বৃহস্পতিবার ২৯ জানুয়ারী ২০২৬ - ১৯:৪৪
প্রায় পাঁচ শতকের দুই ‘সৈয়দ’: ইতিহাস, রাজনীতি ও কারবালার উত্তরাধিকার!!

প্রায় পাঁচ শতকের দুই ‘সৈয়দ’: ইতিহাস, রাজনীতি ও কারবালার উত্তরাধিকার!!

(এক পথিকের স্মৃতিচারণ ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ আমি এক পথিক) 

পথটা সময়ের—প্রায় পাঁচ শতক জুড়ে বিস্তৃত। পথটা ভূগোলের—উপমহাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, কারবালা থেকে তেহরান, দিল্লি থেকে কুদস। পাকিস্তান থেকে আমেরিকা৷ জ্ঞান থেকে বিজ্ঞান৷ জন্ম থেকে মৃত্যু৷ 

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,

রিপোর্ট:  মুস্তাক আহমদ

আমার জন্ম ১৯৭৭ সালে। তার ঠিক দু’বছর পর, ১৯৭৯ সালে—ইতিহাস কাঁপিয়ে ঘটে যায় ইরানি ইসলামী বিপ্লব। সে বিপ্লব শুধু একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল ইসলামের রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের ভাষা। সেই আত্মপরিচয়ের ভাষায় আজকের এই বিশেষ প্রবন্ধ৷ 

তা যায় হোক এই বিপ্লব হঠাৎ জন্ম নেয়নি। এর বহু আগেই—মধ্যপ্রাচ্য ও উপমহাদেশে—দুইজন প্রভাবশালী, জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ‘সৈয়দ’ ইসলামকে রাজনীতির ময়দানে ফিরিয়ে আনার প্রয়াস চালাচ্ছিলেন। একজন— আল্লামা সৈয়দ আবুল আলা মওদূদী (রহঃ), অপরজন— আয়াতুল্লাহ সৈয়দ রুহুল্লাহ খোমেনী (রহঃ)৷

(১) ‘আল্লামা’ ও ‘আয়াতুল্লাহ’: 
(দুই উপাধি, দুই দর্শন)
——— ‘আল্লামা’— অর্থাৎ ইসলামী জ্ঞানে বিশেষ পণ্ডিত, গ্রন্থকার, তাত্ত্বিক।
‘আয়াতুল্লাহ’— অর্থাৎ আল্লাহর নিদর্শন, আল্লাহর আয়াতের জীবন্ত প্রতিফলন।

দুজনেই ‘সৈয়দ’— অর্থাৎ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর রক্তধারার উত্তরাধিকারী, আহলে বাইতের বংশধর।
দুজনেই জ্ঞানী, দুজনেই লেখক, দুজনেই চিন্তাবিদ, দুজনেই বিপ্লবী৷  কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে— শুধু জ্ঞান নয়, কোন জ্ঞান থেকে জন্ম নেয় দর্শন—সেটাই নির্ধারণ করে বিপ্লব নাকি সংগঠন।

(২) সংগঠন বনাম বিপ্লব
——— আল্লামা মওদূদী ইসলামকে রাজনীতিতে আনতে চেয়েছেনঃ
- সংগঠনের মাধ্যমে
- ‘জামায়াতে ইসলামী’ প্রতিষ্ঠা করে
- ধাপে ধাপে ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে ঢোকার কৌশলে।
অন্যদিকে, আয়াতুল্লাহ খোমেনী ইসলামকে রাজনীতিতে এনেছেনঃ
- বিপ্লবের মাধ্যমে
- শাহি শাসনের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান গড়ে তুলে
- এবং একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে— যেটি পরে
Islamic Republic of Iran নামে গঠিত হয়৷

ভারতে বসে একজন ক্ষমতার দরজায় কড়া নাড়লেন, পারস্যে বসে অপরজন ক্ষমতার দরজাই ভেঙে ফেললেন।

(৩) নির্বাসন ও হিজরত: 
(দুই জীবনের মোড়)
——— খোমেনী (রহঃ)
- বিপ্লবের আগে প্যারিসে নির্বাসিত
- কিন্তু বিজয়ের পরে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন
- জনগণের কাঁধে ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতায়। আমেরিকা ইজরাঈল চমকে উঠেছে৷ 
——— মওদূদী (রহঃ)
- দেশভাগের পর ভারত থেকে পাকিস্তানে হিজরত
- কিন্তু আর কখনো স্বদেশে ফেরা হয়নি
- বরং রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে। আর জোড়া লাগেনি, আমেরিকা ও ইজরাঈলের ভয় লাগেনি৷ ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর— রুহুল্লাহ প্রত্যাবর্তনকেই বৈধতা দেন৷

(৪) কারবালার উত্তরাধিকার: 
(এখানেই মূল বিভাজন) 
——— আয়াতুল্লাহ খোমেনী ছিলেন ‘সৈয়দ’— এবং তিনি আহলে বাইতের নির্ভেজাল জ্ঞানভাণ্ডার
- কারবালা
- শাহাদাত
- জুলুমের বিরুদ্ধে কিয়াম
এই তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড় করান তার আন্দোলনকে।
ফলে ইরানের জনগণ নিজেদের সময়, অর্থ, সম্পদ, রক্ত—এমনকি জীবনও বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেনি।
কারণ তারা জানত— এটা রাজনীতি নয়, এটা হুসাইনি কিয়াম। তাই হুসাইনী কিয়ামটি ১৪০০ বছরের  ইয়াজিদের শিকল ভেঙে একটি ইসলামী স্বাধীনতার স্বাদের রাস্ট্র ফিরিয়ে দিয়েছে৷ 
অপরদিকে, আল্লামা মওদূদী নিজেও ‘সৈয়দ’ হয়েও
- আহলে বাইতের জ্ঞানকে কেন্দ্র করলেন না
- তথাকথিত সাহাবি-নির্ভর ধারার দর্শনকে সংগঠনে রূপ দিলেন।
ফলাফল?
- আপামর জনগণের সমর্থন পাননি
- প্রায় ৮০% মুসলমানদের ইসালামের নামেই হাজার হাজার মাযহাব ও  দলের বিরোধিতায় থেকেছেন তিনি৷
- সংগঠনের কর্মীরা অর্থ ও সময় দিলেও
- জীবন বিসর্জনে দ্বিধাবোধ করেছে। কারণ কারবালার শিক্ষা সেখানে ছিল না। হযরত হুসাইন (আ.)-এর সন্তান হয়েও আবুল আলা মওদূদী কারবালা থেকে শিক্ষা না নেওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। বরং আজও জামাতি ইসলামী দলের লোক কারাবালার শিক্ষাকে কাফের ফতোয়ায় আক্রমণ করে চলেছে৷

(৫) ফিলিস্তিন প্রশ্ন ও ইতিহাসের কঠিন রায়ঃ
——— ১৯৭৯ সালের পর, আয়াতুল্লাহ খোমেনী উপমহাদেশের আন্দোলনে  আল্লামা মওদূদীকে ইজরাঈলবিরোধী ইত্তেহাদের ডাক দিয়েছিলেন।
উদ্দেশ্য একটাই—
- ফিলিস্তিনের জমিন থেকে অবৈধ ইজরাঈল উৎখাত। কিন্তু— ‘শিয়া’ তকমা লেগে যাওয়ার ভয়
- তাকে সেই ঐতিহাসিক ডাকে সাড়া দিতে দেয়নি।
এরপর ইতিহাস তার নিজস্ব পথে চলে—
- সৌদি আরব তাকে আমন্ত্রণ জানায়
- ফয়সাল পুরস্কারে ভূষিত করে
- মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তরে অংশ নেন
- আজ সেই ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় অসংখ্য ‘মাদানী’ আলেম।

অন্যদিকে, খোমেনী (রহঃ)

- কোনো আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাননি
- তার প্রাপ্তি একটাই— “শিয়া কাফের” তকমা৷

কিন্তু ইতিহাস আজ প্রশ্ন করে— পুরস্কার বড়, না প্রতিরোধ?  ইতিহাস কাকে বেছে নেয়? ইতিহাস কখনো নিরপেক্ষ নয়। সে সাহসকে বেছে নেয়, আপসকে নয়।
সে কারবালাকে বেছে নেয়, দরবারকে নয়।

একজন পেয়েছেন পুরস্কার, অপরজন পেয়েছেন বিপ্লব। একজন গড়ে তুলেছেন সংগঠন, অপরজন গড়ে তুলেছেন ইতিহাস।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha