ও উদ্দেশ্যমূলক আচরণের মাধ্যমে আশুরাকে কোনো গোত্রীয় বিদ্রোহ বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব হিসেবে চিহ্নিত হতে দেননি। তাঁর অবর্তমানে উমাইয়ারা সম্ভবত তাদের পছন্দসই সরকারি বর্ণনা চিরতরে ইতিহাসে চাপিয়ে দিতে সফল হতো।

• প্রকৃতপক্ষে, ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-কে ‘আশুরার স্মৃতির স্থপতি’ বলা যায়; যিনি কারবালার বার্তাকে রাজনীতির ধূলি কিংবা অপরিণত আবেগের আড়ালে হারিয়ে যেতে দেননি। তাঁর অবদান ছাড়া আশুরা একটি অসম্পূর্ণ, অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর ঘটনা হিসেবে থেকে যেত; কিন্তু তাঁর কারণে আশুরা আজ স্বাধীনতা, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও ন্যায়বিচারের একটি জীবন্ত ও স্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha