রবিবার ২৫ জানুয়ারী ২০২৬ - ২০:১৩
নতুন বিশ্ব ও উদীয়মান প্রবণতাগুলোকে জানা আমাদের প্রধান দায়িত্ব

নতুন বিশ্ব ও উদীয়মান প্রবণতাগুলোকে জানা আমাদের প্রধান দায়িত্ব

বর্তমান যুগে ইসলামি চিন্তা ও ভাবনার পথপ্রদর্শক হাওজা ইলমিয়া

আয়াতুল্লাহ আ’রাফি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্পিত ভারী দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, আমাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো নতুন বিশ্ব এবং উদীয়মান ধারাসমূহকে সঠিকভাবে চিহ্নিত ও বোঝা। কারণ এই জ্ঞান ছাড়া কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব নয়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, হাওজা ইলমিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা বিভাগের থিঙ্কট্যাঙ্কের পরিচালক ও সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতে আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আ’রাফি পবিত্র শাবান মাসের বিশেষ ফজিলত ও আধ্যাত্মিক সঞ্চয়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, মহান আল্লাহ যেন সকল মুমিনকে এই মাসের বরকত থেকে উপকৃত হয়ে তাঁর সান্নিধ্য লাভ এবং ইরান ও বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় জ্ঞান ও শিক্ষার প্রসারে আরও দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের তাওফিক দান করেন।

মুনাজাত ও সালাওয়াতে শাবানিয়া: আল্লাহর পথে উড্ডয়নের দুই ডানা

হাওজা ইলমিয়ার প্রধান ‘তাওহিদ’ ও ‘বেলায়াত’-এই দুই মৌলিক নীতির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, শাবান মাসে এই দুটি নীতি আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার দুই ডানার মতো কাজ করে। মুনাজাতে শাবানিয়া ও সালাওয়াতে শাবানিয়া একসঙ্গে বান্দার জন্য আল্লাহর পথে আত্মিক উন্নতি ও নৈকট্য অর্জনের সুগম পথ তৈরি করে।

তিনি মুনাজাতে শাবানিয়াকে বিশুদ্ধ তাওহিদি চিন্তা ও আল্লাহমুখী সাধনার সর্বোচ্চ প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এই মুনাজাতের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর ও বিস্ময়কর।

তিনি মুনাজাতে শাবানিয়ায় “ইলাহি” শব্দটির চল্লিশ বারেরও বেশি পুনরাবৃত্তির কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি আত্মিক সাধনার দ্বার উন্মুক্ত করে। এই মুনাজাত একটি পরিপূর্ণ সাধনাপথের চিত্র তুলে ধরে-যার সূচনা, অগ্রযাত্রা, অতিক্রান্ত স্তর এবং সেই শিখরগুলো মানুষকে হেদায়াতের দিকে নিয়ে যায়। প্রতিটি “ইলাহি” উচ্চারণের মাধ্যমে আত্মপরিচয়, আল্লাহর নৈকট্য এবং তাওহিদের দৃঢ়তা আরও গভীর হয়।

সালাওয়াতে শাবানিয়া-মুনাজাতে শাবানিয়ার পরিপূরক এক পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি

হাওজা ইলমিয়ার প্রধান বলেন, সালাওয়াতে শাবানিয়া মুনাজাতে শাবানিয়ার পরিপূরক একটি পূর্ণাঙ্গ ধারাবাহিকতা। এতে ‘রিসালত-পরিচয়’ ও ‘বেলায়াত-পরিচয়’-এর শিক্ষা রয়েছে, যা মুনাজাতে শাবানিয়ার তাওহিদি দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ করে।

তিনি আরও বলেন, শুধু নিজেরা এই গভীর অর্থগুলো উপলব্ধি করলেই যথেষ্ট নয়; বরং এগুলো অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আরও কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। হাওজা ইলমিয়ার অস্তিত্বের মূল দর্শনই হলো এই নির্মল ও বিশুদ্ধ জ্ঞান সমাজে পৌঁছে দেওয়া, আর এই পথে থিঙ্কট্যাঙ্কের সদস্যরা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

নতুন বিশ্বের গভীর উপলব্ধির প্রয়োজনীয়তা

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর ও বিস্ময়কর পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে আয়াতুল্লাহ আ’রাফি বলেন, গত দুই বছরে আমাদের চারপাশের বিশ্ব মৌলিকভাবে বদলে গেছে। এই পরিবর্তনের ভেতরে যেমন বিশাল সুযোগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে গুরুতর ও বিপজ্জনক হুমকি-যা হাওজা ইলমিয়া ও সকল দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের গভীর বিশ্লেষণ দাবি করে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সুযোগ, চ্যালেঞ্জ, হুমকি ও দায়িত্ব চিহ্নিতকরণ

তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুযোগ, চ্যালেঞ্জ, হুমকি ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা অপরিহার্য। সাম্প্রতিক ঘটনাবলির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, দুই বছর আগে সংঘটিত ঘটনাগুলোর শুরুতেই আমি বিভিন্ন মহলে বলেছিলাম-একটি নতুন ও ভারী ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে, যা আগের সব ঢেউ থেকে আলাদা এবং এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। বিপ্লবী আন্দোলন, হাওজা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে এর জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকতে হবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান যুদ্ধ, অস্থিরতা ও মৌলিক সংকটগুলো অতীতের কোনো সময়ের সঙ্গে তুলনীয় নয়। আমি কৈশোরকাল থেকেই বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত; দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি-আজকের পরিস্থিতি অতীতের সব পর্যায় থেকে আলাদা ও অনেক বেশি কঠিন। যদিও আমি এই হুমকির পাশাপাশি বড় সুযোগের ব্যাপারেও আশাবাদী, তবে চ্যালেঞ্জ ও হুমকিকে ছোট করে দেখছি না।

বর্তমান যুগে ইসলামি চিন্তার পথপ্রদর্শক হাওজা ইলমিয়া

হাওজা ইলমিয়ার প্রধান বলেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর অত্যন্ত ভারী দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। আমাদের দায়িত্ব হলো দ্বীনের জন্য কাজ করা এবং হাওজা ইলমিয়াকে সমসাময়িক বিশ্বে ইসলাম ও বিপ্লবের চিন্তা ও দর্শনের পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, নতুন বিশ্ব ও উদীয়মান ধারাসমূহকে জানা আমাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব; এই জ্ঞান ছাড়া কোনো কার্যকর উদ্যোগ সম্ভব নয়।

সমাজের সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কের গুরুত্ব

আয়াতুল্লাহ আ’রাফি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হাওজা ও ধর্মীয় নেতৃত্ব একদিকে ইসলামী বিপ্লবের বরকতে অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক সুযোগের মুখোমুখি, অন্যদিকে বড় বড় চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকির সম্মুখীন।

তিনি বলেন, এসব বিষয়ে গভীর পর্যালোচনা ও কার্যকর সমাধান উপস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় হতে হবে। এখনো পর্যন্ত যা করা হয়েছে তা যথেষ্ট নয়; আরও গভীর ও সূক্ষ্ম কাজ প্রয়োজন-বিশেষত সাধারণ মানুষ, যুবসমাজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও অভিজাত শ্রেণির মধ্যে। একই সঙ্গে দেশের বাইরে বসবাসকারী ধর্মপ্রাণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনাও আমাদের জানা জরুরি।

আন্তর্জাতিক চিন্তা-ব্যবস্থায় হাওজার অবস্থান নির্ধারণ

তিনি বলেন, বিশ্ব আমাদের কীভাবে দেখে এবং আন্তর্জাতিক চিন্তা-ব্যবস্থায় আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি-তা স্পষ্টভাবে জানা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কার্যকর অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য।

বিশ্বের জ্ঞান ও চিন্তার পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান উন্নত করার প্রচেষ্টাকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে এ ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

চিন্তাবিদদের সঙ্গে সংযোগ জোরদারের আহ্বান

আয়াতুল্লাহ আ’রাফি বলেন, চিন্তাবিদদের কণ্ঠ শোনা অত্যন্ত জরুরি। আলহামদুলিল্লাহ, থিঙ্কট্যাঙ্কে এ কাজ শুরু হয়েছে এবং ভালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধারণা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও আইডিয়া ব্যাংক গঠন এই কাজকে আরও পরিপক্ব করবে এবং সমাজে আশাবাদ সৃষ্টি করবে।

সকল সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার অপরিহার্য

তিনি বলেন, থিঙ্কট্যাঙ্ক ও গবেষণা কেন্দ্রগুলোর সামনে শত শত বিষয় রয়েছে, যা সীমিত সক্ষমতা দিয়ে একা সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই গবেষণার পরিসর বিস্তৃত করতে হবে এবং আরও নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে-যেগুলো সমস্যা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রাখে।

তিনি আরও বলেন, সমস্যা সমাধানে সক্ষমতা ‘নেটওয়ার্কিং’ ও ‘চেইনিং’ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা থিঙ্কট্যাঙ্ক ব্যবস্থায় বাস্তবায়ন করা জরুরি।

‘বর্ণনা নির্মাণ’ ও ‘গফতমান-সৃষ্টি’র গুরুত্ব

তিনি সম্পাদিত ও চলমান কার্যক্রম নিয়ে বর্ণনা নির্মাণ ও গফতমান সৃষ্টির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, গফতমান-সৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বিজ্ঞানের চ্যালেঞ্জ

আয়াতুল্লাহ আ’রাফি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বিজ্ঞান এমন বিষয়, যা আমাদের সব ব্যবস্থাকে বদলে দিচ্ছে এবং সম্পূর্ণ নতুন নতুন জগত সৃষ্টি করছে। এসব প্রযুক্তি আর সাধারণ যন্ত্র নয়; বরং মানুষের অংশীদার হয়ে গেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চেয়েও দ্রুত ও অগ্রসর।

তিনি বলেন, এসব পরিবর্তন আমাদের বহু ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এসব বাস্তবতার মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ ক্ষেত্রে আরও গভীর ও গুরুতর কাজ করা প্রয়োজন, যাতে এই বিশাল পরিবর্তনের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করা যায়।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha